আইনের চোখ খোলাই থাকুক
সকাল সকাল ডেস্ক তন্ময় সিংহ ভারতবর্ষের ন্যায় সংহিতায় “লেডি জাস্টিস” এর যে ছবি পূর্বে ছিল, তা মূলত রোমান আইনের দেবীর ধারণা থেকে নেওয়া হয়েছিল এবং এই দেবীর চোখে কালো কাপড় দেওয়া থাকত যাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। অপরাধীর সামাজিক পরিচয় বা আইনের দ্বারস্থ যিনি হয়েছেন তার সামাজিক পরিচয় না দেখে শুধুমাত্র সত্য ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কোন ভেদ না করাই ছিলো, এই দেবীর ছবির মূল ধারণা। ভারতীয় সংবিধানে আইনের চোখে সবাই সমান এটা ভারতীয় আইন প্রস্তুত কারকেরা জনমানসে ধারণা তৈরি করতে পেরে ছিলেন । পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় সাহেবের আমলে এই আইনের দেবীর চোখের কালো কাপড় খুলে দেওয়া হয় এবং হাতে তরোয়ালের পরিবর্তে ভারতীয় সংবিধান দেওয়া হয়। নতুন শতাব্দীতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে যে আইন অন্ধ নয় এবং সে সবাইকে সমান চোখে দেখে। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে শাসক বিজেপি শিবির থেকে যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসা বন্ধ করার জন্য বার্তা দিয়েছেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি এবং বিজেপির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তাতে পরিবর্তনের পরে পশ্চিমবঙ্গে হানাহানি ও হিংসার ঘটনা যথেষ্ট কম হয়েছে। সারা ভারতে পশ্চিমবঙ্গের যে ছবি তৈরি হয়েছিল সিপিএম জমানার শেষের দিক থেকে তৃণমূল জমানা পর্যন্ত, সর্বাধিক রাজনৈতিক হানাহানি ও হিংসার রাজ্য হিসেবে সেই পরিচয় মুছতে বদ্ধপরিকর ছিল শাসক বিজেপি। এক্ষেত্রে তারা প্রায় সর্বত্রই অনেকাংশে সফল। পার্টি অফিস ভাঙ্গচুর, রাজনৈতিক হানাহানি ও সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার উপর আক্রমণের ঘটনা নজরে এলেও তা কখনোই সারা পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়নি। পরবর্তীকালে মন্ত্রিসভা গঠনের সাথে সাথে এবং প্রশাসন সক্রিয়ভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়ার ও গ্রেফতারি ঘটনায় এই আইনের শাসন দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা হচ্ছিল। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জির একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ডিম ও ঢিল ছোড়ার পরবর্তীতে সারা পশ্চিমবঙ্গে শাসকদলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ডিম থেরাপি শুরু হয়েছে যা দেশের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এছাড়াও প্রশাসনের তরফ থেকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের কোমরে দড়ি পরিয়ে যে প্যারেড এর রীতি তৈরি হয়েছে তার নিন্দা করেছে মহামান্য হাইকোর্ট। সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে জনতা বিভিন্ন পার্টি অফিস ও প্রাক্তন শাসক দলের কর্মীদের বাড়ি ঘেরাও করছে এবং সেখান থেকে বিভিন্ন রকম জিনিস উদ্ধার করছে। শুরু হচ্ছে ডিম থেরাপি। কোন রাজনৈতিক নেতা গ্রেপ্তার হলে তাকে কোর্টে পেশ করার সময় শুরু হচ্ছে ডিম থেরাপি। আবার বিভিন্ন পঞ্চায়েত গুলিতে প্রধান দেরকে আটকে রেখে শুরু হচ্ছে ডিম থেরাপি। কাউন্সিলর ও বিধায়কদের বাড়িতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধারের পাশাপাশি শুরু হচ্ছে ডিম থেরাপি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শাসক দলের নেতাদের হাতে কর্মীদের লাগাম নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। কোন এলাকাতে শিক্ষক দেরিতে এলে তাকে ল্যাম্পপোস্ট বেধে রাখা হচ্ছে। বিদ্যালয়ে গিয়ে ডিম থেরাপি দেয়া হচ্ছে, জুতোর মালা পরানো হচ্ছে ।বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে বেঁধে রাখা হচ্ছে আবার তার সাথে থাকা প্রশাসনের আধিকারিক এবং সাংবাদিকদের ওপরও ছোঁড়া হয়ে যাচ্ছে ডিম। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের প্রকাশ্যে কান ধরে উঠবস করতে দেখা যাচ্ছে। পুলিশ তাদের কোমরে দড়ি বেঁধে প্যারাড করাচ্ছে রাস্তাতে। হাইকোর্টের নিষেধ সত্ত্বেও চলছে এই অভ্যাস। ভারতীয় সংবিধান এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এই দুই পদ্ধতিকেই আইনি স্বীকৃতি দেয়নি। কোন এক অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে যেন গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে চলেছে এই প্রয়োগ, সুতার সাথে বাঁধা পুতুলের মতন জোয়ারে গা ভাসিয়েছে জনতার একাংশ। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির তুলনায় ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের মূল কাঠামো যে আজও অবিকৃত আছে তার জন্য সবচেয়ে বেশি যার গুরুত্ব তা হলো ভারতীয় সংবিধান। সেই ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী সম্মানের সাথে বাঁচার অধিকার তাদের মৌলিক অধিকার। বিচার শুরুর আগে কোন ব্যক্তিকে জনসমক্ষে হেয় বা অপমান এই নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী। নতুন সরকারের প্রশাসনের তরফে আরো সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। মানুষকে নীতি শিক্ষা দেওয়ার এই হাতে গরম পন্থা আসলে জনমানসে র মধ্যে উচ্ছৃংখলতা এবং নিজেই বিচার করে শাস্তি প্রদানের একটা মানসিকতা তৈরি করছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষককে প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া নাগরিকদের অবশ্য পালনীয় একটি কর্তব্য, কারণ আজকের শিশুরা আগামীর নাগরিক। শিক্ষকদের কোন সমস্যা থাকলে তার প্রতিবিধান আইন মেনে করা হোক। আবার অন্যদিকে দুর্নীতির সাথে যুক্ত থাকার অপরাধে গ্রেফতার হওয়া বিগত শাসকদলের নেতা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের অপরাধের বিচার করার জন্য অপরাধীকে তার নাগরিক অধিকার সমেত দেশের বিচার ব্যবস্থার সামনে দাঁড় করিয়ে শাস্তি প্রদান করাই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আশা করব শাসনে বসার সাথে সাথেই যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে হিংসা মুক্ত করার জন্য শাসক শিবির চেষ্টা করেছিল, সেভাবেই সারা পশ্চিমবঙ্গে এই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে উচ্ছৃঙ্খলতা কে প্রশ্রয় না দিয়ে। নতুন সরকারের কাছে এটাই আমাদের আশা যেন বাস্তবায়ন হয় সবাইকে সাথে নিয়ে সবারই উন্নতির কর্মসূচি।
নারী শক্তির দশক, বিকশিত ভারতের উত্থান
সকাল সকাল ডেস্ক শ্রীমতী অন্নপূর্ণা দেবী দেশের যে কোনও গ্রাম, শহরতলি, বস্তি কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেলে আজ একটি পরিবর্তিত বাস্তবতা চোখে পড়ে। একসময় রান্নাঘরের চুলার কালো ধোঁয়া যে নববধূর চোখে জল আনত, আজ সেখানে উজ্জ্বলা যোজনার গ্যাসের নীল শিখা জ্বলছে। যে মা প্রতিদিন বহু দূর থেকে জল বহন করে আনতেন, আজ তাঁর বাড়ির আঙিনাতেই ‘হর ঘর জল’ প্রকল্পের কল থেকে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে যাচ্ছে। খোলা জায়গায় শৌচকর্মের যে বাধ্যবাধকতা একসময় নারীদের মর্যাদাকে আঘাত করত, আজ সেখানে স্বচ্ছ ভারত অভিযানের শৌচাগার সম্মানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাথার উপর রয়েছে পাকা ছাদ, আর সেই বাড়ির মালিকানার নথিতে প্রথমবারের মতো নারীর নাম যুক্ত হয়েছে। হাতে রয়েছে জন-ধন অ্যাকাউন্টের পাসবই, আর মোবাইল ফোনে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা। এ কোনও কল্পিত চিত্র নয়; বরং গত বারো বছরে নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে দেশের বাস্তব অগ্রগতির প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ‘নারী-নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন’-এর যে ধারণা সামনে এসেছে, তার ফলেই আজ ভারতীয় নারীরা বিকশিত ভারতের নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন। এই পরিবর্তনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হলে আমাদের এক দশক পিছনে ফিরে তাকাতে হবে। একসময় মাতৃমৃত্যুর হার ছিল প্রতি লক্ষ জীবিত জন্মে ২১২। নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান নিয়ে উদ্বেগ ছিল প্রবল। বহু গুরুত্বপূর্ণ আইন বছরের পর বছর ধরে ঝুলে ছিল। তিন তালাকের মতো সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য কোনও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। রান্নাঘরের ধোঁয়া নারীদের স্বাস্থ্যকে বিপন্ন করত, আর জল সংগ্রহের কষ্ট ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। সেই সময় ভারতীয় নারী একটি নতুন সূচনার অপেক্ষায় ছিলেন। আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক—জীবনের নিরাপত্তা—ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটেছে। দেশে মাতৃমৃত্যুর হার ২১২ থেকে কমে ৮৮-এ নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির তথ্য অনুযায়ী, যেখানে বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যুর হার কমার হার ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত, সেখানে ভারত এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার ৩৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯০.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনার মাধ্যমে কোটি কোটি মায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিয়ে নিরাপদ মাতৃত্ব ও সুস্থ শিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে। নারীদের মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দেশে ১২ কোটিরও বেশি গার্হস্থ্য শৌচাগার নির্মিত হয়েছে, যা নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করেছে। ১০.৫ কোটিরও বেশি পরিবার উজ্জ্বলা যোজনার সুবিধা পেয়েছে। একইসঙ্গে ১৬ কোটিরও বেশি পরিবারে নলবাহিত পানীয় জল পৌঁছে গেছে, যেখানে ২০১৪ সালে এই সুবিধা ছিল মাত্র ১৭ শতাংশ পরিবারের কাছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় নির্মিত প্রায় ৪ কোটি বাড়ির মধ্যে ৭৩ শতাংশ বাড়ির মালিকানায় নারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই ঘটনা এক নতুন সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে। মর্যাদা থেকে এসেছে মালিকানা, আর মালিকানা থেকে জন্ম নিয়েছে আত্মবিশ্বাস। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের এই যাত্রা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা তৈরির পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রায় ৫৬ কোটি জন-ধন অ্যাকাউন্টের মধ্যে ৫৬ শতাংশই নারীদের নামে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির মতে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভারত একটি অনন্য নজির স্থাপন করেছে। মুদ্রা যোজনার আওতায় প্রদত্ত ৫২ কোটিরও বেশি জামানত-মুক্ত ঋণের ৬৮ শতাংশ নারীদের কাছে পৌঁছেছে। স্ট্যান্ড-আপ ইন্ডিয়া কর্মসূচির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নারী উদ্যোক্তাদের প্রদান করা হয়েছে। দীনদয়াল অন্ত্যোদয় যোজনা–জাতীয় গ্রামীণ জীবিকা মিশনের অধীনে লক্ষ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী বিশাল আর্থিক সম্পদ গড়ে তুলেছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই ৩ কোটি নারী ‘লখপতি দিদি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রমাণ। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট। নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার ২০১৭-১৮ সালের ২৩.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে ৪১.৭ শতাংশে পৌঁছেছে। গ্রামীণ অঞ্চলে এই হার আরও বেশি। সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনার আওতায় কোটি কোটি কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে বিপুল পরিমাণ সঞ্চয় জমা হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় লিঙ্গ সমতার সূচক একেরও বেশি হয়েছে, যা দেখায় যে মেয়েরা এখন উচ্চশিক্ষায় ছেলেদের সমান বা তারও বেশি অংশগ্রহণ করছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষায়ও ভারতীয় কন্যাদের অংশগ্রহণ বিশ্বের সর্বোচ্চগুলির মধ্যে অন্যতম। নারীদের এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্থান রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে। ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নারীদের ভোটদানের হার পুরুষদের ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৩১ কোটিরও বেশি নারী ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, যা বিশ্বে নারীদের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রেক্ষাপটেই বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা নারী শক্তি বন্দন আইন সংসদে ঐতিহাসিকভাবে পাস হয়েছে। বর্তমানে তৃণমূল স্তরে ১৪.৫ লক্ষেরও বেশি নারী জনপ্রতিনিধি পঞ্চায়েত পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মুসলিম নারী বিবাহ অধিকার সংরক্ষণ আইন তিন তালাক প্রথার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্থাপিত একক সহায়তা কেন্দ্রগুলিতে সংকটাপন্ন নারীরা চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও মানসিক পরামর্শ পাচ্ছেন। নারী সহায়তা হেল্পলাইন ইতোমধ্যে লক্ষ লক্ষ নারীকে সহায়তা প্রদান করেছে। মিশন শক্তি, মিশন বাৎসল্য এবং সক্ষম অঙ্গনওয়াড়ির মতো কর্মসূচিগুলি নারী-নেতৃত্বাধীন ভারতের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। তবে এই যাত্রা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। নারী ক্ষমতায়নের পথে নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে এবং সরকার সেগুলি মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবুও আজ একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারতের নারী আর কেবল উন্নয়নের সুবিধাভোগী নন। তিনি নীতি প্রণয়নের অংশীদার, উন্নয়নের সহ-নির্মাতা এবং রাষ্ট্রগঠনের অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতীয় নারীরা আজ এমন এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন, যেখানে তাঁদের শক্তি, সক্ষমতা ও অংশগ্রহণই বিকশিত ভারতের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
গ্রেট নিকোবর : ভারতের সামুদ্রিক কৌশলের প্রধান কেন্দ্র
সকাল সকাল ডেস্ক অ্যাডমিরাল ডি. কে. জোশী “যে রাজ্য তার সীমানা, অংশীদারিত্ব এবং বাণিজ্য পথ সুরক্ষিত রাখে না, সে তার ভবিষ্যৎও সুরক্ষিত রাখতে পারে না।” কৌটিল্য কৌটিল্যের এই শিক্ষা শত শত বছর আগে শাসন ও কৌশলের মূল চিন্তার অংশ হয়ে উঠেছিল, এবং আজকের সময়ে এটি আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। আজ দেশগুলোর পরীক্ষা কেবল তাদের অর্থনীতির আকার বা সামরিক শক্তি দিয়ে হচ্ছে না, বরং এই বিষয় দিয়ে হচ্ছে যে তারা ভূগোলকে কতটা ভালোভাবে বোঝে, ভবিষ্যতের কতটা সঠিক অনুমান করে এবং সুযোগের বিপদ হয়ে ওঠার আগে কতটা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়। গ্রেট নিকোবর ভারতের জন্য এমনই একটি বড় পরীক্ষা। এটি ভারতীয় মানচিত্রের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত একটি দূরবর্তী দ্বীপের মতো মনে হয়। এমন একটি জায়গা যা কয়েক দশক ধরে প্রায় অক্ষত রাখা হয়েছে এবং যাকে সেভাবেই থাকতে দেওয়া উচিত। কিন্তু গ্রেট নিকোবর ভারতের অগ্রিম সামুদ্রিক চৌকি। ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের কাছাকাছি অবস্থিত এই দ্বীপটি বিশ্বের দিকে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগগুলির মধ্যে একটি। অতএব, গ্রেট নিকোবরের প্রস্তাবিত উন্নয়নকে কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে দেখা যায় না। এটি কেবল একটি বন্দর, বিমানবন্দর, টাউনশিপ বা বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির প্রশ্ন নয়। এটি আসলে এই বিষয়ে একটি কৌশলগত পরীক্ষা যে ভারত তার এই বিরল ভৌগোলিক সুবিধাটিকে জাতীয় শক্তিতে রূপান্তরিত করতে প্রস্তুত কিনা। শত শত বছর ধরে ভারত মহাসাগর ভারতের ভাগ্যকে আকার দিয়েছে। এই সামুদ্রিক অঞ্চলই আমাদের বাণিজ্য, আমাদের ধারণা এবং আমাদের সভ্যতার প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে, তবে অনেক সময় এটি আমাদের দুর্বলতার কারণও হয়েছে। তবে, স্বাধীনতার পর দীর্ঘকাল ধরে ভারতের কৌশলগত চিন্তা মূলত স্থল-ভিত্তিক ছিল। এটি অনস্বীকার্য যে গ্রেট নিকোবর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত স্থান। এটি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম দ্বীপগুলির মধ্যে একটি, যার আয়তন প্রায় 910 বর্গ কিলোমিটার। প্রস্তাবিত প্রকল্পের মোট আয়তন 166.10 বর্গ কিলোমিটার, যা সমগ্র দ্বীপপুঞ্জের মোট আয়তনের প্রায় 2 শতাংশ। এর মধ্যে 130.75 বর্গ কিলোমিটার বনভূমি প্রকল্পের জন্য ব্যবহারের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দ্বীপপুঞ্জের মোট বনভূমির প্রায় 1.82 শতাংশ। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাছাকাছি অবস্থিত এবং মালাক্কা প্রণালী, 60 চ্যানেল, সুন্দা প্রণালী এবং লোম্বক প্রণালীর মতো প্রধান বৈশ্বিক সামুদ্রিক পথের কাছাকাছি আসে। প্রকৃত কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি ভারতের পূর্ব সামুদ্রিক চৌকি। এর গুরুত্ব তখন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন এটিকে কেবল ভূখণ্ডের দৃষ্টিকোণ থেকে নয়, বরং মহাসাগরীয় কৌশলের ব্যাপক প্রেক্ষাপট থেকে দেখা হয়। কল্পনা করুন সেই জাহাজগুলির কথা, যা এডেন উপসাগর থেকে মালাক্কা প্রণালীর দিকে এগিয়ে চলেছে, শক্তিতে ভরা মালবাহী জাহাজ, যা পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকা থেকে পূর্ব এশিয়ার দিকে যাচ্ছে, এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপকে সংযুক্তকারী কন্টেইনার ট্র্যাফিক এবং নৌ সামরিক সম্পদ, নজরদারি প্ল্যাটফর্ম এবং লজিস্টিক চেইন, যা এই জলপথ দিয়ে অতিক্রম করছে। ভারত মহাসাগর এখন শান্ত সমুদ্র নয়। এটি দ্রুত একটি জনাকীর্ণ কৌশলগত অঞ্চলে রূপান্তরিত হচ্ছে। শক্তি সরবরাহ, কন্টেইনার ট্র্যাফিক, নৌ সামরিক মোতায়েন, দ্বীপীয় সুবিধা, সমুদ্রের নিচে বিছানো কেবল এবং সামুদ্রিক নজরদারি এখন একটি বড় বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে উঠেছে। এটি হয়তো মূল ভূখণ্ডে বসে থাকা অনেকের কাছে দৃশ্যমান নাও হতে পারে, তবে দেশগুলির ভবিষ্যতের জন্য এটি অত্যন্ত নির্ণায়ক। সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হল যে আন্দামান সাগরকে থাইল্যান্ড উপসাগরের সাথে সংযুক্তকারী কয়েক দশকের পুরনো ক্যানাল প্রকল্পটি স্থগিত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে এখন প্রায় 90 কিলোমিটার দীর্ঘ মাল্টি-মোডাল ল্যান্ড ব্রিজের পরিকল্পনা চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এই প্রকল্পটি টেন্থ প্যারালালের সাথে দুটি নব-নকশাকৃত গভীর সমুদ্র বন্দরকে সংযুক্ত করবে — একটি আন্দামান সাগরের তীরে রানং-এ এবং অন্যটি থাইল্যান্ড উপসাগরের তীরে চুম্ফোন-এ। এর সাথে দ্বৈত ট্র্যাকের উচ্চ গতির রেল, বহু-লেন সড়ক,তেল ও গ্যাসের জন্য শক্তি পাইপলাইন এবং বায়ু ও ডিজিটাল গ্রিডও প্রস্তাবিত। এই সমস্ত কারণ একত্রিত হয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক বাণিজ্য পথগুলিকে সম্পূর্ণরূপে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র সরাসরি আন্দামান অববাহিকার দিকে স্থানান্তরিত করছে। মালাক্কা প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক চোকপয়েন্ট। এটি ভারত মহাসাগরকে প্রশান্ত মহাসাগরের সাথে সংযুক্ত করে এবং অত্যন্ত মূল্যবান শক্তি সম্পদ (তেল ও এলএনজি) এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান পথ। গ্রেট নিকোবরের গালাথিয়া উপসাগর 60 চ্যানেল থেকে প্রায় 45 কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যা মালাক্কা প্রণালীকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপের দিকে যাওয়া সামুদ্রিক পথগুলির সাথে সংযুক্ত করে। অনুমান করা হয় যে প্রতি বছর প্রায় এক লক্ষ জাহাজ মালাক্কা প্রণালী 60 চ্যানেল পথ দিয়ে যাতায়াত করে। মালাক্কা, সুন্দা এবং লোম্বকের মতো কৌশলগত চোকপয়েন্টগুলির কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ার কারণে এই দ্বীপ ভারতকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা প্রদান করে। কোনো গুরুতর সামুদ্রিক শক্তি এমন ভৌগোলিক তথ্য উপেক্ষা করার ঝুঁকি নিতে পারে না। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে (আইওআর) অনেক শক্তিশালী দেশ বন্দর, লজিস্টিক ব্যবস্থা, সামুদ্রিক প্রবেশাধিকার সুবিধা, নৌ সম্পদ, নজরদারি ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক করিডোরের মাধ্যমে ক্রমাগত তাদের উপস্থিতি বিস্তার করছে। ভারতের উত্তর দ্বিধাগ্রস্ত হতে পারে না। তার উত্তর কৌশলগত সুদৃঢ়করণ হওয়া উচিত। সার্বভৌমত্ব কেবল মানচিত্রে সীমানা টেনে দিলেই সুদৃঢ় হয় না। এটি তখন শক্তিশালী হয় যখন কোনো ভূখণ্ড সংযুক্ত, জনবহুল, সুবিধাযুক্ত, উৎপাদনশীল এবং কৌশলগতভাবে উপযোগী হয়। আন্তর্জাতিক কন্টেইনার ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট, গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর, টাউনশিপ এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি আলাদা আলাদা প্রকল্প নয়। এই সমস্ত একত্রিত হয়ে সেই বাস্তুতন্ত্র (ইকোসিস্টেম) তৈরি করে, যার সাহায্যে ভারত একটি নির্ণায়ক সামুদ্রিক স্থানে নির্ভরযোগ্য, টেকসই এবং বহুমুখী উপস্থিতি বজায় রাখতে পারে। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল যথাযথ তদন্ত-পড়তাল এবং আপত্তির নিষ্পত্তির পর এটি স্বীকার করেছে যে এই প্রকল্পটি কেবল দ্বীপ এবং তার আশেপাশের কৌশলগত অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যই নয়, বরং প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিঙ্গাপুর কেবল এই কারণে একটি মহান সামুদ্রিক কেন্দ্র হয়ে ওঠেনি যে তার ভৌগোলিক অবস্থান অনুকূল ছিল। সে সেই স্থানের আশেপাশে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা তৈরি করেছে। ভৌগোলিক অবস্থান তাকে সুযোগ দিয়েছে, এবং তার অবকাঠামোগত উন্নয়ন সেই সুযোগকে প্রভাবে রূপান্তরিত করেছে। ভারত মহাসাগরে ডিয়েগো গার্সিয়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ উপস্থাপন করে। এটি দেখায় যে কোনো দূরবর্তী দ্বীপও, যদি তাকে লজিস্টিক এবং অপারেশনাল অবকাঠামো দিয়ে সজ্জিত করা হয়, তাহলে অসাধারণ কৌশলগত গুরুত্ব অর্জন করতে পারে। সামুদ্রিক শক্তি কেবল ভূগোল থেকে তৈরি হয় না; এটি ভূগোলের ব্যবহার করার প্রয়োজনীয় ক্ষমতা বিকাশের মাধ্যমে নির্মিত হয়। গ্রেট নিকোবর ভারতকে এই সমস্ত কিছু একটি ভারসাম্যপূর্ণ এবং নির্দিষ্ট ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গির সাথে করার সুযোগ প্রদান করে। এটি বাণিজ্যকে উৎসাহিত করতে পারে এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে সুদৃঢ় করতে পারে, বিদেশী ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্রগুলির উপর নির্ভরতা কমাতে পারে, পাশাপাশি ভারতের সামুদ্রিক প্রবেশাধিকারকে প্রসারিত করতে পারে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য একটি প্রবেশদ্বার এবং ব্যাপক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য একটি কৌশলগত মঞ্চ হিসাবে কাজ করতে পারে। গ্রেট নিকোবরে একটি ট্রান্সশিপমেন্ট পোর্ট ভারতের সেই সামগ্রীর উপর নির্ভরতা কমাতে পারে যা বর্তমানে বিদেশী বন্দরগুলির মাধ্যমে ট্রান্সশিপ করা হয়। এর ফলে সাপ্লাই চেইন সুদৃঢ় হবে, বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে এবং ভারত তার সামগ্রীর চলাচলের উপর অধিক নিয়ন্ত্রণ ও নিশ্চিততা অর্জন করবে। নিঃসন্দেহে, গ্রেট নিকোবর পরিবেশগত দিক
বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে ভারতের অর্থনৈতিক দৃঢ়তা
সকাল সকাল ডেস্ক ড. ময়ঙ্ক চতুর্বেদী পশ্চিম এশিয়ায় চলমান উত্তেজনা, বৈশ্বিক বাণিজ্যে মন্দা এবং উন্নত অর্থনীতির দুর্বল চাহিদার মধ্যে যদি কোনো দেশ আজ তুলনামূলকভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে দেখা যায়, তবে তা হলো ভারত। অর্থবছর ২০২৬-২৭-এর শুরুতে প্রকাশিত জিএসটি সংগ্রহ, উৎপাদন কার্যক্রম এবং পরিষেবা খাতের পরিসংখ্যান ভারতীয় অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থানকে নির্দেশ করছে। প্রকৃতপক্ষে, মে ২০২৬-এ মোট জিএসটি সংগ্রহ প্রায় ১.৯৪ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছানো এই ইঙ্গিত দেয় যে অর্থনৈতিক কার্যক্রমের পরিধি ক্রমাগত বাড়ছে। যদিও শীর্ষ স্তরে এই বৃদ্ধি মাত্র ৩.২ শতাংশ দেখা যায়, তবে রিফান্ড সমন্বয়ের পর প্রকৃত রাজস্ব বৃদ্ধি প্রায় ৯ থেকে ১০ শতাংশে পৌঁছে যায়। এটি নির্দেশ করে যে অর্থনীতিতে ভোগ এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ভিত্তি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী রয়েছে। অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ৪.৩৭ লক্ষ কোটি টাকার মোট জিএসটি সংগ্রহ সরকারের জন্যও স্বস্তির বিষয়, কারণ এটি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। এপ্রিল মাসে পণ্য সম্পর্কিত করযোগ্য সরবরাহে প্রায় ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি এবং সমস্ত প্রধান পণ্য বিভাগে সম্প্রসারণ এটি নির্দেশ করে যে ভারতীয় ভোক্তারা এখনও ব্যয় করার অবস্থানে রয়েছেন। গ্রামীণ ও শহুরে চাহিদার উন্নতি, অবকাঠামোতে সরকারি বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি বাজারে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে। এখানে বিশেষ বিষয় হলো, এই বৃদ্ধি কেবল কিছু নির্বাচিত খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ব্যাপক স্তরে দেখা যাচ্ছে, যা যেকোনো অর্থনীতির জন্য একটি স্বাস্থ্যকর লক্ষণ বলে বিবেচিত হয়। পরিষেবা খাতের পারফরম্যান্সও ভারতের উন্নয়ন গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে। মে মাসে সার্ভিসেস পিএমআই ৫৯.৮-এ পৌঁছানো সেই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রমাণ, যেখানে ভারত ধীরে ধীরে একটি পরিষেবা-প্রধান বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তার পরিচয় শক্তিশালী করছে। পণ্য পরিবহন, ডিজিটাল পরিষেবা, ই-কমার্স, বিনোদন এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো খাতে ক্রমবর্ধমান চাহিদা নতুন ব্যবসাকে গতি দিয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি বাজার থেকে প্রাপ্ত অর্ডারের উন্নতি এটি নির্দেশ করে যে বৈশ্বিক স্তরে ভারতীয় পরিষেবাগুলির গ্রহণযোগ্যতা ক্রমাগত বাড়ছে। আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এপ্রিল মাসে রপ্তানিভিত্তিক পরিষেবার চাহিদায় যে দুর্বলতা দেখা গিয়েছিল, তা মে মাসে অনেকটাই দূর হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলি থেকে ক্রমবর্ধমান চাহিদা এই ইঙ্গিত দেয় যে ভারত অভ্যন্তরীণ ভোগের শক্তির সঙ্গে আজ বৈশ্বিক পরিষেবা অর্থনীতিতেও তার অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করছে। উৎপাদন খাতের পরিসংখ্যানও উৎসাহব্যঞ্জক। মে মাসে ম্যানুফ্যাকচারিং পিএমআই ৫৫.০-এ পৌঁছানো নির্দেশ করে যে উৎপাদন, ক্রয় এবং নতুন অর্ডারে ক্রমাগত সম্প্রসারণ হচ্ছে। বিশেষ করে ইন্টারমিডিয়েট এবং ক্যাপিটাল গুডস খাতে দ্রুত বৃদ্ধি এই ইঙ্গিত দেয় যে শিল্প ভবিষ্যতের চাহিদা নিয়ে আশাবাদী। অবকাঠামো প্রকল্পগুলিতে বিনিয়োগ এবং বেসরকারি খাতের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ উৎপাদন কার্যক্রমকে নতুন ভিত্তি প্রদান করেছে। এখানে এটিও একটি সত্য যে রপ্তানি অর্ডারের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর ছিল, তবে এশিয়া, আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়া থেকে প্রাপ্ত চাহিদা এই খাতকে ভারসাম্য প্রদান করেছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে চিত্রটি মিশ্র। পরিষেবা খাতে নিয়োগের গতি শক্তিশালী ছিল এবং গত এক বছরে এটি দ্বিতীয় দ্রুততম বৃদ্ধি রেকর্ড করেছে। রাজ্য স্তরেও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে দ্রুততার লক্ষণ উৎসাহব্যঞ্জক। কর্ণাটক, মহারাষ্ট্র, উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্র প্রদেশ এবং কেরালার মতো রাজ্যগুলিতে জিএসটি সংগ্রহের শক্তিশালী বৃদ্ধি এটি নির্দেশ করে যে উন্নয়নের সুবিধা কিছু খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সর্বত্র বিস্তৃত। এই পরিস্থিতিতে, এটাই বলতে হবে যে ভারতের অর্থনীতি বর্তমানে এমন একটি মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তার কাছে সুযোগের পর সুযোগ রয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে চ্যালেঞ্জ নেই বা কম আছে, সেগুলিও অনেক। তবে ভারতীয় পেশাদাররা যেভাবে সেই সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছেন, সেই উৎসাহ এবং যোগ্যতা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই কারণেই আজ শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন, সম্প্রসারিত পরিষেবা খাত এবং স্থিতিশীল কর সংগ্রহ অর্থনৈতিক দৃঢ়তার চিত্র তুলে ধরছে। এর সঙ্গে যে বিষয়টি বোঝার আছে, তা হলো আমদানির উপর নির্ভরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সীমিত গতি, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং ব্যয় সংক্রান্ত চাপ আমরা যত বেশি কমাতে পারব, তা ভারতের জন্য তত বেশি মঙ্গলজনক হবে। বর্তমান পরিসংখ্যান অবশ্যই আশা জাগায় যে বৈশ্বিক অস্থিরতার সময়েও ভারত উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে টিকে থাকতে পারে। তবে এটি সমানভাবে এই দায়িত্বের অনুভূতিও জাগিয়ে তোলে যে এই আশাকে স্থিতিশীলতা দিতে নীতিগত সতর্কতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের গতি বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি, যার জন্য আমাদের প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
জনপ্রিয়তা অম্লান, রেডিও আজও প্রাসঙ্গিক
সকাল সকাল ডেস্ক সিদ্ধার্থ রায়, পাটনা সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিভিশন এবং স্মার্টফোনের আধিপত্যের এই যুগেও, রেডিও মানুষের জীবনে এক বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে, যা পুরোনো স্মৃতি আর প্রাসঙ্গিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটায়। বহু যুগ ধরে রেডিও তথ্য, শিক্ষা এবং বিনোদনের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে কাজ করে আসছে। ভোরবেলার ভক্তিগীতি থেকে শুরু করে সংবাদ বুলেটিন এবং আলাপচারিতামূলক অনুষ্ঠান পর্যন্ত, এটি সারা দেশের প্রতিটি ঘরে এক বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে আছে। আজও ছোট ছোট দোকান, অটোরিকশা, পেট্রোল পাম্প এবং শপিং মলে রেডিওর শব্দ শোনা যায়, যা এর গভীর সামাজিক প্রভাবেরই প্রতিফলন।রেডিওর বিশ্বাসযোগ্যতা ও সহজলভ্যতা একে অন্যদের থেকে আলাদা করে রেখেছে। বিনোদনের বাইরেও এটি কৃষি, স্বাস্থ্য, বিজ্ঞান এবং সমসাময়িক ঘটনাবলির ওপর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে, যা একে গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকায় বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। দ্রুতগতির আধুনিক জীবনের মাঝে, রেডিও সংযোগ ও সচেতনতার একটি সহজ এবং নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে কাজ করে। টেলিভিশনের প্রতি মুগ্ধ গণমাধ্যম পর্যবেক্ষকেরা আত্মবিশ্বাসের সাথে রেডিওর আসন্ন মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তাদের মতে, বসার ঘরের আরামদায়ক পরিবেশে চলমান ছবি দেখার রোমাঞ্চের সাথে এই মাধ্যমটির তুলনা চলে না। বিগত দশকগুলোর রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে একটি গোটা তরুণ প্রজন্মের বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে ওঠা রক-অ্যান্ড-রোলের আবির্ভাব, রেডিওর জন্য আগের চেয়ে বৃহত্তর শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করে এবং অমঙ্গলবাদীদের ভবিষ্যদ্বাণীকে ভুল প্রমাণ করে। হ্যাঁ, রেডিও এখনও প্রাসঙ্গিক। যদিও বিশ্ব ডিজিটাল হয়ে গেছে একথা বলা সহজ, রেডিও কিন্তু মরে যায়নি। আজও, মুম্বাইয়ের সাম্প্রতিক বন্যার মতো দুর্যোগের সময় রেডিওর ভূমিকা অনস্বীকার্য। টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের রমরমা বাজারেও প্রতিটি দশকেই রেডিও টিকে থাকার চূড়ান্ত মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের রুচির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে। ১৯৮০ ও ‘৯০-এর দশকে, এটি শ্রোতা-চালিত অনুষ্ঠানের উপর অধিক জোর দেওয়ার মাধ্যমে পার্সোনাল ভিডিও রেকর্ডার এবং ডিজিটাল কমপ্যাক্ট ডিস্কের সৃষ্ট হুমকি মোকাবেলা করেছিল। ‘৯০-এর দশকের শেষের দিকে এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে, রেডিও স্টেশনগুলো বিশেষ শ্রোতাগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে নিজেদের নতুন করে সাজিয়ে তুলছিল: নির্দিষ্ট ধরনের বিষয়বস্তুর জন্য নিবেদিত স্টেশন ছিল — যেমন টক রেডিও, পাঙ্ক রক স্টেশন, এমনকি এমন স্টেশনও ছিল যা দিনে ২৪ ঘণ্টা একটিমাত্র ব্যান্ডের গান বাজাত — যা স্পটিফাই এবং আইটিউনসের আবির্ভাবের এক দশক বা তারও বেশি সময় আগে থেকেই অনুমান করা হয়েছিল। বর্তমানে ভারতজুড়ে ১৮০টিরও বেশি কমিউনিটি রেডিও স্টেশন রয়েছে, যেগুলো বুন্দেলখণ্ডী, গাড়োয়ালি, অবধী এবং সাঁওতালির মতো ভাষায় সম্প্রচার করে—যে ভাষাগুলো সাধারণত টেলিভিশনে খুব কম বা একেবারেই জায়গা পায় না। দুর্যোগ ও বিপর্যয়ের সময়েও রেডিওই শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০০৪ সালের সুনামি এবং ২০১৩ সালের উত্তরাখণ্ডের বন্যার মতো পরিস্থিতিতে, যখন অন্যান্য মাধ্যমগুলো দুর্গম হয়ে পড়েছিল, তখন ত্রাণকার্য, সাহায্য এবং পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টা সম্পর্কিত তথ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে রেডিও এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর মাসিক অনুষ্ঠান ‘মন কি বাত’-এর মাধ্যমে এই মাধ্যমটির প্রতি আগ্রহ পুনরুজ্জীবিত করার কৃতিত্বের অধিকারী। এই উদ্যোগটি রেডিওকে জাতীয় আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে এবং পরিবার ও সম্প্রদায়কে একসঙ্গে এটি শোনার জন্য উৎসাহিত করেছে। ‘পরীক্ষা পে চর্চা’-র মতো অনুষ্ঠানগুলো তরুণ শ্রোতাদের এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আরও সংযুক্ত করেছে, যার ফলে এর শ্রোতা সংখ্যা প্রসারিত হয়েছে। জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও সারাদেশে টেলিভিশন সংযোগ উপলব্ধ নয়, কিন্তু রেডিও ৯৯ শতাংশেরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়। এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী জনগণের কাছে পৌঁছানোর জন্য রেডিওকে বেছে নিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে মাদকাসক্তি, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সুবিধাবঞ্চিত ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সমস্যার মতো বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রেডিও শ্রোতাদের অভিজ্ঞতাকে ব্যক্তিগত করে তোলে এবং ঘটে চলা ঘটনা অনুধাবন করতে তাদের কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগাতে উদ্বুদ্ধ করে। “টিভি প্রত্যেককে একটি প্রতিচ্ছবি দেয়, কিন্তু রেডিও লক্ষ লক্ষ মস্তিষ্কে লক্ষ লক্ষ প্রতিচ্ছবির জন্ম দেয়,” লিখেছিলেন আমেরিকান লেখিকা মার্গারেট ‘পেগি’ নুনান। এমন এক যুগে যেখানে ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী তৈরি বিষয়বস্তুকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, তাঁর এই পঙক্তিগুলো এই মাধ্যমটির অপরিসীম নমনীয়তা এবং অবিচ্ছিন্ন প্রাসঙ্গিকতার এক নিখুঁত সারসংক্ষেপ তুলে ধরে।রেডিও এমন একটি যন্ত্র যা সঙ্গে নিয়ে ঘোরা যায়, যার জন্য ডেটা স্ট্রিমিং বা ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের প্রয়োজন হয় না এবং এটি বিনামূল্যে পাওয়া যায়। ১৯৯৫ সালের সুপ্রিম কোর্টের রায়, যা বেতার তরঙ্গকে জনসাধারণের সম্পত্তি হিসাবে ঘোষণা করে, ভারতকে একটি ‘সাংস্কৃতিক সম্প্রচার ব্যবস্থার’ সম্ভাবনার কাছাকাছি নিয়ে আসে যা ‘এটি যে সম্প্রদায়ের সেবা করে তাদের স্বার্থ এবং চাহিদা প্রতিফলিত করার জন্য পুরোপুরি খাপ খায় এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষদের সামাজিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে এবং সাংস্কৃতিকভাবে নিজেদের প্রকাশ করার সুযোগ দেয। যদিও এই রায়ের ফলে অবিলম্বে ভারত জুড়ে কমিউনিটি রেডিও প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তবে এটি সম্প্রচার মাধ্যমের উপর রাষ্ট্রের একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে দিয়ে অ-রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলিকে এই ক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ করে দেয়। ১৯৯৯ সালে, ভারত সরকার বেসরকারি বাণিজ্যিক রেডিও স্টেশন স্থাপনের অনুমতি দেয় এবং পরে, ২০০৩ সালে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিকে তাদের ক্যাম্পাস থেকে সম্প্রচার করার অনুমতি দিয়ে এই পরিধি আরও প্রসারিত করা হয়। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রায় এক দশক পর, ২০০৬ সালে, ভারত সরকার একটি কমিউনিটি রেডিও নীতি ঘোষণা করে, যা অবশেষে সম্প্রদায়-ভিত্তিক সংস্থা এবং বেসরকারি সংস্থাগুলিকে তাদের নিজস্ব রেডিও স্টেশন স্থাপন ও পরিচালনা করার অনুমতি দেয়। ২০০৬ সালের নীতিমালা সেইসব জনগোষ্ঠীর জন্য বেতার সম্প্রচারের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়, যাদের পূর্বে এই ধরনের গণমাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ ছিল না।
শক্তির রাজনীতি ও রাষ্ট্রসঙ্ঘের নীরবতা : বিশ্বব্যবস্থার এক গভীর সংকট
একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীকে আমরা প্রায়ই সভ্যতার এক উন্নত পর্যায় বলে মনে করি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের জাগরণ— সব মিলিয়ে মনে হয় মানবজাতি যেন বহু অন্ধকার যুগ অতিক্রম করে এক নতুন নৈতিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিন্তু বাস্তবের বিশ্বরাজনীতি অনেক সময় সেই আশাবাদকে ভেঙে দেয়। সভ্যতার ঝকঝকে মুখোশের আড়ালে এখনও শক্তির উন্মত্ততা, ক্ষমতার অহংকার এবং যুদ্ধের ভয়াবহ সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।
ইউনিফর্ম সিভিল কোড নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্যের প্রভাব
সকাল সকাল ডেস্ক ড. ময়ঙ্ক চতুর্বেদী ভারত একটি বহু-ধর্মীয়, বহু-সাংস্কৃতিক এবং বৈচিত্র্যে ভরা জাতি। এখানে বিভিন্ন ধর্ম, ঐতিহ্য এবং সামাজিক ব্যবস্থার কারণে ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কিত অনেক আইন বিভিন্ন রূপে প্রয়োগ করা হয়েছে। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, দত্তক গ্রহণ এবং পরিবার সম্পর্কিত অন্যান্য বিষয়ে হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, পার্সি এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা ব্যক্তিগত আইন প্রচলিত আছে। কিন্তু একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক জাতি হিসেবে এই প্রশ্নটি দীর্ঘকাল ধরে উত্থাপিত হচ্ছে যে, একই দেশে নাগরিকদের জন্য আলাদা নাগরিক আইন কি উপযুক্ত? এই প্রেক্ষাপটে, ইউনিফর্ম সিভিল কোডের ধারণাটি সময়ে সময়ে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের একটি মন্তব্য এই বিতর্কে নতুন গতি দিয়েছে। আদালত বলেছে যে, দেশে ইউনিফর্ম সিভিল কোড কার্যকর করার বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার সময় এসেছে, যদিও এই সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের নয়, বরং সংসদের বিষয়। আদালত শরিয়ত আইন 1937-এর কিছু ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা একটি আবেদনের শুনানি করছিল, যেখানে মুসলিম মহিলাদের প্রতি কথিত বৈষম্যের প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। শুনানির সময় আদালত ইঙ্গিত দিয়েছে যে, যদি এই বিধানগুলি বাতিল করা হয়, তবে আইনে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি হতে পারে এবং এর স্থায়ী সমাধান ইউনিফর্ম সিভিল কোডের মাধ্যমেই সম্ভব। আসলে, ইউনিফর্ম সিভিল কোডের প্রশ্নটি কেবল একটি আইনি ব্যবস্থার বিষয় নয়, এটি সংবিধানে নিহিত সমতা, ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতার মূল্যবোধের সাথেও জড়িত। তাই এই বিষয়টি কেবল আদালত বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজ, রাজনীতি এবং সাংবিধানিক আদর্শের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপনের একটি চ্যালেঞ্জও। সংবিধানে নিহিত ধারণা ইউনিফর্ম সিভিল কোডের ধারণা ভারতীয় সংবিধানে শুরু থেকেই বিদ্যমান। সংবিধানের 44 অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্র সারা দেশে নাগরিকদের জন্য একটি অভিন্ন নাগরিক সংহিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে। এই বিধানটি রাষ্ট্রের নীতি নির্দেশক নীতিগুলির অধীনে রাখা হয়েছে, যার উদ্দেশ্য হল সরকারকে সামাজিক সংস্কারের দিকে নির্দেশনা দেওয়া। সংবিধান সভায় এই বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। সংবিধান প্রণেতা ভীমরাও রামজি আম্বেদকর বিশ্বাস করতেন যে, আধুনিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের অধিকার ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা হওয়া উচিত নয়। যদিও সেই সময়ে দেশের সামাজিক পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আশঙ্কা বিবেচনা করে, এটিকে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করার পরিবর্তে নীতি নির্দেশক নীতিগুলিতে রাখা হয়েছিল। এই ব্যবস্থা এই উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল যে, সময়ের সাথে সাথে সামাজিক সম্মতি তৈরি হলে এটি কার্যকর করা যেতে পারে। ব্যক্তিগত আইনের ঐতিহাসিক পটভূমি ভারতে আলাদা ব্যক্তিগত আইনের ব্যবস্থা ঔপনিবেশিক আমলের অবদান বলে মনে করা হয়। ব্রিটিশ শাসনের সময় বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য বিবেচনা করে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং উত্তরাধিকার সম্পর্কিত বিষয়ে আলাদা আলাদা আইন প্রয়োগ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পরেও এই ব্যবস্থা অব্যাহত ছিল, যদিও সময়ে সময়ে এতে সংস্কার করা হয়েছে। আজও হিন্দুদের জন্য হিন্দু বিবাহ আইন, হিন্দু উত্তরাধিকার আইন এবং অন্যান্য সম্পর্কিত আইন কার্যকর আছে, যখন মুসলমানদের ব্যক্তিগত বিষয়ে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) অ্যাপ্লিকেশন অ্যাক্ট 1937 কার্যকর হয়। একইভাবে খ্রিস্টান এবং পার্সি সম্প্রদায়ের জন্যও আলাদা আলাদা আইন বিদ্যমান। এই বৈচিত্র্য ভারতের সামাজিক কাঠামোর অংশ অবশ্যই,”””কিন্তু অনেক সময় এই ব্যবস্থা সংবিধানে প্রদত্ত সমতা ও ন্যায়বিচারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়। বিশেষ করে নারীর অধিকারের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নটি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে। বিচার বিভাগের দৃষ্টিভঙ্গি ভারতীয় বিচার বিভাগ সময়ে সময়ে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলায় আদালত মন্তব্য করেছে যে, বিভিন্ন ব্যক্তিগত আইনের কারণে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে। আদালতের আরও মত ছিল যে, যখন ব্যক্তিগত আইনের কারণে নারীর অধিকার প্রভাবিত হয়, তখন সংবিধানে নিহিত সমতার নীতিকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। সাম্প্রতিক শুনানিতেও সুপ্রিম কোর্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে, যদি ব্যক্তিগত আইনের কিছু বিধান বাতিল করা হয়, তবে তার পরিবর্তে একটি ব্যাপক ও অভিন্ন দেওয়ানি আইনের প্রয়োজন হবে। নারীর অধিকারের ক্ষেত্রে গুরুত্ব অভিন্ন দেওয়ানি বিধির আলোচনা প্রায়শই নারীর অধিকারের প্রসঙ্গে বেশি হয়। ভারতে অনেক ব্যক্তিগত আইনে নারীর অধিকার পুরুষের তুলনায় সীমিত ছিল। কিছু সম্প্রদায়ে বহুবিবাহের অনুমতি, বিবাহবিচ্ছেদের অসম প্রক্রিয়া এবং উত্তরাধিকার সূত্রে কম অংশ পাওয়ার মতো বিষয়গুলি দীর্ঘকাল ধরে বিতর্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নারীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির উদ্দেশ্য হল এই বৈষম্যগুলি দূর করে এমন একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে সকল নাগরিক সমান অধিকার লাভ করবে এবং আইন ধর্মের পরিবর্তে নাগরিকত্বের ভিত্তিতে প্রয়োগ হবে। জাতীয় ঐক্য ও ধর্মনিরপেক্ষতা ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ হল রাষ্ট্র সকল ধর্মের প্রতি সমান দৃষ্টিভঙ্গি রাখবে। যদি নাগরিক আইন ধর্মের ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন হয়, তবে এই নীতি বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অভিন্ন দেওয়ানি বিধির উদ্দেশ্য ধর্মীয় ঐতিহ্যকে বিলুপ্ত করা নয়, বরং নাগরিক অধিকারকে ধর্ম থেকে আলাদা করা। বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ এবং উত্তরাধিকারের মতো বিষয়গুলি মূলত নাগরিক অধিকারের সঙ্গে জড়িত, তাই এগুলির ওপর অভিন্ন আইন থাকা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করা হয়। উত্তরাখণ্ডে প্রাথমিক পরীক্ষা ভারতে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার দিকে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ উত্তরাখণ্ডে নেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার এটি কার্যকর করে বিবাহের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, সম্পত্তিতে ছেলে-মেয়ের সমান অধিকার এবং বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ সম্পর্কিত অভিন্ন নিয়মের ব্যবস্থা করেছে। এটিকে দেশে একটি পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদি এই ব্যবস্থা সফল হয়, তবে ভবিষ্যতে জাতীয় স্তরে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকর করার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মডেল হতে পারে। রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সংবিধান সভা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই বিষয়টি সময়ে সময়ে আলোচনায় এসেছে। অনেকে এটিকে সামাজিক সংস্কার এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে মনে করেন, যখন কিছু সম্প্রদায়ের আশঙ্কা যে, এর ফলে তাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে, তাই এই বিষয়টি কেবল আইন প্রণয়নের প্রশ্ন নয়, বরং ব্যাপক সামাজিক সংলাপ এবং বিশ্বাস গঠনেরও প্রয়োজন রয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায় যে, সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক মন্তব্য স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এই বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করার সময় এসেছে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সংসদকেই নিতে হবে। যদি অভিন্ন দেওয়ানি বিধি সংবিধানের চেতনা, সামাজিক সম্মতি এবং সকল সম্প্রদায়ের অধিকারকে মাথায় রেখে কার্যকর করা হয়, তবে এটি আরও ন্যায়পূর্ণ, আধুনিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ভারত গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বৈশ্বিক সংঘাতের মধ্যে ভারতীয় অর্থনীতি: এটি সংকট নয়, সতর্কতা এবং সুযোগের সময়
সকাল সকাল ডেস্ক -ডা. ময়ঙ্ক চতুর্বেদী পশ্চিম এশিয়ার উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরায়েল, ইরান এবং আমেরিকার সাথে জড়িত সামরিক ঘাঁটিগুলির আশেপাশে যুদ্ধসদৃশ পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী আর্থিক বাজার, জ্বালানি সরবরাহ এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। প্রতিবারই দেখা গেছে যে যখনই উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত বাড়ে, তার সরাসরি প্রভাব বৈশ্বিক তেল বাজার, মুদ্রাস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের উপর পড়ে। স্বাভাবিকভাবেই, ভারতের মতো একটি বড় আমদানিকারক দেশ নিয়েও নানা ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, কিন্তু এই আশঙ্কাগুলির মধ্যে একটি শক্তিশালী এবং আশ্বস্ত করার মতো সত্যও সামনে আসছে যে ভারতের অর্থনীতি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, সুষম এবং প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। যদি উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ীও হয়, তাহলেও ভারতের উপর তার প্রভাব সীমিত থাকবে। এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো ভারতের অর্থনৈতিক নীতি, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং বাজারের দৃঢ়তা এখন বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সক্ষম হয়েছে। সতর্কতা, প্রস্তুতি এবং নীতিনির্ধারকদের সক্রিয়তা উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা দেখে ভারতীয় নীতিনির্ধারকরা ইতিমধ্যেই সক্রিয় হয়েছেন। এসবিআই রিসার্চের রিপোর্টে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক আর্থিক বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। আরবিআই সরকারি বন্ড অর্থাৎ জি-সেকের ইল্ডকে সুষম রাখতে বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে, যাতে আর্থিক ব্যবস্থায় আতঙ্ক সৃষ্টি না হয়। এর পাশাপাশি, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করে রুপির অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং এটিকে 92-এর নিচে ধরে রাখতে সফল হয়েছে। বস্তুত, এই পদক্ষেপটি দেখাচ্ছে যে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থা বৈশ্বিক সংকটগুলি বুঝতে পেরে সময়মতো প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম। আজ ভারতের কাছে প্রায় 600 বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে, যা যেকোনো বাহ্যিক অর্থনৈতিক ধাক্কা সহ্য করার ক্ষমতা প্রদান করে। এছাড়াও, সোনার রিজার্ভও ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এর অংশ প্রায় 17.6 শতাংশে পৌঁছেছে। এটিও এক ধরনের অর্থনৈতিক সুরক্ষা ঢাল। তেল সংকটের চ্যালেঞ্জ এবং ভারতের কৌশল উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সাথে জড়িত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় 20 শতাংশ অপরিশোধিত তেলের বাণিজ্য হয়। যদি এখানে কোনো বাধা সৃষ্টি হয়, তাহলে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্রেন্ট ক্রুড প্রায় 91 ডলার প্রতি ব্যারেল এবং ডব্লিউটিআই প্রায় 89 ডলার প্রতি ব্যারেল পর্যন্ত পৌঁছেছে। এসবিআই রিসার্চের মতে, যদি তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে 10 ডলার বৃদ্ধি পায়, তাহলে ভারতের চলতি হিসাবের ঘাটতির উপর কিছুটা চাপ পড়তে পারে, কিন্তু এখানে এটি বোঝাও জরুরি যে ভারত গত কয়েক বছরে তার জ্বালানি কৌশলকে যথেষ্ট বৈচিত্র্যপূর্ণ করেছে। রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল ক্রয়, দীর্ঘমেয়াদী সরবরাহ চুক্তি এবং কৌশলগত তেল রিজার্ভের মতো ব্যবস্থাগুলি ভারতকে হঠাৎ আসা সংকট থেকে অনেকটাই রক্ষা করে। বৈশ্বিক উন্নয়নের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে ভারত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক রিপোর্ট এই কথার প্রমাণ যে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ এশিয়া, বিশেষ করে ভারত এবং চীনের হাতে। আইএমএফের মতে, 2026 সালে বৈশ্বিক প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধিতে ভারতের অবদান প্রায় 17 শতাংশ থাকার আশা করা হচ্ছে। এই পরিসংখ্যানটি সেই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত যা গত এক দশকে ভারতে ঘটেছে। আজ ভারত বিশ্বের দ্রুততম ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অর্থনীতি হয়ে উঠেছে। আইএমএফ 2025 সালের জন্য ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার 7.3 শতাংশে উন্নীত করেছে, যখন পরবর্তী অর্থবছরের জন্যও 6.4 শতাংশের শক্তিশালী বৃদ্ধির হার অনুমান করা হয়েছে। এর বিপরীতে, আমেরিকার অবদান প্রায় 9.9 শতাংশ থাকার আশা করা হচ্ছে, যখন অনেক ইউরোপীয় অর্থনীতি ধীর বৃদ্ধি নিয়ে সংগ্রাম করছে। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ভারতের গুরুত্ব ক্রমাগত বাড়ছে। জনসংখ্যার চাপ নয়, উন্নয়নের সুযোগ ভারতের অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা করার সময় প্রায়শই জনসংখ্যাকে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এটি সত্য যে ভারতের জনসংখ্যা অনেক বড়, কিন্তু এটিও ততটাই সত্য যে এই জনসংখ্যাই ভারতের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তিও। আজ ভারত বিশ্বের বৃহত্তম তরুণ কর্মীবাহিনী ধারণকারী দেশ। এই তরুণ জনসংখ্যা উৎপাদন,ব্যবহার এবং উদ্ভাবন এই তিনটি ক্ষেত্রে নতুন শক্তি যোগান দিচ্ছে। ভারতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্টার্ট-আপ সংস্কৃতি, ডিজিটাল অর্থনীতি, উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ এবং পরিষেবা খাতের দ্রুত বর্ধনশীল কার্যকলাপ কর্মসংস্থান সৃষ্টির নতুন পথ খুলে দিচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সংস্থাগুলিও চীনের পর এখন ভারতকে তাদের নতুন উৎপাদন কেন্দ্র হিসাবে দেখছে। “চীন প্লাস ওয়ান” কৌশলের অধীনে অনেক বহুজাতিক সংস্থা ভারতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে ভারতের স্থিতিশীল ভাবমূর্তি। বৈশ্বিক সংকটের সময়ে বিনিয়োগকারীরা সর্বদা এমন দেশগুলির সন্ধান করেন যেখানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে। ভারত এই মুহূর্তে সেই শ্রেণীতে দাঁড়িয়ে আছে বলে মনে হয়। বিশ্বের অনেক রেটিং এজেন্সি এবং অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্রমাগত এই বিষয়টি নিশ্চিত করছে যে ভারতের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত। পরিকাঠামোতে দ্রুত বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ভারতকে একটি নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগ গন্তব্যে পরিণত করেছে। এই কারণেই বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও বিদেশী বিনিয়োগ ভারতের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে। তবে এটি বলাও ভুল হবে যে উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাত ভারতকে একেবারেই প্রভাবিত করবে না। তেলের দাম বৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতির চাপ এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতার মতো চ্যালেঞ্জ সামনে আসতে পারে, কিন্তু ভারতের অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি এই চ্যালেঞ্জগুলি বুঝে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। আরবিআই-এর সতর্ক নীতি, সরকারের শক্তি কৌশল এবং শক্তিশালী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভারতকে এই পরিস্থিতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। এটি সেই পরিপক্কতা যা একটি অর্থনীতিকে বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও স্থিতিশীল রাখে। আজ উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাত নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের বিষয়। তেল বাজারের অস্থিরতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বের অনেক দেশের জন্য অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন। শক্তিশালী নীতি, সক্রিয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বৈচিত্র্যময় শক্তির উৎস, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার এবং তরুণ কর্মীবাহিনী – এই সমস্ত কারণ ভারতকে বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও এগিয়ে যাওয়ার শক্তি দেয়। তাই এটি আতঙ্কিত হওয়ার সময় নয়, বরং সতর্কতা এবং আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে যাওয়ার সময়।
ভারতীয় দল পরাক্রম ও দক্ষতা দিয়ে টি-২০ বিশ্বকাপ জয় করেছে
সকাল সকাল ডেস্ক -আচার্য পন্ডিত পৃথ্বীনাথ পান্ডে ৮ই মার্চের তারিখটি ভারতীয় ক্রিকেটের দৃষ্টিকোণ থেকে দেশকে গর্বিত করার মতো ছিল এবং সবার চোখ সন্ধ্যা ৭টায় গুজরাটের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের পিচে স্থির ছিল। সমস্ত জল্পনা-কল্পনা উড়িয়ে দিয়ে, যখন ভারত টি-২০ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে একতরফা মনে হওয়া ম্যাচে ৯৬ রানে পরাজিত করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ চুম্বন করে, তখন যেন ঘড়িও কিছুক্ষণের জন্য থমকে গিয়েছিল। অভিষেক শর্মার ধারাবাহিক ব্যর্থতা দেখে, তাকে ফাইনালে রাখা হবে কি না, তা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছিল; অবশেষে, তাকে সুযোগ দেওয়া হয় এবং তিনি অতীতের পৃষ্ঠাগুলিকে উপেক্ষা করে, এমন একটি পৃষ্ঠায় তার পরাক্রম ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন, যা অবিস্মরণীয় হয়ে গেছে এবং স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হয়েছে। টি-২০ বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথমবার হয়েছে যে প্রথম তিনজন ব্যাটার অর্ধশতক করেছেন। শুধু তাই নয়, পাওয়ার-প্লেতে কোনো উইকেট না হারিয়ে ৯২ রানের স্কোর করাও একটি রেকর্ড হয়ে গেছে। নিউজিল্যান্ড টস জিতে প্রথমে বোলিং করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা কিছুটা সঠিক মনে হচ্ছিল না। ভারতীয় দল এই সুযোগটি লুফে নেয়। যখন সঞ্জু স্যামসন, অভিষেক শর্মা এবং ঈশান কিষাণ ব্যাটিং করছিলেন, তখন বোলিং খুব সাধারণ মানের মনে হচ্ছিল। শুরুর এক-দু’ওভার পর্যন্ত ভারতীয় ব্যাটাররা বলের প্রকৃতি বুঝেছিলেন, তারপর তাদের মেজাজ বদলে যায় এবং ছক্কা-চার দিয়ে দর্শক ও শ্রোতাদের প্রচুর মনোরঞ্জন হতে থাকে। সঞ্জু স্যামসন, অভিষেক শর্মা, ঈশান কিষাণ এবং শিবম দুবের ব্যাটের কামাল ছিল যে ভারতীয় দলের স্কোর ২৫০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এক সময় এমনও ছিল, যখন ভারতের স্কোর প্রায় ৩০০ রান দেখাচ্ছিল। চারজনই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছিলেন, যখন অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব এসে একটি বেপরোয়া শট খেলে ভারতকে প্রায় ৫০ রান পিছিয়ে দেন; কারণ এরপর ‘আয়া রাম-গয়া রাম’-এর দৃশ্য দেখা যেতে থাকে। ১৬তম ওভারে ২০৪ রানের মাথায় ভারতের ৪ উইকেট পড়ে গিয়েছিল। বোঝা যাচ্ছিল না যে নিউজিল্যান্ডের বোলার নিশাম ভারতীয় ব্যাটারদের উপর কোন জাদু করেছেন, যে হঠাৎ একের পর এক তিনটি উইকেট – সঞ্জু স্যামসন, ঈশান এবং সূর্যকুমার যাদবের পড়তে থাকে। এরপর একই স্কোরে ডাফির বলে হার্দিক পান্ডিয়ার ক্যাচ পড়েছিল। তিনজনই অপ্রয়োজনীয় শট খেলেছিলেন। একটু থমকে যাওয়া উচিত ছিল কারণ রান তো হচ্ছিলই। সঞ্জু স্যামসনও তার আগের স্টাইলে ফাইনালেও অর্ধশতকীয় ইনিংস (৪৬ বলে ৮৯ রান) খেলেছিলেন। অভিষেক ২১ বলে অর্ধশতক করেছিলেন। ঈশানও অর্ধশতক (২৫ বলে ৫৪ রান) করে তার যোগ্যতা প্রমাণ ও দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তিনজনের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের ফলস্বরূপই ভারতীয় দলের স্কোর সেখানে পৌঁছে গিয়েছিল, যা কেউ আশা পর্যন্ত করেনি। হার্দিককে আক্রমণাত্মক পারফরম্যান্স করার জন্য আগেই পাঠানো হয়েছিল; কিন্তু তিনি নিষ্ক্রিয় দেখাচ্ছিলেন, যার ফলস্বরূপ শেষ ১৪ বলে তিন উইকেট হারিয়ে মাত্র ৯ রান হয়। যে স্কোর ৩০০ রান পর্যন্ত দেখাচ্ছিল, তা পুরোপুরি সংকুচিত হয়ে যায়। তিনজনের আউট হওয়ার সাথে সাথেই রানের জন্য হাহাকার দেখা যেতে থাকে। নিউজিল্যান্ডের বোলাররা ১৫তম ওভার থেকে রানের উপর লাগাম টেনে ধরেছিল। এক সময় ছিল, যখন ভারতীয় দলের রান-গড় ১৫-১৬ ছিল। বোলিংয়ে নিউজিল্যান্ডের অপ্রত্যাশিত প্রত্যাবর্তন দেখা যাচ্ছিল। তিনজনের সংযত থাকা উচিত ছিল; কিন্তু তারা বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল। হেনরি হার্দিককে আউট করে দিয়েছিলেন। বোলাররা ইয়র্কার থেকে দূরে থেকে বলের উপর নানাভাবে আঙুল ঘুরিয়ে দুর্দান্ত বোলিং করছিলেন। গত চার ওভারে (১৬ থেকে ১৯) মাত্র ২৮ রান এসেছিল। এবার শিবম দুবের পালা ছিল, যিনি শেষ ওভারে চার বলে ২৪ রান (দুটি ছক্কা এবং তিনটি চার) করে ভারতকে ২৫৫ রানে পৌঁছে দিয়েছিলেন, যা গত চার ওভার আগে করা খুব কঠিন মনে হচ্ছিল। এইভাবে শিবম মাত্র ৮ বলে অপরাজিত ২৬ রান করে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন। নিঃসন্দেহে, ভারত ২৫৫ রানের স্কোর করে মনস্তাত্ত্বিক সুবিধা নিয়েছিল। নিউজিল্যান্ডের ইনিংস শুরু হয়ে গিয়েছিল। ভারতীয় বোলাররা তাদের উপর কার্যকর দেখাচ্ছিলেন। ভারতীয় দল তখন জোরদার ধাক্কা খেয়েছিল যখন আর্শদীপ সিংয়ের প্রথম ওভারের পঞ্চম বলে শিবম দুবে সাইফার্টের একটি সহজ ক্যাচ ছেড়ে দিয়েছিলেন। সাইফার্ট বিপজ্জনক ব্যাটার, যাদের জীবনদানের ফলস্বরূপ সাইফার্ট হার্দিক পান্ডিয়ার বলে পরপর দুটি ছক্কা মেরেছিলেন। হার্দিকের প্রথম ওভারে ২১ রান করে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটাররা, বিশেষ করে সাইফার্ট তাদের উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দিয়েছিলেন। অ্যালেন যে ব্যাট দিয়ে আকর্ষণীয় পারফরম্যান্স করছিলেন,সেটি পরিবর্তন করে অন্য একটি ব্যাট নিলেন এবং অক্ষর প্যাটেলের পরের বলেই তিলক বর্মার হাতে ক্যাচ তুলে দিলেন। যে রচিন রবীন্দ্র উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে পরিচিত, প্রথম উইকেট পতনের পর এলেন; কিন্তু জসপ্রীত বুমরাহর প্রথম বলেই তার জোরালো ক্যাচ লং-অনে দাঁড়ানো ঈশান কিষাণ লুফে নিলেন, যদিও বলটি ছিটকে গিয়েছিল তবুও ঈশান দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় সেটি ধরে ফেললেন। পঞ্চম ওভারের পঞ্চম বলে অক্ষর প্যাটেল বিপজ্জনক দেখা ফিলিপসকে প্যাভিলিয়নের পথ দেখিয়ে দিলেন। ‘পাওয়ার-প্লে’তে প্রচুর রান করা এবং উইকেট বাঁচিয়ে রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু নিউজিল্যান্ড পাওয়ার-প্লেতে ভারতের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল। তাদের পাওয়ার-প্লেতে ৫২ রানে ৩ উইকেট পড়ে গিয়েছিল। সাইফার্টের ক্যাচ ছাড়াটা ব্যয়বহুল প্রমাণিত হলো; কারণ সাইফার্ট মাত্র ২৩ বলে ৫০ রান করেছিলেন। হার্দিক পান্ডিয়া ব্যাটিংয়ে তেমন কিছু করতে পারেননি; কিন্তু তিনি চ্যাপম্যানকে ক্লিন বোল্ড করে দিয়েছিলেন; যদিও তার প্রথম ওভারটি খুব ব্যয়বহুল ছিল। নিজের প্রথম ওভারে ১৫ রান দেওয়া বরুণ চক্রবর্তীও ব্যয়বহুল ছিলেন; কিন্তু তিনিও আক্রমণাত্মক দেখা সাইফার্টকে ঈশান কিষাণের হাতে ক্যাচ করিয়ে মূল্যবান উইকেট নিয়েছিলেন। এভাবে নিউজিল্যান্ডের অর্ধেক ব্যাটসম্যান ৯ ওভারের খেলায় ৮৩ রানের স্কোরে প্যাভিলিয়নে পৌঁছে গিয়েছিল। যখন নিউজিল্যান্ডের পাঁচটি উইকেট পড়ে গিয়েছিল তখন টিভি স্ক্রিনে মহেন্দ্র সিং ধোনি, রোহিত শর্মা, কপিল দেব এবং জয় শাহের মুখ দেখানো হয়েছিল। একাদশ ওভারের পঞ্চম বলে সেই অপ্রীতিকর দৃশ্য দেখা গেল, যখন ড্যারিক মিচেলের ব্যাটিং করার সময় তার শট মারার পর অর্শদীপ অফ স্টাম্পে দাঁড়ানো মিচেলের দিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে দ্রুত বল ছুঁড়লেন, যা নিয়ে মিচেল আম্পায়ারের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, তারপর ভারতীয় অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদব এবং অর্শদীপ মিচেলের সাথে হাত মিলিয়ে বিতর্ক শান্ত করলেন। যখন নিউজিল্যান্ডের মহারথীরা ‘আয়ারাম-গয়ারাম’-এর ভূমিকায় দেখাচ্ছিলেন তখন অধিনায়ক স্যান্টনার অধিনায়কোচিত ইনিংস খেললেন; কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। ত্রয়োদশ ওভারটি খুব রোমাঞ্চকর ছিল, যেখানে অক্ষরের প্রথম বলে হার্দিক ড্যারিক মিচেলের একটি সহজ ক্যাচ ছাড়লেন এবং দ্বিতীয় বলে একটি খারাপ ফিল্ডিং করে চার রান দিলেন; কিন্তু ঈশান কিষাণ ছাড়লেন না। তিনি অক্ষরের বলে মিচেলের ক্যাচ লুফে নিলেন। অক্ষর প্যাটেলের বোলিং দুর্দান্ত ছিল, যিনি তিন ওভারে ২৭ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়েছিলেন। এভাবে উনিশতম ওভারে নিউজিল্যান্ডের ৬ উইকেট পড়ে গিয়েছিল এবং ভারতীয় দল নিজেদের দেশে প্রথমবারের মতো টি-২০ বিশ্বকাপ জেতার দিকে অগ্রসর দেখাচ্ছিল। ষোড়শ ওভারের তৃতীয় বলে জসপ্রীত বুমরাহ সপ্তম উইকেট হিসেবে নিশামকে এবং চতুর্থ বলে ম্যাথিউ হেনরিকে ইয়র্কার করে ভারতের জয়ের পথ প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন। সেই নিশামই ছিলেন, যিনি তিনটি আক্রমণাত্মক পারফরম্যান্স করা ভারতীয় ব্যাটসম্যানকে পরপর আউট করেছিলেন। এভাবে নিউজিল্যান্ড সপ্তদশ ওভারে ৮ উইকেটে ১৪৩ রান করেছিল। উনিশতম ওভারে নিউজিল্যান্ডের ৯ উইকেট পড়ে গিয়েছিল। অবশেষে নিউজিল্যান্ড উনিশতম ওভারে মাত্র ১৫৯ রানে অল-আউট হয়ে গিয়েছিল এবং ভারত পরপর দুবার বিশ্বকাপ জেতা বিশ্বের প্রথম দেশ হয়ে গিয়েছিল; তবে এখন তৃতীয়বার (২০০৭, ২০২৪ এবং ২০২৬
নারী মুক্তি আন্দোলনঃ মানব সমাজ সংরচনার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ
সকাল সকাল ডেস্কমনোতোষ মণ্ডল, বোকারো আমাদের সমাজ — মানুষের সমাজ। বস্তুতঃ নারী ও পুরুষের সম্মিলিত সমাজ। বাস্তবে নারী ও পুরুষ দুটো ভিন্ন সত্ত্বা নয় — একই সত্ত্বার দুটো দিক। যেমন, একটি কাগজের দুটো পৃষ্ঠাই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি মানব সমাজ নির্মাণকল্পে নারী ও পুরুষ উভয়েরই ভূমিকা সমভাবে প্রযোজ্য। অতএব সুষ্ঠু সমাজ সংরচনার ক্ষেত্রে কেউ অবজ্ঞেয় নয়, কেউ অপাংক্তেয় নয়। সুতরাং সামাজিক উন্নয়ন কল্পে নারী ও পুরুষ উভয়কেই হাতে হাত মিলিয়ে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, তবেই মানব সমাজ — মানব সমাজ রূপে পরিগণিত হতে পারবে। বাস্তব সত্য এই যে, নারী ও পুরুষ কেউ কারো উপর নির্ভরশীল নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। নারীর অধিকার ও স্বাধীনতা সম্বন্ধে আলোচনা প্রসঙ্গে বিংশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক ও সত্যদ্রষ্টা ঋষি শ্রী প্রভাত রঞ্জন সরকার বলেছেন — ” মানুষের সমাজে কেউ অপাংক্তেয় নয়। একজন এক ‘শ বছরের অতি বৃদ্ধা বিধবা মহিলা তারও জীবনের মূল্য অপরিসীম। এই বিশ্ব সভায় সেও বর্জনীয় নয়, সেও তুচ্ছ নয়। আমরা তার সার্বিক মূল্যায়ন করতে পারিনি বলে ভাবি সে বুঝি পৃথিবীর বোঝা। এরকম ভাবাটাই আমাদের বুদ্ধির অল্পতার কারণ।”অতএব উপরোক্ত বক্তব্যটি থেকে এটাই স্পষ্ট যে, নারী রূপে জন্মগ্রহণ করাটা তার জন্য মোটেই অপরাধের বিষয় নয়, আসল কথাটা হচ্ছে এই যে, তাঁর যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে আমরা পারি না আর তাছাড়া সমাজের উন্নয়নে তাঁর কষ্টার্জিত ভূমিকাকে মোটেই সমর্থন করতে চাই না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে গিয়ে পুরুষ জাতি সর্বদাই নারী জাতির প্রগতিপথ অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করে এসেছে। কারণ একটাই — তাঁরা যেন কোনো মতেই দক্ষতার ক্ষেত্রে এগিয়ে না যায়। আমরা অবশ্যই ভূলে যাই যে, নারী ও পুরুষ একই পরমপিতার সন্তান। অতএব মহান সমাজ শাস্ত্রবিদ্ শ্রী প্রভাত রঞ্জন সরকার বলেছেন — ” প্রকৃতির সন্তান হিসেবে যে আলো, হাওয়া, মাটি, জল পুরুষের ভোগ্য হিসেবে থাকে, তার অধিকার অবাধভাবে নারীর ক্ষেত্রেও স্বীকার করে নিতে হবে।” অতএব জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁদেরকেও এগিয়ে যাবার সমান সুযোগ ও অবসর প্রদান করতে হবে। আর এটাই হবে মানুষ হিসেবে আমাদের একান্ত দায়িত্ব।একটা কথা অবশ্যই স্মরণীয় যে, নারী ও পুরুষ উভয়েই পরমপিতার সন্তান। তিনি উভয়কেই শক্তি, সামর্থ্য ও বুদ্ধি সমানভাবেই দিয়েছেন। কিন্তু সেই শক্তি ও সামর্থ্যের যথাযথ উপযোগ না করার জন্য আমরাই দায়ী। সুতরাং জীবনযুদ্ধে মানুষ তাঁর অন্তর্নিহিত গুণাবলীর উৎকর্ষ সাধনে, যিনি যত বেশি সচেষ্ট, তিনি তত বেশি কাজে লাগাতে পারবেন ও তত বেশি সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হবেন। কারণ এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। অতএব প্রকৃতি প্রদত্ত প্রতিটি বস্তুর উপর সবারই সমান অধিকার আর প্রকৃতি প্রদত্ত প্রতিটি সম্পদের যথোচিত ও বিচার সমর্থিত প্রয়োগ করাই আমাদের পবিত্র কর্তব্য।যদিও প্রাকৃতিক নিয়মে নারী ও পুরুষ উভয়েই একই পরমসত্ত্বার অবদান, তবুও বাস্তব ক্ষেত্রে নারী জাতি পুরুষের দ্বারা সর্বৈবভাবেই অবহেলিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত ও অবদমিত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অত্যধিক পরিমাণে নির্যাতীতাও বটে। সুষ্ঠু ও বলিষ্ঠ সমাজ নির্মণকল্পে এটাই হচ্ছে — সবচেয়ে বড় বাধা। বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থাৎ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় আমরা নারী জাতিকে পরান্নভোজী ও পরমুখাপেক্ষী করে রাখাটাকেই — আমাদের সর্বাধিক সফলতা মনে করি যা সমাজ সংরচনার ক্ষেত্রে মস্ত বড় বাধা।আমাদের সবচেয়ে বড় দোষ — মহিলাদেরকে আমরা সব সময় রান্না ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে বেঁধে রাখার চেষ্টা করি। আর এটাকেই নারীর মর্যাদা রক্ষার সাথে সাথে পুরুষের পৌরুষ প্রদর্শন মনে করি। নারী সমাজকে অবদমিত ও অবহেলিত রেখেই আমরা আমাদের পুরুষত্ব জাহির করতে অভ্যস্ত। এর পিছনে দুটো মূখ্য কারণ — এক, নারীর শারীরিক দুর্বলতা ও দুই, তাঁদের আর্থিক পরনির্ভরতা ও সকল কাজে পরমুখাপেক্ষিতা। সুতরাং সামাজিক অগ্রগতির পথ নির্বাধ করার নিমিত্তে নারী জাতিকে অবশ্যই আত্মনির্ভরশীল করার জন্য আমাদেরকেই সচেষ্ট হতে হবে। আর এটাই হবে সমাজ সচেতন মানুষ হিসেবে আমাদের প্রকৃষ্ট ভূমিকা।একথা অবশ্যই অতি সত্য যে, শারীরিক সংরচনার ক্ষেত্রে নারী জাতি অনেকটাই দুর্বল। কারণ প্রতিটি জীবের ক্ষেত্রেই এটা স্বাভাবিক ভাবেই পরিলক্ষিত। স্নায়বিক দুর্বলতার কারণে তাঁরা মনের দিক দিয়েও অনেকটা দুর্বল। তাই নারীরা অতি সহজেই পুরুষদের পদতলে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। আর তাঁদের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই পুরুষ সমাজ নারীদেরকে বস্তুর ন্যায় ব্যবহার করে এসেছে। এটাই অবশ্যই বিবেকসম্মত সুবিবেচনা নয় — এটা স্পষ্টভাবেই অবিবেকিতা। এক কথায় দুর্বলের প্রতি সবলের শোষণ যন্ত্র। যেহেতু কোনো রকম শোষণকেই প্রশ্রয় দেওয়া অমানবিকতা, সুতরাং নারী জাতির অবমাননাও এক ধরণের পাশবিকতা, মানবতা নয়। মানুষ হিসেবে আমাদের একান্ত উচিত সবাইকে সঙ্গে নিয়ে মানবকল্যাণের পথে এগিয়ে যাওয়া। কাউকে পিছনে রেখে এগিয়ে যাওয়া যায় না। তাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন —” যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে,পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে।”সুতরাং মানুষ হিসেবে আমাদের ধর্ম — অগ্রসরের ক্ষেত্রে সবাইকে সমান সুযোগ দেওয়া। কারণ সবাইকে এক সঙ্গে নিয়ে চলার মধ্যেই সামাজিক সার্থকতা বিদ্যমান। সহযাত্রীদের মধ্যে কেউ যদি যাত্রাপথে পিছিয়ে পড়ে, গভীর রাতের ঘনতমসায় দমকা হাওয়ায় যদি কারো দীপ নিভে যায়, তবে তাঁকে অন্ধকারের মধ্যে একলাটি ছেড়ে চলে যাওয়াটা মোটেই মানবোচিত কাজ বলে বিবেচিত হবে না। তাই তাঁকেও হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াতেই মানবতা পরিলক্ষিত হয়। সহযাত্রীদের একান্ত উচিত — নিজের প্রদীপের আলোয় সহযাত্রীর নিভে যাওয়া দীপশিখাটি পুনরায় প্রজ্জ্বলিত করে দেওয়া। এই কথা মনে রেখেই জনৈক কবি লিখেছেন:–” বর্তিকা লইয়া হাতে, চলেছিল একসাথে,পথে নিভে গেছে আলো, পড়ে আছে তাই।তোমরা কি দয়া করে, তুলিবে না হাত ধরেঅর্ধদণ্ড তার তরে থামিবে না ভাই?হ্যাঁ, অবশ্যই থামতে হবে। কারণ তা না করলে সমাজের মিলন সূত্রটি হারিয়ে যাবে। অতএব সব সময় একটা কথা অবশ্যই স্মরণীয় —সমমন্ত্রেণ জায়তে সমাজঃঅর্থাৎ এক সাথে মিলে মিশে যাওয়ার নাম — সমাজ। সুতরাং পিছিয়ে পড়া মানুষটিকেও এক সঙ্গে টেনে নিয়ে যাওয়াই, সামাজিক বন্ধন রক্ষা করার — সঞ্জীবনী শক্তি। সামাজিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করার উদ্দেশ্যে মহান দার্শনিক ও সমাজবেত্তা শ্রী প্রভাত রঞ্জন সরকার বলেছেন —“তাই পাপী, তাপী, চোর, চরিত্রহীন, অপরাধী — যে কেউ হোক না কেন, এগুলো তার বাইরের পরিচয়। ভেতরে সে পবিত্র হওয়ার সম্ভাবনায় ভরপুর। সেই সম্ভাবনার উদ্বোধন করাই সদবিপ্রদের ব্রত। তারা মানবিক মূল্য প্রদানে কখনও বাছ-বিচার করবে না। অতি ঘৃণ্য কাজ করার জন্য শাস্তি তার নিশ্চয়ই হবে কিন্তু তাকে ঘৃণা করে, না খেতে দিয়ে শুকিয়ে মেরে ফেলা মানবতাবাদী সদবিপ্রদের দ্বারা কখনও হয়ে উঠবে না। “অতএব তিনিই সদ্বিপ্র যিনি উচ্চ-নীচ, ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র সবাইকে সমানভাবে ভালোবাসতে পারেন। এতদর্থে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কারণ তিনি সমাজবর্জিত রোগগ্রস্ত যবন হরিদাসকে নিজের হাতে সেবা করে মানবিক মূল্যবোধ বজায় রেখেছেন। অতএব শ্রী চৈতন্যদেবকে সম্মান প্রদর্শন করার একটাই মহামন্ত্র:–“সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।”যেহেতু নারী-পুরুষ দুইই পরমপিতার স্নেহের সন্তান, অতএব জীবনের অভিব্যক্তি ও স্বাধিকারের ক্ষেত্রে উভয়েরই সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার থাকা একান্ত প্রয়োজন। কারণ সুদৃঢ় সামাজিক সংরচনার ক্ষেত্রে উভয়েরই ভূমিকা সমভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নারীদের মধ্যেও সম্ভাবনার কোন অভাব নেই। কিন্তু যথোচিত পরিবেশের অভাবে নারীদের মধ্যে নিহিত সম্ভাবনা সমূহ প্রস্ফুটিত হবার সুযোগ পায় না। বরং প্রস্ফুটিত হবার আগেই নষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং প্রবুদ্ধ পুরুষ জাতির একান্ত