যেখানে মুখার্জি বলিদান হয়েছিলেন, সেই কাশ্মীর আমাদের।
সকাল সকাল ডেস্ক
ইতিহাসের পাতায় কিছু নাম এমনভাবে খোদাই করা থাকে যা কোনো একজন ব্যক্তির নয়, বরং একটি ধারণা, একটি সংকল্প এবং একটি সমগ্র যুগের গল্প বলে। ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি এমনই একজন যুগপুরুষ ছিলেন। তাঁর আত্মত্যাগ দিবস কেবল একজন মহান নেতার স্মরণ নয়, বরং ভারতের ঐক্য, অখণ্ডতা এবং সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের সেই লক্ষ্যকে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়, যার জন্য তিনি নিজের সবকিছু উৎসর্গ করেছিলেন।
ড. মুখার্জির জন্ম ১৯০১ সালের ৬ জুলাই কলকাতার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তাঁর পিতা স্যার আশুতোষ মুখার্জি দেশের একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও আইনজ্ঞ ছিলেন। শৈশব থেকেই তাঁর মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা, দেশপ্রেম এবং নেতৃত্বের ঝলক দেখা গিয়েছিল। শিক্ষার ক্ষেত্রে অনেক কীর্তি স্থাপন করে তিনি মাত্র ৩৩ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকনিষ্ঠ উপাচার্য হন — যা আজও ভারতীয় শিক্ষা জগতে অতুলনীয় বলে বিবেচিত হয়।
ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির দৃষ্টিতে রাজনীতি ক্ষমতার নয়, সেবার মাধ্যম
ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির জীবন কেবল বৌদ্ধিক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি জাতির চ্যালেঞ্জগুলো কাছ থেকে দেখেছিলেন এবং রাজনীতিকে ক্ষমতার নয়, সেবার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। যখন দেশ বিভাজনের ট্র্যাজেডির শিকার হচ্ছিল, তখন তিনি বাংলার লক্ষ লক্ষ হিন্দুর স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার জন্য নির্ণায়ক সংগ্রাম করেছিলেন। যদি সেই সময়ে ড. মুখার্জি এই দৃঢ়তা না দেখাতেন, তাহলে আজ পশ্চিমবঙ্গের একটি বড় অংশ ভারতের অঙ্গ থাকত না। পাঞ্জাবের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে ভারতে ধরে রাখতেও তাঁর ভূমিকা অবিস্মরণীয় ছিল।
দেশের শিল্পের ভিত্তি স্থাপনকারী প্রথম শিল্পমন্ত্রী
ডাক্তার মুখার্জি স্বাধীনতা লাভের পরপরই দেশের শিল্পের রূপরেখা তৈরি করেন। HEC, দুর্গাপুর, রাউরকেলা, ভিলাই-এর মতো শিল্পনগরীগুলো তাঁর মস্তিষ্কেরই ফসল ছিল। প্রথম প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মন্ত্রিসভায় শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী হিসেবে তিনি উল্লেখযোগ্য কাজ করেন। কিন্তু যখনই তিনি অনুভব করেন যে কিছু নীতি জাতীয় স্বার্থ এবং দেশের নিরাপত্তার অনুকূল নয়, তখন তিনি ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করে পদত্যাগ করেন। এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে তাঁর কাছে পদ নয়, নীতিই ছিল সর্বাগ্রে।
কংগ্রেসের ত্রুটিগুলো সময়মতো বুঝেছিলেন ড. মুখার্জি
ড. মুখার্জি বিশ্বাস করতেন যে ভারতের এমন একটি রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োজন যা জাতীয় স্বার্থ, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং জনকল্যাণকে তার কেন্দ্রে রাখবে। এই সংকল্প নিয়েই তিনি ১৯৫১ সালের ২১ অক্টোবর ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। এটি কেবল একটি দলের জন্ম ছিল না, বরং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ছিল। জনসংঘের মাধ্যমে তিনি দেশের সাংস্কৃতিক চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় ঐক্যকে শক্তিশালী করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এক দেশ, এক নিশান, এক বিধান
আজ ভারতীয় জনতা পার্টি যে বিশাল রূপে দেশ-দুনিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, তার আদর্শিক ভিত্তি ড. মুখার্জিই স্থাপন করেছিলেন। “রাষ্ট্র প্রথম, সংগঠন সর্বোপরে” যে মন্ত্র আজ বিজেপির পরিচয়, তার মূলে তাঁরই চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান।
তাঁর সবচেয়ে ঐতিহাসিক সংগ্রাম ছিল জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণ একীকরণ নিয়ে। স্বাধীনতার পর সেখানে যে বিশেষ ব্যবস্থা চালু ছিল, তা তিনি কখনোই মেনে নেননি। তাঁর স্পষ্ট ঘোষণা ছিল যে ভারত একটি রাষ্ট্র, এবং একটি রাষ্ট্রে দুটি সংবিধান, দুটি প্রধান এবং দুটি নিশান চলতে পারে না। এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে তিনি দেশব্যাপী জনজাগরণ করেন এবং নিজে জম্মু-কাশ্মীর যাওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৫৩ সালের ১১ মে সেখানে পৌঁছানোর পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১৯৫৩ সালের ২৩ জুন রহস্যজনক পরিস্থিতিতে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর এই আত্মত্যাগ জাতির অখণ্ডতার জন্য দেওয়া সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের মধ্যে গণ্য হয়। তিনি তাঁর জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন যে জাতীয় স্বার্থের জন্য সংগ্রামকারী ব্যক্তি পরাজিত হয় না, — সে ইতিহাসে অমর হয়ে যায়।
ড. মুখার্জির স্বপ্ন ছিল যে জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হবে। এটি আমাদের জন্য গর্বের বিষয় যে প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদিজির নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় সরকার ২০১৯ সালে ৩৭০ এবং ৩৫এ ধারা বাতিল করে তাঁর এই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছে। এটি কেবল একটি সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং তাঁর আত্মত্যাগের প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধাঞ্জলিও ছিল।
সমাজের বঞ্চিত শ্রেণীকে মূল স্রোতে আনার স্বপ্ন
ড.”””মুখার্জি সামাজিক সমরসতা এবং বঞ্চিতদের উন্নতির প্রবল সমর্থক ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ভারতের উন্নয়ন তখনই সার্থক যখন তার সুবিধা সমাজের শেষ ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছায়। আজ “অন্ত্যোদয়” এবং “সবকা সাথ, সবকা বিকাশ, সবকা বিশ্বাস অর সবকা প্রয়াস” মন্ত্রে তারই আদর্শ এগিয়ে যেতে দেখা যায়।
তার রাজনীতি ক্ষমতা দখলের ছিল না, ছিল জাতি গঠনের রাজনীতি। তিনি ভারতকে কেবল একটি ভৌগোলিক সত্তা হিসেবে নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক জাতি হিসেবে দেখতেন – যার আত্মা তার সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যে নিহিত। এই কারণেই তিনি ভারতীয়ত্ব রক্ষা এবং জাতীয় ঐক্যকে তার জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্য বানিয়েছিলেন।
তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস
তার জীবন তরুণ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক অক্ষয় উৎস। তার সংগ্রাম শেখায় যে জাতির প্রতি উৎসর্গ, নীতির প্রতি নিষ্ঠা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও অবিচল থাকার সাহসই প্রকৃত নেতৃত্বের মাপকাঠি। আজ যখন ভারত একটি উন্নত জাতি হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তার ধারণাগুলি আগের চেয়েও বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়।
রাজনীতিতে ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জির মতো সুপুত্র বিরলই জন্মায়। তার আত্মত্যাগ নিরর্থক হয়নি। আজ যদিও তিনি শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার দ্বারা রোপিত জাতীয়তাবাদের বীজ আজ বটবৃক্ষ হয়ে দেশবাসীকে ছায়া দিচ্ছে। একজন প্রখর জাতীয়তাবাদী হিসেবে তিনি সর্বদা দেশের প্রথম সারিতে থাকবেন। তার জীবন ক্ষমতা নয় বরং নীতির প্রতি নিবেদিত ছিল। তার আত্মত্যাগ আমাদের মাতৃভূমির জন্য বাঁচার অনুপ্রেরণা সর্বদা দেবে এবং তিনি সর্বদা ভারতীয় ইতিহাসের সোনালী পাতায় অমর থাকবেন।
আসুন, আমরা সবাই তার আত্মত্যাগ দিবসের এই উপলক্ষে সংকল্প করি যে ভারতের ঐক্য, অখণ্ডতা, সাংস্কৃতিক গৌরব এবং দরিদ্র কল্যাণের জন্য তার দেখানো পথে চলে উন্নত ভারত গঠনে আমাদের অবদান রাখব।
দ্রষ্টব্য:- এই নিবন্ধটি বিজেপি রাজ্য সভাপতি আদিত্য সাহু ড. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি জির আত্মত্যাগ দিবসে লিখেছেন
No Comment! Be the first one.