আদর্শ শিক্ষকের পরিচয়
সকাল সকাল ডেস্ক। গুরুদেব শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর ভারতে গুরু-শিষ্য পরম্পরার সঙ্গে যুক্ত একটি অনন্য ধারণা রয়েছে। গুরু সবসময় শিষ্যের সাফল্যের কামনা করেন এবং শিষ্য গুরুর বিজয়ের কামনা করে। শিষ্য গুরুর বিজয়ের কামনা করে। এটি শুভ লক্ষণ, কারণ যদি শিষ্যের মনে হয় যে সে গুরুর চেয়ে বেশি জানে, তাহলে এর অর্থ তার শিক্ষা থেমে গেছে এবং তার অহংকার জ্ঞানকে নষ্ট করে দিয়েছে। শিষ্য জানে যে যদি তার ক্ষুদ্র মন জয়লাভও করে, তবু সে দুঃখই পাবে, কিন্তু যদি শিক্ষক জয়ী হন, তবে সেটি জ্ঞানের জয়, যা সবার জন্য শুধু মঙ্গল ও আনন্দ বয়ে আনবে।একজন মহান শিক্ষক বোঝেন যে শিষ্য কোথা থেকে আসছে এবং তাকে ধাপে ধাপে কীভাবে পথ দেখাতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একজন আশ্চর্যজনক শিক্ষক ছিলেন! তিনি অর্জুনকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সিঁড়ি-সিঁড়ি করে এগিয়ে নিয়েছিলেন। শুরুতে অর্জুন খুব বিভ্রান্ত ছিল। যখন একটি শিষ্য বিকাশ লাভ করতে থাকে, তখন সে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, কারণ সে তার ধারণাগুলোকে ভেঙে পড়তে দেখে। একজন ছাত্র হিসেবে, প্রথমে তুমি শিখো যে সূর্য পূর্ব দিক থেকে উদয় হয়। পরে তাকে গ্রহ-নক্ষত্র এবং তাদের সূর্যের চারপাশে আবর্তনের কথা শেখানো হয়। এভাবে প্রতিটি ধাপে তার ধারণা ভাঙে এবং নতুন ধারণা গড়ে ওঠে। মহান শিক্ষকরা এই প্রক্রিয়াটি বোঝেন। তারা শিষ্যকে কোনো একটি মতবাদে আঁকড়ে থাকতে দেন না, কারণ প্রতিটি ধারণাই কেবল চূড়ান্ত লক্ষ্য অভিমুখে একটি ধাপ। আর সেই ধারণাগুলিকে ভেঙেই পরবর্তী ধাপে ওঠা সম্ভব। একজন ভালো শিক্ষক শিষ্যের বিভ্রান্তি দূর করতে সাহায্য করেন এবং কখনো কখনো প্রয়োজন হলে আরও বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করেন। আমার মনে আছে ছোটবেলায়, আমাদের একজন সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষিকা ছিলেন, যিনি খুবই স্নেহশীলা ছিলেন এবং সবাই তাঁর পাঠে থাকতে ভালোবাসত, কিন্তু পরীক্ষায় ছাত্রদের খুব কম নম্বর আসত। এর বিপরীতে, আমাদের একজন খুব কঠোর পদার্থবিদ্যার শিক্ষক ছিলেন, যাকে দেখে ছাত্ররা ভয় পেত, কিন্তু তাঁর পাঠের সবাই পরীক্ষায় খুব ভালো ফল করত। মহান শিক্ষকরা জানেন কীভাবে স্নেহ আর কঠোরতার মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রাখতে হয়। কিছু শিশু বিদ্রোহী প্রকৃতির হয়। তাদের বেশি শারীরিক সান্নিধ্য, উৎসাহ আর পিঠ চাপড়ানোর প্রয়োজন হয়। তাদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে তারা ভালোবাসা ও যত্ন পাচ্ছে এবং তাদের আপন করে নেওয়া হচ্ছে। অপরদিকে, কখনো কখনো শিক্ষক ভীতু শিশুদের প্রতি কিছুটা কঠোর হতে পারেন। এর উদ্দেশ্য তাদেরকে খোলামেলা হতে সাহায্য করা। প্রায়ই এর উল্টোটাই হয়। শিক্ষকরা বিদ্রোহী শিশুদের সঙ্গে কঠোর হন আর ভীতু শিশুদের সঙ্গে নরম হন। ফলে এই আচরণ-পদ্ধতিগুলো থেকে যায়। শিক্ষকের আচরণে কঠোরতা এবং কোমলতা দুই-ই থাকা আবশ্যক; নইলে তারা ছাত্রকে সেই দিকটিতে নিয়ে যেতে পারবেন না, যেদিকে তারা নিয়ে যেতে চান। অবশেষে, শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল জ্ঞান প্রদান করা নয়, বরং ছাত্রদের দেহ ও মনের সামগ্রিক বিকাশ ঘটানো। শিশুদের মধ্যে ভাগাভাগি করা, যত্ন নেওয়া, অহিংসা ও আপনত্ববোধের মতো মূল্যবোধও গড়ে তুলতে হবে। দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে শিক্ষকদের সবসময় বিশাল ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের উচিত একসঙ্গে কাজ করে আমাদের দেশে শান্তি ও অগ্রগতি আনা। দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় পরিবর্তনের ঢেউ তুলেছিলেন শিক্ষকরাই। তাঁরা পুরো দেশকে অনুপ্রাণিত করার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আজও শিক্ষকদের শিশুদের অনুপ্রাণিত করা উচিত। শিশুরা খালি স্বচ্ছ পাত্রের মতো; তুমি তাদের যা কিছু দেবে, তারা সেটিই প্রতিফলিত করবে এবং সেভাবেই আচরণ করবে। যদি তুমি তাদের মধ্যে ভয় আর ভুল ধারণা ভরাও, তবে তারা সেভাবেই আচরণ করবে। কিন্তু যখন তুমি তাদের ভালো আদর্শ ও উত্তম গুণ দেবে, তখন তারা বড় হয়ে আদর্শবান ও দায়িত্বশীল নাগরিক হবে। আমরা কাউকে আদর্শ কেবল তখনই দিতে পারি, যখন আমরা নিজেরাই সেই আদর্শ ও গুণাবলী আত্মস্থ করেছি এবং তা মেনে চলি। তাই, এটি খুবই জরুরি যে শিক্ষক তাঁর জীবনে যা বলেন, তা নিজেও আচার-আচরণে প্রয়োগ করেন।
মেয়েদের নিরাপত্তা, আদালত এবং পার্সনাল ল : সমান নাগরিকত্ব জরুরি
সকাল সকাল ডেস্ক। ডঃ নিবেদিতা শর্মা ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর সামনে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন হলো, দেশের মেয়েদের এবং ছেলেদের নিরাপত্তা কি তাদের ধর্মীয় পরিচয় এবং পার্সনাল ল’ দ্বারা নির্ধারিত হবে, নাকি সংবিধান ও সংসদ দ্বারা প্রণীত আইন সকলের উপর সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। এই প্রশ্ন শুধুমাত্র আইনগত প্রযুক্তি বা বিচারিক ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের ভবিষ্যত এবং জাতির দিক নির্ধারণকারী বিষয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন উচ্চ আদালত মুসলিম পার্সনাল ল’ এর প্রেক্ষাপটে বলেছেন যে, যদি কোনো মুসলিম মেয়ে যৌবনপ্রাপ্ত হয়, তবে তার বিবাহ—যদি সে ১৮ বছরের কম বয়সী হয়—সেটিও বৈধ হিসেবে গণ্য হবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি হলো, শরীয়তের ভিত্তিতে যৌবন বিবাহের ক্ষমতা প্রদান করে। তবে এই ব্যাখ্যা শিশুদের অধিকার, সংসদে প্রণীত পোকসো আইন এবং সংবিধানের মৌলিক নীতির সঙ্গে সরাসরি বিরোধ সৃষ্টি করে। ২০১২ সালে সংসদ শিশুদের যৌন অপরাধ থেকে রক্ষা করার জন্য পোকসো আইন প্রণয়ন করে। এতে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যে, ১৮ বছরের কম বয়সী প্রতিটি ব্যক্তি শিশু এবং তার সঙ্গে যে কোনো ধরনের যৌন সম্পর্ক অপরাধ, তা বিবাহের নামেই হোক না কেন। যখন আদালত পার্সনাল ল’ এর ভিত্তিতে এই বিধানকে উপেক্ষা করে, তখন শুধুমাত্র আইন লঙ্ঘন হয় না, বরং এটি একটি দ্বৈত ব্যবস্থা সৃষ্টি করে যা সংবিধানের সমতার নিশ্চয়তাকে দুর্বল করে। সংবিধানিক মানদণ্ড ও সমতার প্রশ্ন:সংবিধান অনুযায়ী অনুচ্ছেদ ১৪ সকলকে সমতার অধিকার দেয়, অনুচ্ছেদ ১৫(৩) মহিলাদের এবং শিশুদের বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করে এবং অনুচ্ছেদ ২১ প্রতিটি নাগরিককে মর্যাদা ও জীবনের অধিকার নিশ্চিত করে। এই অধিকারগুলি ধর্ম বা প্রচলনার উপর নির্ভর করে না। যখন হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ বা পার্সি মেয়েদের জন্য বিবাহের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর, কিন্তু মুসলিম পার্সনাল ল’ এর অধীনে এটি ১৫ বা ১৬ বছরেই বৈধ ধরা হয়, তখন এটি নাগরিকত্বের সমতার নীতির সরাসরি লঙ্ঘন। দেশ তখন “এক আইন, এক নিরাপত্তা” এর দিকে এগোতে পারে, যখন সকল মেয়েকে তাদের ধর্মীয় পরিচয় থেকে উপরে সমান সুরক্ষা দেওয়া হবে। অন্যথায়, ভারত একটি দ্বৈত ব্যবস্থা সম্পন্ন দেশ হয়ে যাবে, যেখানে এক সম্প্রদায়ের মেয়ে রাষ্ট্রের সুরক্ষা পাবে এবং অন্য মেয়ে একই বয়সে “বিবাহিত বন্ধন” এর নামে অসুরক্ষিত থাকবে। আইনি কাঠামো ও আদালতের ব্যাখ্যা:দেশে শিশু বিবাহ নিষিদ্ধ আইন, ২০০৬ এবং পোকসো আইন, ২০১২—উভয়ই স্পষ্টভাবে ১৮ বছরের আগে বিবাহ ও যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসাবে ঘোষণা করে। সর্বোচ্চ আদালত ২০১৭ সালে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট থট বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া’ মামলার ঐতিহাসিক রায়ে বলেছে, যদি স্ত্রী ১৮ বছরের কম বয়সী হয়, তবে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ককে ধর্ষণের সমতুল্য অপরাধ ধরা হবে। এই রায় প্রচলনকে শিশুদের সুরক্ষার চেয়ে উপরে রাখার কথা অস্বীকার করেছে এবং সংবিধানের সর্বোচ্চতাকে প্রতিষ্ঠা করেছে। তারপরও, পাঞ্জাব ও হরিয়ানা উচ্চ আদালতের মতো কিছু আদালত মুসলিম পার্সনাল ল’ এর প্রেক্ষাপটে নাবালিগ বিবাহকে বৈধ হিসেবে গণ্য করেছে। অন্যদিকে, দিল্লি ও কেরল উচ্চ আদালত স্পষ্টভাবে বলেছে যে, পোকসো সব পার্সনাল ল’ এর উপরে। এই বিরোধ স্পষ্টভাবে দেখায় যে, এখন সর্বোচ্চ আদালতকে সংবিধান পীঠ গঠন করে স্পষ্ট ও সার্বজনীন সিদ্ধান্ত দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এনসিপিসিআর এবং বিচারব্যবস্থার অবস্থান:শিশুদের অধিকার রক্ষার জন্য সংসদ জাতীয় শিশু অধিকার সংরক্ষণ কমিশন (এনসিপিসিপিআর) তৈরি করেছে। যখন এই সংস্থা সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছায়, তখন এর আবেদন খারিজ করা হয়, বলা হয় এটি “অজানা” এবং মামলায় তার লোকস স্ট্যান্ডি নেই। এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যদি শিশুদের আইনি রক্ষাকারী সংস্থাটিকেও বিচারব্যবস্থা শোনার জন্য প্রস্তুত না থাকে, তাহলে মেয়েদের কণ্ঠ কে উত্থাপন করবে? সংসদকে উচিত এনসিপিসিপিআর -কে স্পষ্টভাবে এই অধিকার প্রদান করা, যাতে এটি সরাসরি সর্বোচ্চ আদালত এবং উচ্চ আদালতে শিশু অধিকার সংক্রান্ত মামলায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। শিশু বিবাহ এখনও সামাজিক চ্যালেঞ্জ:এই প্রশ্ন প্রায়ই মুসলিম পার্সনাল ল’ এ সীমাবদ্ধ রাখা হয়, কিন্তু বাস্তবতা হলো, শিশু বিবাহ সমগ্র দেশে একটি বিস্তৃত সামাজিক সমস্যা। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য জরিপ (এনএফএইচএস-৫) অনুযায়ী, ভারতে ২৩% মেয়ে ১৮ বছরের আগে বিবাহিত হয়। গ্রামীণ এলাকায় এই হার আরও বেশি। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ঝাড়খণ্ড ও আসাম প্রভৃতির রাজ্যে শিশু বিবাহের হার ৩০% এর ওপরে। এই তথ্য স্পষ্ট করে যে, সমস্যা কোনো একটি ধর্ম বা সম্প্রদায়ের নয়, বরং সামাজিক কাঠামো ও পিছিয়ে থাকা অবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু যখন আদালত পার্সনাল ল’ এর ভিত্তিতে শিশু বিবাহকে বৈধ করে, তখন এই সামাজিক সমস্যা আরও গভীর হয়। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং ভারতের প্রতিশ্রুতি:ভারত ১৯৯২ সালে জাতিসংঘ শিশু অধিকার কনভেনশন (ইউএনসিআরসি) এ স্বাক্ষর করেছে। সংধি অনুযায়ী ১৮ বছরের কম বয়সী প্রতিটি ব্যক্তি শিশু এবং তার সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে শিশু বিবাহ শেষ করার লক্ষ্যও নিয়েছে (এসডিজি-৫.৩)। উল্লেখযোগ্য যে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশসহ অনেক মুসলিম-প্রধান দেশ বিবাহের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর নির্ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ২০১৭ সালে শিশু বিবাহ নিষিদ্ধ আইন প্রণয়ন করে নাবালিক বিবাহকে অপরাধ ঘোষণা করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, এটি ধর্মের নয়, বরং শিশুদের নিরাপত্তা ও সামাজিক সংস্কারের বৈশ্বিক এজেন্ডা। মুসলিম সমাজের ভিতরেও সংস্কারের ডাক:মুসলিম সমাজের ভিতরও বিপুলসংখ্যক মানুষ শিশু বিবাহের বিরোধী। বহু মুসলিম মহিলা সংগঠন ও সামাজিক কর্মী জোর দিয়ে বলেন যে, ইসলাম শিশু বিবাহকে উৎসাহ দেয় না। প্রফেট মুহাম্মদের শিক্ষায় বিবাহ প্রাপ্তবয়স্কতা ও সম্মতি ভিত্তিক হওয়া উচিত, কেবল শারীরিক যৌবনের উপর নয়। সুতরাং সংস্কারের দাবি বাহ্যিক চাপ নয়, বরং সমাজের ভিতর থেকেও আসছে। কম বয়সে বিবাহ শুধুমাত্র আইনি সমস্যা নয়, বরং সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত দূরগামী প্রভাব ফেলে। কিশোরাবস্থায় গর্ভধারণে মাতৃত্ব মৃত্যুহার অনেকগুণ বেড়ে যায়। দ্রুত বিবাহের ফলে মেয়েদের শিক্ষা অসম্পূর্ণ থাকে এবং স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে যায়। নাবালিক মাতৃত্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে দ্রুত করে, যার ফলে সম্পদের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। খেলাধুলা, শিক্ষা, শিল্প ও বিজ্ঞান ক্ষেত্রের সম্ভাব্য প্রতিভা অসময়ে বিবাহের কারণে সীমিত হয়ে যায়। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব পড়ে। দ্রুত বিবাহিত মেয়েদের মধ্যে বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন:পোকসো আইন ২০১৯ সালে সংশোধনের মাধ্যমে কঠোর শাস্তি ধার্য করেছে, নাবালিকাদের সঙ্গে ধর্ষণে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত ব্যবস্থা রয়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, সংসদ ও সরকার উভয়ই শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে গম্ভীর। কিন্তু যদি আদালত পার্সনাল ল’ এর আড়ালে এই বিধানকে অকার্যকর করে, তবে কঠোরতা কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে। এখন সময় এসেছে যে, সর্বোচ্চ আদালত সংবিধান পীঠ গঠন করে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করুক যে, পোকসো ও শিশু বিবাহ নিষিদ্ধ আইন সব পার্সনাল ল’ এর উপরে। সংসদকেও উচিত পোকসো আইনে স্পষ্ট বিধান অন্তর্ভুক্ত করা, যা শিশুদের সুরক্ষাকে সব পার্সনাল ল’ এর উপরে রাখবে। সাথে, এনসিপিসিপিআর -এর মতো সংস্থাগুলোকে সরাসরি বিচারব্যবস্থায় যাওয়ার অধিকার দেওয়া হোক। ভারতের বার্তা স্পষ্ট হওয়া উচিত: মেয়েদের নিরাপত্তা, শিক্ষা ও মর্যাদা হলো আসল জাতির ধর্ম। কোনো প্রচলনা, পার্সনাল ল’ বা সামাজিক রীতি মেয়েদের অধিকার থেকে উপরে নয়। কম বয়সে বিবাহ কেবল একটি মেয়ের নয়, বরং পুরো জাতির ভবিষ্যত নষ্ট করে। সেই মেয়ে, যিনি আগামীতে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, নেতা বা শিক্ষক হতে পারতেন, অসময়ে বিবাহের কারণে
দঙ্গাহীন সমাজ গঠনের প্রতি আমাদের দায়িত্ব
সকাল সকাল ডেস্ক। হৃদয়নারায়ণ দীক্ষিত দাঙ্গা অন্ধযুদ্ধ। এতে শত্রুর সঠিক পরিচয় জানা যায় না। আগুন লাগানো বা বোমা ফাটানো ব্যক্তি জানে না তারা কাকে মারছে। দাঙ্গা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আক্রমণের কর্ম। সাম্ভল দাঙ্গার রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। রিপোর্টে অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি সাম্ভলের জনসংখ্যাগত চরিত্রের কথাও উল্লেখ রয়েছে। জনসংখ্যাগত চরিত্রের পরিবর্তন রাষ্ট্রজীবনের সমস্ত ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৪৭ সালে সাম্ভলের জনসংখ্যা ৪৫ শতাংশ ছিল, যা এখন কমে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে। স্পষ্ট যে, এই চরিত্রের প্রভাবেই হিন্দুদের পালানোর জন্য বাধ্য করা হয়েছে। মুসলিম জনসংখ্যার ভিত্তিতেই পাকিস্তানের দাবি করা হয়েছিল। ১৯৫১ সালের জনগণনায় হিন্দুদের সংখ্যা ৮৫ শতাংশ এবং মুসলিম ১০ শতাংশ ছিল। সাইয়েদ শাহাবুদ্দিন অনুযায়ী ১৯৯১ সালে হিন্দু ছিলেন ৮১.৫ শতাংশ এবং মুসলিম ১২.৬ শতাংশ। এখানে মুসলিম জনসংখ্যার হার ক্রমবর্ধমান। ২০১১ সালের জনগণনায় হিন্দু ৭৯.৮ শতাংশ এবং মুসলিম ১৪.২ শতাংশ ছিলেন। এরপর থেকে জনগণনা হয়নি, তবে মোটামুটি হিসেবে দেশে এখন হিন্দু ৮০.৮ শতাংশ এবং মুসলিম ১৬.৩ শতাংশ হতে পারে। পাশের দেশ পাকিস্তানে ভাগ হওয়ার সময় হিন্দু ২৪ শতাংশ ছিল। এখন ১.৬ শতাংশ। বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার সময় হিন্দু জনসংখ্যা ২২ শতাংশ ছিল, এখন ৭ শতাংশ। সাম্ভলেরও একই অবস্থা। জনসংখ্যার এই অমিল জাতীয় উদ্বেগের কারণ। মুসলিম জনসংখ্যা আধুনিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করে না। মাওলভী হিন্দুদের বুৎপরস্ত বলে সমালোচনা করেন। রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে স্বীকার করে না। রাষ্ট্র সর্বোচ্চত্বের কথা মেনে নেয় না। সাম্ভল উদাহরণ। এছাড়া যেখানে-যেখানে হিন্দু সংখ্যালঘু, সেখানে-সেখানে তাদের জীবন কষ্টময়। ক্রমাগত আতঙ্ক ও হত্যার আশঙ্কায় সংখ্যালঘু হিন্দুরা ভীত হয়ে থাকে এবং ভুক্তভোগী হয়ে পালিয়ে যায়। এই বিষয়টি খুবই গুরুতর। সরকাররা তাদের কাজ চালিয়ে যায়। সরকারি যন্ত্রনার বাধ্যবাধকতা হলো যে ঘটনা ঘটার পর তারা সক্রিয় হয়। সাম্ভলের ক্ষেত্রে ও একই হয়েছে। অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তদন্ত কমিটিও গঠিত হয়েছে। কিন্তু সাম্ভলে মাত্র ৭৫ বছরে ২০৯ হিন্দু নিহত হয়েছে। জাতীয় রাজনীতিতে এমন সংবেদনশীল প্রশ্নকেও প্রায়শই ভূ-পৃষ্ঠীয় রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় বানানো হয়। এক সময় সাম্ভলে ৬৮টি তীর্থ স্থান ছিল এবং ১৯টি বিশেষ ধরনের পবিত্র কূপ। এ সবের ওপর ধীরে ধীরে অবৈধ দখল চলে এসেছে। এর অর্থ যে সাম্ভলের গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ধ্বংস করা হয়েছে। সাম্ভল দাঙ্গার সময় শুধু মূর্তি ও মন্দির নয়, এমন প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মন্দির ও মূর্তিকে ধ্বংসযোগ্য মনে করা হয়। তালেবান বামিয়ান মূর্তিগুলি ধ্বংস করেছিল। ভারতের প্রতিটি প্রান্তে হাজার হাজার সুন্দর মন্দির ছিল। সপ্তম শতাব্দী থেকে মোহাম্মদ বিন কাসিম থেকে শুরু করে এবং আগ্রজেব পর্যন্ত মূর্তি ভাঙার অভিযান চলেছে। শেষ পর্যন্ত মূর্তির সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব কী? কমিটিও সাম্ভল দাঙ্গায় একজন সিনিয়র রাজনীতিবিদকে উত্তেজক বক্তৃতার জন্য উল্লেখ করেছে। মহাত্মা গান্ধী হিন্দু-মুসলিম সহঅস্তিত্বের সমর্থক ছিলেন। গান্ধীজি মুসলিমদের মন জয়ের জন্য খিলাফত আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। খিলাফত ঘোর সাম্প্রদায়িক আন্দোলন ছিল। এর ভারতীয় সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না। খিলাফত আন্দোলনের কারণে ভারত থেকে বাইরে ছিলেন। সমস্ত প্রচেষ্টার পর গান্ধীজি শেষ পর্যন্ত লিখেছিলেন, “হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রশ্নে আমি আমার পরাজয় স্বীকার করছি।” হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের কিছু সমর্থক একটি যৌথ বিশ্বাসের ফেডারেল রূপের উপর জোর দিচ্ছিল, অর্থাৎ হিন্দু হজরত মুহাম্মদ ও কোরানকে সম্মান করবে এবং মুসলিমরা রাম, কৃষ্ণ, শিব এবং গীতা, বেদ ইত্যাদিকে সম্মান করবে। হিন্দুদের জন্য এটি সহজ ছিল। মুসলিমদের জন্য কঠিন। হিন্দু জীবনের রচনায় পুরো অস্তিত্বকে একটি ক্ষমতা হিসেবে ধরা হয়। তারপর ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা দেশ পাকিস্তানের দাবি ওঠে। এই দাবির সমর্থনে সরাসরি কার্যক্রম নেওয়া হয়। লক্ষ লক্ষ হিন্দু নিহত হয়। পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। তারপর পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে বাংলাদেশ তৈরি হয়। পাকিস্তান একটি কৃত্রিম দেশ। রাষ্ট্র ধর্মের ভিত্তিতে তৈরি হয় না। সাম্ভল এই প্রবণতার একটি উদাহরণ। মূল বিষয় হলো ভারতের দুর্বল করার জন্য এই দলের ক্রমাগত ‘ষড়যন্ত্র’। শেষ পর্যন্ত ভারতবিরোধী এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত। অযুৎসাহিত উদাহরণ হলো রামজন্মভূমির প্রমাণ যা আর্সি (ASI) খননে পাওয়া গেছে। এই দৃষ্টিভঙ্গি ও ছদ্মধর্মনিরপেক্ষরা রামজন্মভূমির প্রমাণ স্বীকার করেননি। এরপর কাশীর মামলা। এখানে ও খনন থেকে প্রাপ্ত প্রমাণকে সম্মান করা হয়নি। মথুরার শ্রীকৃষ্ণজন্মভূমি মন্দিরও একই ধরনের। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, যেখানে-যেখানে গভীর খনন হয়, সেখানে গভীরে কোনো মূর্তি, কোনো উপাসনার স্থান, হিন্দুত্বের প্রতীক পাওয়া যায়। এই দৃষ্টিভঙ্গি বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব হলো এই দৃষ্টিভঙ্গির খোলাখুলি প্রতিবাদ করা। সাম্ভলের বাস্তবতা ও হিংসা হাজার মানুষকে আহত ও সতর্ক করেছে। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করুক। হিন্দুদের পালানো গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। হিন্দু যখন কোনো পুরনো এলাকা ত্যাগ করে, তাদের মন্দির এখানেই থাকে। কেউ সহজে তার বাড়ি ছাড়ে না। কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তখনই তারা বাড়ি ত্যাগ করে। স্বাধীনতা থেকে এখন পর্যন্ত সাম্ভলে ১৫টি দাঙ্গা হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা হ্রাসের কারণ এটি। প্রতিটি দাঙ্গা নিরপরাধের প্রাণ নিয়ে যায় এবং পরবর্তী দাঙ্গার আশঙ্কা রেখে যায়। এটি সরকারের জন্য সমস্যা তৈরি করে। কোনো সরকারই দাঙ্গা চায় না। যোগী সরকার প্রতিটি স্তরে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। দাঙ্গায় জড়িত অভিযুক্তদের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভুক্তভোগীদের সরকারি সাহায্য পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বিলুপ্ত বহু তীর্থ মন্দির ও ধর্মস্থানকে সংরক্ষণের চেষ্টা চলছে। দঙ্গাহীন সমাজ গঠন প্রতিটি সামাজিক কর্মী, সচেতন নাগরিক ও সরকারের দায়িত্ব যে সমাজকে প্রীতিপূর্ণ করে তোলা। জনসংখ্যায় নেতিবাচক পরিবর্তন মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা উচিত, তবেই এই রিপোর্টের যথার্থ ব্যবহার সম্ভব। শুভ যে, তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি তথ্য সংগ্রহে প্রচুর পরিশ্রম করেছে। এই তিন সদস্য (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি দেবেন্দ্র নাথ অরোরা’র সভাপতিত্বে অবসরপ্রাপ্ত ডিজিপি এ কে জৈন এবং অবসরপ্রাপ্ত আইএএস অমিত মোহন প্রসাদ) মিলিত হয়ে তদন্তকে প্রামাণিক করেছেন। ৪৫০ পৃষ্ঠার এই রিপোর্টে সাম্ভলে দাঙ্গার বিশ্লেষণ রয়েছে। গত বছর ২৩ নভেম্বর সাম্ভলে ঘটে যাওয়া হিংসার বিষয়ে কমিটি বিবেচনা করেছে। সাম্ভল একা নয়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক সাম্ভল রয়েছে। তদন্ত কমিটির কার্যক্রম অন্যান্য রাজ্যেও অনুসরণীয় হতে পারে। কমিটির রিপোর্টে ব্যাপক আলোচনা হওয়া উচিত। এই আলোচনার মাধ্যমে দাঙ্গার প্ররোচক উপাদান ও দাঙ্গাবাজ দৃষ্টিভঙ্গির কার্যপদ্ধতি বোঝা সহজ হবে।
অসম সরকারর ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ এবং হিন্দু উৎসবের নিরাপত্তা
সকাল সকাল ডেস্ক। রাঁচি “ভয় বিনু হৈ ন প্রীতি।” গোস্বামী তূলসীদাসের এই চৌপাই শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক বার্তা নয়, বরং শাসন এবং শৃঙ্খলার জন্যও গভীর শিক্ষা বহন করে। ঠিক এই কারণেই অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দুর্গাপূজার ঠিক আগে ধুবড়ি জেলায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ জারি করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, এখন থেকে উৎসবের আড়ালে সাম্প্রদায়িক হিংসার কোনও সুযোগ থাকবে না। এই নির্দেশ দেশের সর্বত্র সাড়া ফেলে, কারণ এটি হয়তো প্রথমবার যখন কোনো হিন্দু উৎসবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, কেন অসম সরকারকে এত বড় এবং অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত নিতে হলো? এই নির্দেশ কি কেবল প্রশাসনিক প্রয়োজন ছিল, নাকি এর পেছনে সামাজিক ও রাজনৈতিক গভীর বার্তাও লুকিয়ে আছে? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এই পদক্ষেপ কি সেখানে সংখ্যালঘু হয়ে পড়া হিন্দুদের জন্য নিরাপত্তার ঢাল? ধুবড়ি জেলার বাস্তবতা এই নির্দেশের পটভূমি বোঝাতে সাহায্য করে। ১৯৫১ সালে এখানে হিন্দু জনসংখ্যা ৪৩.৫ শতাংশ ছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা কমে ২০১১ সালের জনগণনায় মাত্র ১৯.৯২ শতাংশে নামিয়ে আসে। একই সময়ে মুসলিম জনসংখ্যা ৭৯.৬৭ শতাংশে পৌঁছে। অর্থাৎ, যে এলাকা এক সময় হিন্দুদের দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল, এখন সেখানে তারা সংখ্যালঘু। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই পরিবর্তন কেবল উচ্চ জন্মহার নয়, বরং বাংলাদেশ থেকে অব্যাহত অনুপ্রবেশের প্রভাবও রয়েছে। এ কারণেই ধুবড়ি অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তাছাড়া, ২০২৫ সালের জুনে ধুবড়ির এক হনুমান মন্দিরে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা পশুর মাংসের টুকরো ফেলে দেয়। ঘটনার পর বাজার বন্ধ হয়ে যায়, পথরুদ্ধ হয় এবং সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সরকারি দল যখন দখলদারদের উচ্ছেদ করতে যায়, তখন জনতা পুলিশের ওপর হামলা চালায়, যার ফলে বহু পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। এই ঘটনাগুলো স্পষ্টভাবে দেখায় যে, জেলা অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সময় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত শর্মা ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ জারি করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এই নির্দেশ পুরো অসমে প্রযোজ্য নয়, কেবল ধুবড়ির জন্য। তবে বার্তা পুরো রাজ্য এবং দেশজুড়ে পৌঁছে যায় যে, উৎসবের শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা করলে কেউ ক্ষমা পাবেন না। এই পদক্ষেপটি সেই বিস্তৃত প্যাটার্নের অংশ, যা গত কয়েক বছরে দেশজুড়ে লক্ষ্য করা গেছে। হিন্দু উৎসবের সময় হিংসার ঘটনা ক্রমাগত ঘটে চলেছে। ২০২২ সালে হনুমান জয়ন্তী এবং রামনবমী শোভাযাত্রার সময় দাঙ্গা হয়। ২০২৩ সালেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪ সালে সরস্বতী পূজা বিসর্জনের সময় সবচেয়ে বেশি হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে। রাম মন্দির প্রাণ প্রতিষ্ঠার পরেও চারটি বড় হিংসাত্মক ঘটনার খবর আসে। গণেশ উৎসবের সময়ও চারবার উত্তেজনার খবর এসেছে। রামনবমীতে তিনবার দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে। সেন্টার ফর স্টাডি অফ সোসাইটি অ্যান্ড সেক্যুলারিজমের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট ৫৯টি সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ২৬টি সরাসরি উৎসবের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এই প্যাটার্নকে আরও দৃঢ় করে। গুজরাতের বাদোদরায় গণেশ উৎসবের শোভাযাত্রায় ডিম ছোঁড়া হয়েছে। উত্তর প্রদেশের বেহরাইচে গণপতি শোভাযাত্রায় পটকা ফেলা হয়েছে। এই দুটি ঘটনা ভক্তদের অনুভূতিতে আঘাত হানে এবং উত্তেজনা সৃষ্টি করে। যখন উৎসবের সময় বারবার এমন কর্মকাণ্ড ঘটে, তখন এটিকে পরিকল্পিত হামলা বলা যায়। একাডেমিক গবেষণাও এই প্যাটার্ন ব্যাখ্যা করতে চায়। আশুতোষ বার্ষ্ণেয় এবং স্টিভেন উইলকিনসনের গবেষণা অনুযায়ী, যেসব জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা ২০ শতাংশের বেশি, সেখানে দাঙ্গার সম্ভাবনা তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া, যখন হিন্দু ও মুসলিম উৎসব একই দিনে হয়, তখন হিংসার আশঙ্কা আরও বাড়ে। ভারতের ১১০টি জেলায় মুসলিম জনসংখ্যা ২০ শতাংশের বেশি। অর্থাৎ, এই এলাকাগুলি স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। ধুবড়ি এই সংজ্ঞায় আরও গভীরভাবে ফিট করে, যেখানে হিন্দুদের সংখ্যা ক্রমশ কমছে এবং তারা নিজেদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে অনিরাপদ বোধ করছে। প্রকৃতপক্ষে এই পটভূমি বোঝায় যে, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত শর্মার সিদ্ধান্ত কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা নয়, বরং ধুবড়ির হিন্দুদের মানসিক নিশ্চয়তা প্রদানও বটে। এই নির্দেশ সংখ্যালঘু হিন্দুদের জানায় যে, রাজ্য সরকার তাদের উৎসব এবং বিশ্বাস রক্ষার জন্য সকল পদক্ষেপ নেবে, যত কঠোরই হোক। বিপক্ষ এই নির্দেশকে সাম্প্রদায়িক ধ্রুবীকরণের প্রচেষ্টা বলে দেখাচ্ছে। কিছু মুসলিম সংগঠন এটিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আক্রমণ বলে উল্লেখ করে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। তবে এটি সত্য যে, ধুবড়ির মতো জেলায় যদি হিন্দু উৎসবে বারবার হিংসা ঘটে এবং সরকার শুধু আবেদন করতে থাকে, তবে হিন্দুদের মধ্যে গভীর হতাশা এবং ভয় জন্মাবে। এমন পরিস্থিতিতে কঠোর পদক্ষেপই বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করতে পারে। প্রশ্ন রয়ে যায়, এখন কি হিন্দুদের প্রতিটি উৎসব নিরাপত্তার ছায়ায় উদযাপন করতে হবে? কি দুর্গাপূজা, রামনবমী এবং গণেশ উৎসব শুধুমাত্র পুলিশ ব্যারিকেড এবং নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতিতেই নিরাপদ থাকবে? এই পরিস্থিতি কেবল উৎসবের আনন্দকে কমায় না, বরং সামাজিক সুতোও ক্ষয়প্রাপ্ত করে। ফলে, সিদ্ধান্তের সমালোচনা হোক বা সমর্থন, এক সত্য অস্বীকার করা যায় না—অসমের এই নির্দেশ ধুবড়ির মতো সংবেদনশীল জেলায় সংখ্যালঘু হিন্দুদের জন্য নিরাপত্তার ঢাল। এটি কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা নয়, বরং বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের বার্তা যে রাজ্য সরকার তাদের পাশে আছে। যদি সমাজে দাঙ্গার ভাইরাস ছড়ায়, তা রোধ করতে কঠোর ব্যবস্থা কার্যকর। সত্যি বলতে গেলে, বাস্তবতায় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত শর্মার এই সিদ্ধান্ত হিন্দুদের নিরাপত্তা এবং আস্থাকে রক্ষা করে। এটি অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত, তবে ধুবড়ির পরিস্থিতিও অভূতপূর্ব। তাই এই নির্দেশ কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং ধুবড়ির সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারগুলোর জন্য বিশ্বাসের গ্যারান্টি। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বার্তা দিতে চান যে, রাজ্যে আইন-শৃঙ্খলার সঙ্গে খেলা কোনওভাবেই সহ্য করা হবে না। কার্যত এর সবচেয়ে বড় সুবিধা ধুবড়ির হিন্দু পরিবারগুলিই পাবে। আশা করা যায়, তারা এখন ভয় ছাড়াই নিজেদের উৎসব উদযাপন করতে পারবে, এবং সেটিই এই নির্দেশের প্রকৃত সাফল্য।
জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক সংঘের ১০০ বছর: অর্জন এবং নতুন দিগন্ত
সকাল সকাল ডেস্ক। রাঁচি জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক সংঘের ১০০ বছর শুধুমাত্র ইতিহাসের অর্জন নয়, বরং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশের প্রতিশ্রুতিও বটে। সংঘের লক্ষ্য হলো পরিবারকে সুদৃঢ় করা, পরিবেশ সংরক্ষণ করা, সমাজে সমরসতা স্থাপন করা, স্বদেশী এবং আত্মনির্ভরতা গ্রহণ করা, এবং নাগরিক কর্তব্য পালন নিশ্চিত করা। এই পাঁচটি প্রতিজ্ঞার মাধ্যমে ভারতের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল ও আত্মনির্ভর হয়ে উঠবে। সংঘ বিশ্বাস করে যে “বসুধৈব কুটুম্বকম্”–এর আদর্শ অনুসরণ করে ভারত শুধু নিজের সমাজকেই শক্তিশালী করবে না, বরং সমগ্র পৃথিবীকে শান্তি, সদ্ভাব এবং সহযোগিতার বার্তা প্রদান করে বিশ্বগুরু হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক সংঘের ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেশব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত একটি তিনদিনের শতবর্ষ উৎসবও পরিকল্পিত হয়েছে, যেখানে সংঘের শতবর্ষী যাত্রা, অর্জন এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর আলোকপাত করা হবে। জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক সংঘের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২৫ সালে বিজয়াদশমীর দিনে নাগপুরে ডা. কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের দ্বারা। তখন এটি কল্পনাও করা কঠিন ছিল যে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবকের সঙ্গে শুরু হওয়া এই প্রচেষ্টা আগামী একশ বছর পরে ভারতীয় সমাজ জীবনের সবচেয়ে বড় এবং বিস্তৃত সংগঠন হয়ে উঠবে। একশ বছর কোনো সংস্থার জীবনে কেবল সময়ের হিসাব নয়, বরং এটি সংস্থার প্রাসঙ্গিকতা, জীবন্ততা এবং সমাজের উপর প্রভাবের প্রমাণ। সংঘের শতবর্ষী যাত্রা সংগ্রাম, সেবা, সংগঠন এবং সংস্কার দিয়ে পূর্ণ। সংঘের শুরু হয়েছিল শাখা হিসেবে। সাধারণভাবে প্রদর্শিত খেলাধুলা, ব্যায়াম, গান এবং শৃঙ্খলা কেবল শারীরিক সক্ষমতাই তৈরি করেনি, বরং এমন একটি প্রজন্ম তৈরী করেছে যা সমাজের প্রতি আত্মসমর্পণ এবং জাতির প্রতি দায়িত্বকে জীবনের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। বহুবার এই সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়েছে, কঠিন পরিস্থিতি এসেছে, বিরোধিতা হয়েছে, তবে সংঘ প্রতিবার আরও শক্তিশালী হয়ে উত্থিত হয়েছে। ১৯৪৭-এর পর রাজনৈতিক পরিবর্তন, জরুরি অবস্থা এবং বিভিন্ন সমালোচনার পরও সংঘের কার্যক্রমের গতি ধীর হয়নি। আজ সংঘের পরিচয় সেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে। যখনই দেশে কোনো বিপর্যয় আসে, স্বেচ্ছাসেবকরা প্রথমে সাহায্যের জন্য পৌঁছান। বন্যা, ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, মহামারি—প্রত্যেক জায়গায় সংঘের কর্মীরা নিঃস্বার্থভাবে সেবা প্রদান করে। শিক্ষাক্ষেত্রে বিদ্যা ভারতীর হাজার হাজার বিদ্যালয় শিশুদের কেবল আধুনিক শিক্ষা দেয় না, বরং ভারতীয় সংস্কৃতি এবং জীবনমূল্যের সঙ্গে যুক্ত করে। গ্রাম উন্নয়ন, বনবাসী সেবা, স্বদেশী পণ্যের প্রচার এবং সামাজিক সমরসতা সংঘের পরিচিতি হয়ে উঠেছে। শতবর্ষী যাত্রার সবচেয়ে বড় অবদান হলো সংঘ ভারতীয় সমাজকে আত্মমর্যাদার অনুভূতি প্রদান করেছে। শতাব্দীব্যাপী শাসন ও উপনিবেশিক অবস্থার ফলে সমাজে হীনতা এবং আত্মসংকোচ জন্মেছিল। সংঘ দেখিয়েছে যে ভারত শুধুমাত্র একটি দেশ নয়, বরং এমন এক সভ্যতা যা বিশ্বকে পথ দেখাতে পারে। শাখায় গাওয়া গান কেবল সুর নয়, বরং আত্মমর্যাদা এবং জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। এ কারণে সংঘের প্রভাব আজ রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং প্রবাসী ভারতীয় সমাজ পর্যন্ত বিস্তৃত। শতবর্ষের এই মুহূর্ত শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতির উৎসব নয়, বরং ভবিষ্যতের দিক নির্ধারণের সুযোগ। পাঁচজন্য-এ প্রকাশিত লেখায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যবস্থাকে নষ্ট করতে পঞ্চাশ বছর লাগে, তবে তা ঠিক করতে একশ বছর লাগে। সংঘ বিশ্বাস করে, এটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এই আত্মবিশ্বাস আগামী সময়ের জন্য নতুন শক্তির উৎস। সংঘ আগামী সময়ের জন্য পাঁচটি প্রধান লক্ষ্য গ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে পরিবার সচেতনতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক সমরসতা, স্বদেশী ও আত্মনির্ভরতা, এবং নাগরিক কর্তব্য পালন অন্যতম। পরিবার ভারতীয় সংস্কৃতির কেন্দ্র। প্রকৃতির সংরক্ষণ জীবনের ভিত্তি। জাতি-ভেদ উপেক্ষা করে সমাজকে একত্রিত করা সময়ের দাবি। স্বদেশী ও আত্মনির্ভরতা অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথ। নাগরিক কর্তব্য পালনের মাধ্যমে জাতি শক্তিশালী হবে। এগুলি কেবল স্লোগান নয়, বরং গভীর সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি। সংঘ এখন শুধু জাতীয় নয়, বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও কাজ করছে। “বসুধৈব কুটুম্বকম্”–এর বার্তা আজ পৃথিবীর জন্য পথপ্রদর্শক। যোগ, আয়ুর্বেদ এবং ভারতীয় সংস্কৃতি বিশ্বে সম্মান পাচ্ছে। সংঘের স্বপ্ন হলো ভারত শুধুমাত্র রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক শক্তির ভিত্তিতে নয়, সংস্কৃতি এবং আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বিশ্বগুরু হয়ে উঠুক। চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রযুক্তির যুগে মূল্যবোধ রক্ষা করা কঠিন হয়ে উঠেছে। মোবাইল এবং ইন্টারনেট সুবিধা দিয়েছে, তবে পরিবার এবং সমাজের বন্ধন দুর্বল হয়েছে। ভোক্তাবাদ জীবনকে প্রতিযোগিতা এবং দেখানোর খেলায় পরিণত করেছে। বৈশ্বিকীকরণ সুযোগ দিয়েছে, তবে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্যও বিপদ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে সংঘের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। সংঘের ভবিষ্যৎ দৃষ্টিশীল। প্রতিটি গ্রাম ও শহরে সেবা ও শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করা, যুবকদের ডিজিটাল মাধ্যমে যুক্ত করা, নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণা বৃদ্ধি করা এগুলিই এর প্রধান লক্ষ্য। শিক্ষা কেবল চাকরি পাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং জাতি নির্মাণের ভিত্তি—এটি সংঘের দৃষ্টিভঙ্গি। সংঘের শতবর্ষী যাত্রা প্রমাণ করে যে আত্মসমর্পণ ও সংগঠনের মাধ্যমে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। এই যাত্রা আগামী একশ বছরের ভিত্তি। নতুন দিগন্ত অপেক্ষা করছে—সমরস সমাজ গঠন, আত্মনির্ভর ভারত, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বিশ্বে শান্তির বার্তা প্রদান। সংঘের স্বপ্ন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার নয়, সমাজের সার্বিক উন্নয়নের। শাখায় দাঁড়ানো প্রতিটি স্বেচ্ছাসেবক নিজেকে জাতির সেবক মনে করে। এই অনুভূতিই ভারতকে বিশ্বগুরু করে তোলার পথপ্রদর্শক। জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক সংঘের একশ বছর শুধুমাত্র ইতিহাসের অধ্যায় নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রস্তাবনা। যদি সমাজ সংগঠিত হয় এবং সেবা ও সংস্কার জীবনের ভিত্তি হয়, তবে কোনো শক্তি ভারতকে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় সংস্কৃতি হতে আটকাতে পারবে না। শতবর্ষের এই প্রতিজ্ঞা হলো, নতুন দিগন্তের দিকে এগিয়ে এমন একটি ভারত গড়া, যেখানে প্রতিটি নাগরিক দায়িত্বনিষ্ঠ ও সংস্কারশীল, সমাজ সমরস ও আত্মনির্ভর, এবং যেখানে বিশ্বে শান্তি ও সদ্ভাবের বার্তা যায়। এটাই সংঘের সবচেয়ে বড় অর্জন এবং আগামীর লক্ষ্য।
কর্তব্য ভবনঃ সংকল্প থেকে সিদ্ধির পথে
সকাল সকাল ডেস্ক। – শ্যাম জাজু ভারতের জনমানসে “কর্তব্য”র ধারণা প্রাচীনকাল থেকেই কর্তব্যের আদর্শে গভীরভাবে নিহিত। ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের রাষ্ট্রের প্রতি নিষ্ঠা, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা, আচার্য চাণক্যের অনন্য রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তা, সম্রাট অশোকের ধর্মপ্রচার, গুপ্ত বংশের জ্ঞান ও ঐশ্বর্যের স্বর্ণযুগ, চোল সাম্রাজ্যের সামুদ্রিক শক্তির কাহিনি এবং ছত্রপতি শিবাজি মহারাজের লোকহিতকর শাসন—এসবই ভারতীয় পরম্পরার অমর মহিমা। আজ সেই মূল্যবোধ আধুনিক রূপে প্রতিফলিত হচ্ছে ‘‘কর্তব্য ভবন’’ নামের মাধ্যমে। এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারের বহু গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর দিল্লিতে ভাড়া করা বিভিন্ন ভবনে চলছিল, যা কেবল এক অস্থায়ী ব্যবস্থা ছিল। কত বছর আর আমরা ভাড়াবাড়ি চালাব? একদিন আমরা স্থির করি—“আমাদের নিজের বাড়ি চাই।” কেন্দ্র সরকারের ক্ষেত্রে সেই পদক্ষেপই হলো ‘‘কর্তব্য ভবন’’। অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুসারে, সরকার প্রতিবছর লুটিয়েন্স জোন ও দিল্লির আশপাশের এলাকায় ভাড়ার ভবনের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে। কেবল ভাড়াতেই ১১০০ থেকে ১৫০০ কোটি টাকা, তার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতে আরও ৪০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট হাজার হাজার কোটি টাকা শুধু ভবন ব্যবহারের পেছনেই খরচ হতো। এখন সব অফিস ‘‘কর্তব্য ভবন’’-এ স্থানান্তরিত হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ০৬ আগস্ট ‘‘কর্তব্য ভবন’’-এর উদ্বোধন করেছেন। এর আগে রাজপথকে ঔপনিবেশিক দাসত্বের প্রতীক মনে করে তার নাম পরিবর্তন করে ‘‘কর্তব্য পথ’’ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি, তিনিই এই ‘‘কর্তব্য ভবন’’-এর ভাবনা দিয়েছিলেন এবং তা বাস্তবায়নও করেছেন। ‘‘কর্তব্য ভবন’’র ধারণা শুধু ইট-পাথরের কাঠামো নির্মাণের প্রকল্প নয়, বরং এটি ভারতের আত্মসম্মান ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক। যেমন প্রতিটি পরিবার নিজের বাড়িকে স্বপ্ন ও নিরাপত্তার প্রতীক মনে করে, তেমনই রাষ্ট্রেরও নিজস্ব গৃহ থাকা প্রয়োজন। এটাই হবে সেই গৃহ, যেখানে সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্ত শুধু কাগজে নয়, জনগণের বিশ্বাস ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে গড়ে উঠবে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও পদক্ষেপটি সুদূরদর্শী, কারণ অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই এর খরচ উঠে আসবে। তবে এর আসল মূল্য সেই মানসিক শক্তিতে, যা এটি আগামী প্রজন্মকে দেবে। এই ভবন আমাদের গণতন্ত্রের আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব রূপ হবে, যেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে দ্রুত, স্বচ্ছ ও দৃঢ়ভাবে। বাস্তবিক অর্থে এটি শুধু প্রশাসনিক কেন্দ্র নয়, বরং প্রতিটি ভারতীয়র আত্মমর্যাদা ও সংকল্পের গৃহ হবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত, শক্তিশালী যোগাযোগ ও কার্যকর কর্মপদ্ধতি‘‘কর্তব্য ভবন’’ হবে সেই স্থান, যেখানে প্রশাসন একত্রে বসবে, চিন্তা করবে ও কাজ করবে—ফলে যোগাযোগ সহজ হবে এবং দায়বদ্ধতা স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে। এখন পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দপ্তর দিল্লির নানান প্রান্তে ছড়িয়ে ছিল—নর্থ ব্লক, সাউথ ব্লক, শাস্ত্রী ভবন, নির্মাণ ভবন, শিল্প ভবন, কৃষি ভবন, রেল ভবন ইত্যাদি। এগুলো শুধু আলাদা ঠিকানাই ছিল না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় বিলম্বের কারণও ছিল। এক মন্ত্রণালয় অন্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা ছাড়া নীতি প্রণয়ন করতে পারে না। নীতি-প্রক্রিয়ায় সমন্বয় ও চিন্তার আদান-প্রদান অপরিহার্য। এখন সব একত্রিত হওয়ার ফলে এটি কয়েক মিনিটেই সম্ভব হবে। মিটিংয়ের জন্য আসা-যাওয়ার সময় বাঁচবে। শুধু সময়ই নয়, শক্তি, অর্থনৈতিক ও মানবসম্পদও সাশ্রয় হবে। যেখানে মন্ত্রণালয়গুলি পাশাপাশি অবস্থান করে, সেখানে ‘সমস্যা’র চেয়ে ‘সমাধান’ দ্রুত পাওয়া যায়। প্রযুক্তিগত দিক থেকেও এটি হবে এক ডিজিটাল–ফার্স্ট অবকাঠামো। সব মন্ত্রণালয়ের নেটওয়ার্কিং, ক্লাউড-ভিত্তিক ফাইল, সুরক্ষিত যোগাযোগ মাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিক্স নীতি-প্রণয়নকে দ্রুত করবে। ‘‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’’-র স্লোগান বাস্তবায়িত হবে। নাগরিকরাও এর সুফল পাবেন। যখন সব এক স্থানে হবে, প্রশাসনিক কাঠামো আরও কার্যকরভাবে চলবে। এর প্রত্যক্ষ উপকার হলো—এক আধুনিক সরকারি ভবন, পরিবেশ-সচেতনতা ও ভারতীয় বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়া। ভবন, পার্কিং, আধুনিকতা ও পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি‘‘কর্তব্য ভবন’’ শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি ২১শ শতাব্দীতে ভারতের কর্মসংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রতি অঙ্গীকারের প্রতীক। নতুন এই কমপ্লেক্সে প্রায় ১৫০০ চারচাকা ও হাজারো দুইচাকার জন্য বহুস্তরবিশিষ্ট বিশাল পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ‘‘কর্তব্য ভবন’’ হবে আধুনিকতার এক আদর্শ। এই ভবন গ্রীন বিল্ডিং মান অনুসারে তৈরি। এখানে সৌরশক্তি ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক আলো ও বাতাসের সর্বোচ্চ ব্যবহার, জ্বালানি-সাশ্রয়ী যন্ত্র, জল সংরক্ষণের জন্য বৃষ্টির জল সংগ্রহ ও গ্রে ওয়াটার পুনঃচক্রায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। এতে বিদ্যুতের খরচে বিপুল সাশ্রয় হবে। অনুমান অনুযায়ী, ‘‘কর্তব্য ভবন’’ পুরোপুরি চালু হলে প্রতিবছর প্রায় ২৫–৩০ কোটি টাকার বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। কর্তব্য ভবনের উপযোগিতাএলাকাটি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়, সংসদ ভবন, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় দপ্তরের একেবারে কাছাকাছি। এর ফলে প্রশাসনিক কাজের গতি বহুগুণ বেড়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, এতদিন মন্ত্রণালয়গুলি দিল্লির নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিল। এর কারণে সিদ্ধান্তে দেরি হতো, ফাইল চলাচলে সময় নষ্ট হতো এবং সমন্বয়ের সমস্যা দেখা দিত। ‘‘কর্তব্য ভবন’’ এই সমস্যার সমাধান করবে। কারণ এই কমপ্লেক্স হবে এক প্রশাসনিক মেরুদণ্ড। এখানে ৩০টিরও বেশি মন্ত্রণালয় ও তাদের ৫২টি শাখা একসঙ্গে কাজ করবে। এতে প্রশাসনে এক নতুন শক্তি প্রবাহিত হবে। নীতি প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের জন্য দ্রুত সমন্বয় প্রয়োজন। এখন গুরুত্বপূর্ণ কোনও প্রস্তাব আলোচন, পরামর্শ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় দেরি না হয়ে দ্রুত সম্পন্ন হবে। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কাছাকাছি অবস্থানও এক বড় সুবিধা হবে। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারবেন, নিয়মিত বৈঠক করবেন এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ সম্ভব হবে। মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের সংসদ ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বারবার যাতায়াত করতে হতো, এখন আর তা লাগবে না। সংসদ ভবনের নিকটে অবস্থিত ‘‘কর্তব্য ভবন’’ প্রশাসন ও আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ার সমন্বয় আরও সহজ করবে। সবকিছু এক জায়গায় হওয়া শুধু সুবিধা নয়, বরং এক সুদূরদর্শী ও কৌশলগত প্রয়োজন। ‘‘কর্তব্য ভবন’’ হয়ে উঠছে ভারতের সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার কেন্দ্র। ভবিষ্যতের ভারতঃ যুব প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করা ভারতআজকের ভারত মহাকাশে নতুন উচ্চতা স্পর্শ করছে, ডিজিটাল বিপ্লবে নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং উদ্যোগের পথ প্রসারিত করছে। এমন ভারতের রাজধানীতে দাঁড়িয়ে থাকা ‘‘কর্তব্য ভবন’’ হবে সেই নতুন ভারতের দৃশ্যমান প্রতীক, যে ভারতের স্বপ্ন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেখিয়েছেন। এই ভবনের ভিত্তি টিকে আছে সুদূরদর্শিতা, সুচিন্তিত পরিকল্পনা ও নৈতিকতার উপর। এ–ই সেই আদর্শ, যা আচার্য চাণক্য ‘‘অর্থশাস্ত্র’’-এ ‘‘সপ্তাঙ্গ রাষ্ট্র’’ তত্ত্বের মাধ্যমে প্রতিপাদন করেছিলেন। সাত অঙ্গ—রাজা, মন্ত্রী, জনপদ, দুর্গ, কোষ, শিক্ষা ও মিত্র—যে কোনও রাষ্ট্রের স্থিতি ও শক্তির ভিত্তি হিসাবে গণ্য হয়েছে। ‘‘কর্তব্য ভবন’’ এই সব উপাদানের আধুনিক, সমন্বিত ও শক্তিশালী রূপ। মোদিজির এই স্বপ্ন হলো, শাসন যেন কেবল দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং দায়িত্ব, স্বচ্ছতা ও সহযোগিতার এক জীবন্ত সংস্কৃতি তৈরি করে। ‘‘কর্তব্য ভবন’’ সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।
মজবুত ভারত, বুলন্দ ইরাদে
সকাল সকাল ডেস্ক। -ঋতুপর্ণ দেবে লালকেল্লার প্রাচীর থেকে টানা ১২তম বার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর স্বাধীনতা দিবসের এবারের ভাষণ কিছুটা আলাদা এবং নানা ইঙ্গিতপূর্ণ ছিল। তাঁর ১০৩ মিনিটের বক্তব্য কেবলমাত্র এতদিনের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘই নয়, বরং কঠিন ও স্পষ্ট সংকল্প প্রদর্শনকারীও বটে। এটি কূটনীতির দিক থেকেও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। যেখানে শুরুতেই অনুচ্ছেদ ৩৭০ অপসারণ করে এক দেশ, এক সংবিধানের কথা বলেন। সেখানে অপারেশন সিন্দূরের প্রসঙ্গ তুলে সেনাকে উন্মুক্ত অনুমতি দেওয়ার সত্যও সামনে রাখেন। আসলে, প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ বহু দিক থেকেই ভিন্ন, কঠিন এবং বিশ্বের জন্য কূটনৈতিক বার্তার মতো ছিল। পাশাপাশি দেশের ভেতরেও ঘটতে থাকা অগ্রহণযোগ্য ঘটনাগুলির বিরুদ্ধে সতর্কবার্তাও ছিল। এর বাইরে দেশের অগ্রগতি, যুবকদের প্রেরণা, সাফল্য এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ মিশনে ভারতের অবদানকেও কেন্দ্র করে ছিল। প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত এমন কোনও বিষয়ই বাদ রাখেননি, যা জরুরি ছিল না। ইশারায় যেখানে আমেরিকা ও চীনকে তার আসল অবস্থান মনে করিয়ে দেন, সেখানেই পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে তীব্র আক্রমণ করেন। প্রথমে জানা যাক তিনি কী কী বলেছেন। পাহালগাঁও হামলার প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে একহাতে নিয়ে তাঁদের সন্ত্রাসী হেডকোয়ার্টার ধ্বংস করার কথা বলে পাকিস্তানের ঘুম উড়িয়ে দেওয়ার কথাও বলেন। দীর্ঘদিনের পারমাণবিক ব্ল্যাকমেলের সামনে নতি স্বীকার করবেন না এবং সেনার শর্তে দাঁতভাঙা জবাব দেওয়ার কথাও বলেন। পুরনো সিন্ধু জল চুক্তিকে অন্যায্য বলে উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলেন, ভারতের নদী কি শত্রুর খেত সিঞ্চন করবে আর দেশের কৃষকের জমি তৃষ্ণার্ত থাকবে? সিন্ধু চুক্তির ওই রূপ আর মেনে নেওয়া হবে না বলেও স্পষ্ট জানান। ২১শ শতক প্রযুক্তিনির্ভর শতক। ৫০–৬০ বছর আগে সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে চিন্তা হলেও ফাইল সেখানেই আটকে যায়। সেমিকন্ডাক্টরের চিন্তার ভ্রূণহত্যা হয়ে গিয়েছিল। পরে অনেক দেশ সেমিকন্ডাক্টরে দক্ষতা অর্জন করে বিশ্বকে তাদের শক্তি দেখিয়েছে। মিশন মোডে এ কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও ৬টি ভিন্ন সেমিকন্ডাক্টর ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনার মধ্যে চারটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে জানান। চলতি বছরের শেষে মেড ইন ইন্ডিয়া অর্থাৎ ভারতেই তৈরি চিপ বাজারে আসা এক বিশাল সাফল্য হবে। প্রধানমন্ত্রী আরও অনেক পরিকল্পনা ও সাফল্যের কথাও তোলেন। ১১ বছরে সোলার এনার্জির ব্যবহার ৩০ গুণ বৃদ্ধি, নতুন নতুন ড্যাম তৈরি করে জল শক্তির প্রসার ঘটানো, ক্লিন এনার্জির দিকে অগ্রসর হওয়া, ১০টি নতুন নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর দ্রুত কাজ করছে। ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গঠনের লক্ষ্য যাতে স্বাধীনতার ১০০ বছরে ভারতের পারমাণবিক শক্তি ক্ষমতা ১০ গুণেরও বেশি হয়। তিনি বলেন, গ্লোবাল ওয়ার্মিং মোকাবিলায় নির্ধারিত সময় ২০৩০–এর আগে ৫ বছরেই ৫০ শতাংশ ক্লিন এনার্জির লক্ষ্য অর্জন করা আমাদের প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীলতার প্রমাণ। ন্যাশনাল ক্রিটিক্যাল মিশন চালু করে ১২০০–রও বেশি স্থানে অনুসন্ধান অভিযানের মাধ্যমে আমরা ক্রিটিক্যাল মিনারেলেও আত্মনির্ভরতার দিকে এগোচ্ছি, যা বিরাট অর্জন। যুব সমাজকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমাদের নিজস্ব মেড ইন ইন্ডিয়া ফাইটার জেটের জন্য জেট ইঞ্জিনও কি আমাদের হওয়া উচিত নয়? আমরা ‘ফার্মা অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’। এখন সময় এসেছে গবেষণা ও উন্নয়নে আরও শক্তি লাগানোর। আমাদের নিজস্ব পেটেন্ট হওয়া উচিত। মানবকল্যাণে সস্তা, সবচেয়ে কার্যকর ও নতুন ওষুধে গবেষণা হওয়া চাই। সঙ্কটকালে যাতে কোনও সাইড ইফেক্ট ছাড়াই জনকল্যাণে কাজে লাগে। প্রধানমন্ত্রী মোদী আহ্বান করেন যে এটি আইটির যুগ, ডেটাই শক্তি। সময়ের দাবি নয় কি যে অপারেটিং সিস্টেম থেকে শুরু করে সাইবার নিরাপত্তা, ডিপ টেক থেকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পর্যন্ত সবকিছু আমাদের নিজস্ব হোক? নিজেদের সামর্থ্য ও শক্তিকে বিশ্বের সামনে পরিচিত করিয়ে বলেন, আমাদের ইউপিআই বিশ্বকে বিস্মিত করছে। রিয়েল টাইম ট্রানজ্যাকশনের ৫০ শতাংশ একা ভারতই ইউপিআইয়ের মাধ্যমে করছে। ক্রিয়েটিভ ওয়ার্ল্ড, সোশ্যাল মিডিয়া—এতসব প্ল্যাটফর্ম কেন আমাদের নিজস্ব হবে না? কেন ভারতের অর্থ বাইরে যাবে? আমি যুবকদের সামর্থ্যের উপর আস্থা রাখি। প্রধানমন্ত্রী ইভি ব্যাটারি, সোলার প্যানেল, মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠী, মানসম্মত পণ্যের পরিচিতির পাশাপাশি নেক্সট জেনারেশন রিফর্মসের জন্য টাস্ক ফোর্স গঠন ও নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পূর্ণ করার কথা বলেন, যাতে বর্তমান আইন, নীতি, প্রথা ২১শ শতক ও বৈশ্বিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খায় এবং ২০৪৭ সালে ভারতকে উন্নত দেশ করে তুলতে পারে। নেক্সট জেনারেশন জিএসটি সংস্কারকে দীপাবলির উপহার বলে উল্লেখ করে জানান, মানুষের প্রয়োজনীয় জিনিসে আরোপিত ভারী কর অনেকটা কমে যাবে, এমএসএমই, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা লাভবান হবে এবং দৈনন্দিন পণ্য সস্তা হয়ে অর্থনীতিকে নতুন বল দেবে। প্রধানমন্ত্রী মোদী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে, ভেবেচিন্তে সাজানো চক্রান্তের মাধ্যমে দেশের ডেমোগ্রাফি বদলকে নতুন সঙ্কট বলে উল্লেখ করেন। অনুপ্রবেশকারীরা দেশের যুবকদের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, বোন–বেটিদের টার্গেট করছে। এটা সহ্য করা হবে না। আমাদের পূর্বপুরুষরা ত্যাগ ও আত্মবলিদানের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছেন। একটি হাই পাওয়ার ডেমোগ্রাফি মিশন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা এমন ভয়ঙ্কর সঙ্কট মোকাবিলায় নির্দিষ্ট সময়ে কাজ করবে। আমরা সে পথে এগোচ্ছি। এবারের ভাষণ থেকে এতটুকু স্পষ্ট হয়ে গেল যে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবিলার সংকল্প দেশবাসীর সামনে রেখেছেন। ব্ল্যাকমেল সহ্য নয়, অপারেশন সিন্দূরের উল্লেখ, স্বদেশীকে ‘মজবুরি নয়, মজবুতি’ হিসেবে তুলে ধরা—এর সঙ্গে পাকিস্তানকে প্রকাশ্যে এবং আমেরিকাকে ইশারায় সতর্কও করেছেন। প্রথমবার লালকেল্লা থেকে জাতীয় স্বয়ংসেবক সংঘের ১০০ বছরের জাতিসেবা উল্লেখ করা এবং মা ভারতীর কল্যাণের লক্ষ্যে সেবা, সমর্পণ, সংগঠন ও অতুলনীয় শৃঙ্খলার প্রসঙ্গ তুলে আরএসএসকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এনজিও বলে আখ্যা দেওয়া এবং জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ আনার রাজনৈতিক তাৎপর্যও বেরোবে। তবে প্রধানমন্ত্রী মোদী ১২তম বার সবচেয়ে দীর্ঘ, ১০৩ মিনিট বক্তব্য রেখে বিশ্বকে নিজের সংকল্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন। এখন সময় পক্ষ–বিপক্ষের, যারা তাঁর ভাষণের নিজ নিজ মতানুযায়ী নানা ব্যাখ্যা ও অর্থ বার করবে।
আগস্ট-ভোটারবান্ধবপ্রক্রিয়া, নির্বাচনকমিশনকেবদনামকরাঅন্যায়
সকাল সকাল ডেস্ক। সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি বিহারের ভোটার তালিকার বিশেষ গভীর পুনরীক্ষণ (এসআইআর) সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে একে ভোটারবান্ধব প্রক্রিয়া আখ্যা দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি সন্তোষজনক মন্তব্য। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এই মামলা আর কতদিন ঝুলে থাকবে? যত দ্রুত এর নিষ্পত্তি হবে ততই উত্তম, কারণ কিছু বিরোধী দল এ নিয়ে সস্তার রাজনীতি করতে বদ্ধপরিকর। তারা এমন প্রচার চালাচ্ছে যেন এই পুনরীক্ষণ প্রক্রিয়ার আড়ালে নির্বাচন কমিশন ইচ্ছে করেই কিছু বিশেষ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিতে চাইছে, যাতে বিজেপি নির্বাচনী সুবিধা পায়। এই অভিযোগকে জোরদার করতে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী পর্যন্ত বলে ফেলেছেন যে গত লোকসভা নির্বাচনে ভোট চুরি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি সত্যিই ভোট চুরি হয়ে থাকে তবে কংগ্রেস কীভাবে ৯৯টি আসনে জিতল? আর বিজেপি-ই বা কেন ২৪০-এ সীমাবদ্ধ রইল? বাস্তবতা হলো, ওই ৯৯টি আসন পাওয়ার কারণেই রাহুল গান্ধী আজ বিরোধী দলনেতা হতে পেরেছেন। এই প্রেক্ষাপট তিনি উপেক্ষা করছেন। এটিও বিস্ময়কর যে বিহারের ভোটার তালিকার প্রথম খসড়া প্রকাশের ১৩ দিন পরও কোনো রাজনৈতিক দল লিখিত আপত্তি দাখিল করেনি। বরং তারা কমিশনের ছোটখাটো ভুলকে অতিরঞ্জিত করে চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। এটিই “তিলকে তাল” বানানো ছাড়া আর কিছু নয়। দেশে এমন কোনো প্রক্রিয়া নেই যেখানে একেবারেই গলদ থাকে না। কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালে যখন আধার চালু হয়েছিল তখন কি সব কিছু নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল? আবার ফটো-ভোটার আইডি চালুর সময় কি কমিশনের একটিও ভুল হয়নি? ভোটার পরিচয়পত্র তৈরি বা যাচাইয়ের সময় কোনো ত্রুটি হওয়া উচিত নয়, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কংগ্রেস কি দাবি করতে পারে যে তাদের আমলে কমিশনের প্রতিটি কাজ ভুলত্রুটিমুক্ত ছিল? উদাহরণস্বরূপ, বিহারের এক মহিলার ভোটার আইডিতে বয়স ৩৫-এর জায়গায় ১২৪ লেখা পড়েছে। এটিকে বড় করে দেখানো হলেও এমন বিচ্ছিন্ন ভুল যে কোনো রাজ্যে ঘটতে পারে। প্রকৃত দায়িত্ব বিরোধীদেরই নেওয়া উচিত—কমিশনের প্রক্রিয়াকে আরও সঠিক করতে সহযোগিতা করা, নিজেদের আপত্তি আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়া। কিন্তু তারা তা এড়িয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ আর রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে আসলে তারা ভোটারদের স্বার্থকেই উপেক্ষা করছে। সুপ্রিম কোর্ট যেমন বলেছে, এই পুনরীক্ষণ প্রক্রিয়া ভোটারবান্ধব। তাই বিরোধীদের উচিত একে বাধাগ্রস্ত না করে সহায়ক ভূমিকা পালন করা। কমিশনের ছোটখাটো ত্রুটি নিয়ে অযথা হইচই না করে, ভোটার তালিকাকে যতটা সম্ভব নিখুঁত করার কাজে সক্রিয় সহযোগিতা করাই গণতন্ত্রের স্বার্থে শ্রেয়।
দক্ষিণ চীন সাগরের ঢেউয়ে ভারতের বাড়তে থাকা প্রভাব
দক্ষিণ চীন সাগরের উত্তাল জলে ভারতের পতাকা এখন কেবল সমুদ্রের হাওয়ায় নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতির আলোড়নেও উড়তে শুরু করেছে। বৃটেনে ফিলিপাইনের রাষ্ট্রদূত ও প্রাক্তন পররাষ্ট্র মন্ত্রী টেডোরো লক্সিন জুনিয়র সম্প্রতি ভারত-ফিলিপাইনসের প্রথম যৌথ নৌসেনা মহড়ার পর যে খোলামেলা ভঙ্গিতে ভারতীয় নৌসেনার প্রশংসা করেছেন, তা শুধু একটি কূটনৈতিক উক্তি নয়। এটি সেই বদলে যাওয়া সামরিক সমীকরণের ইঙ্গিত, যেখানে ভারত এখন এক সাহসী সমুদ্রশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। লক্সিনের এই মন্তব্য যে, “ভারতীয় নৌসেনা একমাত্র সেই নৌসেনা যে যেখানে যেতে চায়, সেখানে যায়” সরাসরি সেই আত্মবিশ্বাসের পরিচায়ক, যা ভারত গত এক দশকে “ইন্দো-প্রশান্ত” অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করেছে। এই মন্তব্য এমন এক সময় এসেছে যখন ফিলিপাইনের জলসীমায় উত্তেজনা চরমে। সম্প্রতি স্কারবোরো শোলের কাছে ফিলিপাইনের উপকূলরক্ষী বাহিনীর এক নৌকাকে হয়রানি করতে গিয়ে চীনের নৌসেনা ও উপকূলরক্ষীর জাহাজ নিজেরাই একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়েছে। এই ঘটনা দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বাড়তে থাকা আগ্রাসন ও তার ফলাফলের স্পষ্ট উদাহরণ। ফিলিপাইনের বিআরপি সুলুয়ান জাহাজ সেখানে ছিল জেলেদের সহায়তা ও সরবরাহ পৌঁছে দেওয়ার জন্য, কিন্তু চীনের “সামরিক জবরদস্তি” নীতির কারণে সেখানে চীনা জাহাজের আসা-যাওয়া নিয়মিত ব্যাপার হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও ফিলিপাইনের যৌথ নৌমহড়া এক সাহসী বার্তা নিয়ে এসেছে যে দক্ষিণ চীন সাগর আর কেবল চীন ও তার দাবির খেলার মাঠ হয়ে থাকবে না। দক্ষিণ চীন সাগর, এশিয়ার সেই সামরিক ফ্রন্ট যেখানে ভূগোল, সম্পদ ও শক্তিরাজনীতি—এই তিনেরই মিলন ঘটে। এখানে প্রতি বছর প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক মালামাল যাতায়াত করে। শক্তির বিশাল ভাণ্ডার, সমৃদ্ধ মৎস্যসম্পদ এবং কৌশলগত সমুদ্রপথ একে বিশ্বশক্তির ভারসাম্যের কেন্দ্র বানিয়েছে। চীন “নয়-ড্যাশ রেখা”র নামে গোটা অঞ্চলের উপর ঐতিহাসিক অধিকার দাবি করে, অথচ ফিলিপাইনস, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ব্রুনেই ও তাইওয়ানও তাদের নিজ নিজ অংশের দাবি করে। আমেরিকা ও তার মিত্ররা এই অঞ্চলে “নৌপরিবহণের স্বাধীনতা”র নামে নৌগশ্ত চালালেও তারা চীনের সংবেদনশীল এলাকায় সরাসরি সংঘাতে যেতে এড়িয়ে চলে। এর বিপরীতে, ভারত গত কয়েক বছরে তার যুদ্ধজাহাজ ও সরবরাহ জাহাজের মাধ্যমে বারবার প্রমাণ করেছে যে, সে যেকোনো সমুদ্রসীমায়, তা চীনের দাবির ভেতরেই হোক না কেন, তার মিত্র দেশের পাশে দাঁড়াবে। ভারত ও ফিলিপাইনের এই প্রথম নৌমহড়া কেবল প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সূচনা নয়, বরং এটি এক কৌশলগত “ঘোষণা”। ভারতের “পূর্বমুখী নীতি” এখন “দৃঢ় পূর্বমুখী নীতি”য় পরিণত হচ্ছে। এই পরিবর্তন কেবল নীতিগত রদবদল নয়, বরং ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার ফল। চীনের আগ্রাসী মনোভাব আর আমেরিকার দ্বিধার মাঝখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো এমন এক অংশীদার খুঁজছে, যে শুধু পাশে দাঁড়াবে না, প্রয়োজনে মাঠেও নামবে। ভারত এই ভূমিকায় পুরোপুরি মানানসই—তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং শক্তিশালী সামরিক ক্ষমতা দিয়ে। লক্সিনের মন্তব্যে পশ্চিমা দেশগুলোর নৌসেনাদের দিকেও বিদ্রূপ ছিল। “খোজা” শব্দটি তিনি ব্যবহার করেছেন কেবল রসিকতার জন্য নয়, বরং দেখানোর জন্য যে পশ্চিমা শক্তিগুলো আওয়াজ তো তোলে, কিন্তু বাস্তবে চীনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করে। এর বিপরীতে, ভারত কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট ছাড়াই সেখানে পৌঁছে যায়, যেখানে তার বন্ধুর প্রয়োজন হয়। এ কারণেই লক্সিন খোলাখুলিভাবে বলেছেন, ফিলিপাইনের সাহস তার শক্তি, কিন্তু এই গশ্তে যোগ দেওয়ার সাহস কেবল ভারতীয়দের আছে। ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, ভারত-ফিলিপাইনস সম্পর্ক কেবল আজকের কৌশলের ফল নয়। দুই দেশ ১৯৫০ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল। তখন থেকেই সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সম্পর্ক ক্রমশ এগিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। ফিলিপাইনস ভারত থেকে ব্রহ্মোস অতিস্বনক ক্ষেপণাস্ত্র কেনার চুক্তি করেছে, যা চীনের সামুদ্রিক ঘাঁটিতে দ্রুত ও নিখুঁত আঘাত হানতে সক্ষম। এই চুক্তি কেবল সামরিক ক্ষমতা বাড়ানোর নয়, বরং দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত অংশীদারিত্বেরও প্রমাণ। লক্সিনের “উউন্ডেড নি হত্যাকাণ্ড”র প্রসঙ্গও গভীর বার্তা বহন করে। এটি ১৮৯০ সালের সেই ঘটনা, যখন আমেরিকান সেনারা দক্ষিণ ডাকোটায় লাকোটা সিউক্স জনগোষ্ঠীর ১৫০ থেকে ৩০০ মানুষকে হত্যা করেছিল। এদের মধ্যে নারী ও শিশুরাও ছিল। লক্সিন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আমেরিকার ইতিহাস তার সহযোগী ও আদিবাসীদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতায় ভরা এবং আজও তার পররাষ্ট্রনীতিতে সেই প্রবণতা দেখা যায়। এই মন্তব্য পরোক্ষভাবে জানিয়ে দেয় যে ফিলিপাইনসের মতো দেশগুলো আমেরিকার উপর অন্ধভাবে নির্ভর করতে পারে না এবং ভারতের মতো দেশ তাদের জন্য অনেক বেশি বিশ্বস্ত অংশীদার হতে পারে। ভারতের সামুদ্রিক কৌশল এখন ভারত মহাসাগর ছাড়িয়ে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত হচ্ছে। এটি কেবল সামরিক উপস্থিতি নয়, বরং এক “নিরাপত্তা প্রদানকারী নেটওয়ার্ক”র ভূমিকা। এর মানে ভারত শুধু নিজের স্বার্থ রক্ষা করছে না, বরং মিত্র দেশগুলোর সামুদ্রিক নিরাপত্তারও দায়িত্ব নিচ্ছে। বলতে হবে, এই ভূমিকা পালন করা সহজ নয়—এতে নৌসেনার সক্ষমতা, অর্থনৈতিক সম্পদ এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা—এই তিনেরই প্রয়োজন হয়। গত এক দশকে ভারত এই তিন ক্ষেত্রেই তার প্রস্তুতি প্রমাণ করেছে। আসলে টেডোরো লক্সিনের এই মন্তব্য সেই বিশ্বাসের প্রকাশ, যা ভারত তার আচরণ ও নীতির মাধ্যমে অর্জন করেছে। দক্ষিণ চীন সাগরে ভারতের উপস্থিতি এখন আর কেবল প্রতীকী নয়, বরং চূড়ান্ত। তার এই উপস্থিতি আগামী দিনে ফিলিপাইনসই নয়, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলোর জন্যও অনুপ্রেরণা হতে পারে। পশ্চিমা শক্তিগুলোর দ্বিধার মাঝখানে ভারতের এই আত্মবিশ্বাস আগামী বছরগুলোতে এশিয়া-প্রশান্ত অঞ্চলের শক্তিসাম্যকে নতুন দিশা দিতে পারে। যেখানে পশ্চিমা দেশগুলো কৌশলগত দলিল ও বক্তব্যে আটকে আছে, সেখানে ভারত ঢেউয়ের উপর নিজের পদচিহ্ন রেখে যাচ্ছে—কখনো মিত্র দেশের তটে, তো কখনো বিতর্কিত জলসীমার মাঝখানে। আজ এটি শুধু এক নৌসেনার গল্প নয়, বরং এমন এক দেশের কাহিনী, যে এখন বিশ্বমঞ্চে নিজের জায়গা নিজেই নির্ধারণ করছে। আর এ কারণেই দক্ষিণ চীন সাগরের ঢেউয়ে আজ ভারতীয় নৌসেনার নাম সাহস ও বিশ্বাসের প্রতিশব্দ হিসেবে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই দিকটিতে ভারতকে যে পদক্ষেপ নিতে হবে, তার মধ্যে প্রধান হবে—ভারত-ফিলিপাইনস সহযোগিতার অন্তর্গত নিয়মিত যৌথ গশ্ত, সামুদ্রিক নজরদারি ভাগাভাগি করা, সামরিক প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সরবরাহ। এই তিনটি পদক্ষেপই দক্ষিণ চীন সাগরে ভারতের উপস্থিতিকে স্থায়ী করতে পারে। এর বাইরে, আসিয়ান মঞ্চে এবং ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগর উদ্যোগে দুই দেশ একসঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো মজবুত করতে পারে। চীনের জন্য এটি এক স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ হবে। ভাল দিক হলো, এই চ্যালেঞ্জ আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন এবং “নৌপরিবহণের স্বাধীনতা”র নীতির উপর ভিত্তি করে হবে, যা ভারতকে বৈধতা ও নৈতিক উচ্চতা দুটোই প্রদান করবে।
প্রধানমন্ত্রী বিকশিত ভারত রোজগার যোজনা : আত্মনির্ভর, শক্তিশালী, সুযোগে ভরপুর ভারত গড়ার সংকল্প
ভারত আজ সেই ঐতিহাসিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখান থেকে তার দিকনির্দেশ সরাসরি বৈশ্বিক মহাশক্তি হওয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে গত পঁচাত্তর বছরে দেশ নানান উত্থান-পতন দেখেছে, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেভাবে ভারত তার অর্থনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত ও সামাজিক সক্ষমতাকে পরিপক্ব করেছে, তা যে কোনও জাতির জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ। স্বাধীনতা দিবসের উপলক্ষে লালকেল্লার প্রাচীর থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘোষণাটি এই যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ কড়ি। প্রধানমন্ত্রী বিকশিত ভারত রোজগার যোজনা কেবল একটি নীতিগত উদ্যোগ নয়, বরং এটি সেই বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গির অংশ যার অধীনে ভারতকে আত্মনির্ভর, শক্তিশালী এবং সুযোগে পরিপূর্ণ সমাজ হিসেবে গড়ার সংকল্প নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা প্রতিফলিত করে সেই বিশ্বাস যে, ভারতের ভবিষ্যৎ নিহিত আছে তার যুবসমাজের মধ্যে। এই বিশ্বাসই আমাদের সেই লক্ষ্য পর্যন্ত নিয়ে যাবে যেখানে ভারত শুধু তার নাগরিকদের জন্য সমৃদ্ধির পথ প্রশস্ত করবে না, বরং বিশ্বকেও শান্তি, অগ্রগতি ও মানবিক মূল্যের দিশা দেখাবে। এই যোজনা ১ লক্ষ কোটি টাকার ব্যয়ে কার্যকর করা হচ্ছে এবং এর আওতায় আগামী দুই বছরে ৩.৫ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম দর্শনে এই ঘোষণা হয়তো একটি সরকারি কর্মসূচি মনে হতে পারে, কিন্তু গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায় যে এটি ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি, তার সামাজিক কাঠামো এবং বৈশ্বিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কারণ, কোনও দেশের মহাশক্তি হওয়ার পথ তার যুবসমাজের হাত দিয়েই অতিক্রান্ত হয়। যুবকদের জন্যও এটি একটি সুযোগ, যেখানে তাদের সামাজিক নিরাপত্তার সুরক্ষা-কবচ দেওয়া হচ্ছে। তাদের শ্রম যদি যথাযথ মর্যাদা পায়, তবে কেবল তাদের ব্যক্তিগত সমৃদ্ধিই নয়, বরং জাতির সমষ্টিগত উন্নয়নও নিশ্চিত হয়। আজ ভারত বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি এবং নীতিগত পূর্বাভাস অনুযায়ী খুব শিগগিরই বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠবে। এটি কেবল পরিসংখ্যানের খেলা নয়, বরং এই সত্যের প্রমাণ যে ভারতের উৎপাদন, তার রপ্তানি, তার সেবা-ক্ষমতা এবং তার অভ্যন্তরীণ বাজার অভূতপূর্ব সম্প্রসারণের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এমন সময়ে যখন পশ্চিমা দেশগুলির অর্থনীতি মন্দার সঙ্গে লড়ছে, ভারতের প্রবৃদ্ধি হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এবং বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানও স্বীকার করে নিয়েছে যে, বিশ্বের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ইঞ্জিন আজ ভারত। এর পাশাপাশি ভারতের পররাষ্ট্রনীতি এবং বৈশ্বিক ভাবমূর্তিও আজ এমন যে, তা আমাদের মহাশক্তি হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও জোরদার করছে। আমেরিকা, ইউরোপ এবং জাপানের মতো উন্নত দেশ ভারতকে তাদের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখছে। ব্রিকস ও জি-২০–এর মতো মঞ্চে ভারতের নেতৃত্বদায়ক ভূমিকা স্পষ্ট। প্রতিরক্ষা উৎপাদন, মহাকাশ প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সবুজ জ্বালানির মতো ক্ষেত্রে ভারত যে অগ্রগতি করেছে, তা আগামী বছরগুলোতে বিশ্বকে পথ দেখাবে। এমন পরিস্থিতিতে যদি দেশের অভ্যন্তরীণ কাঠামো, বিশেষ করে কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়, তবে ভারতের জন্য বৈশ্বিক মহাশক্তি হওয়ার পথ আরও সহজ হবে। বর্তমানে যা প্রতীয়মান হচ্ছে, তার আলোকে লালকেল্লার প্রাচীর থেকে প্রধানমন্ত্রী যে কথা বলেছেন, তার মধ্যে এই বিকশিত ভারত রোজগার যোজনা ভারতের উন্নয়নকে সমাজের আরও গভীরে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হবে। এর ‘এ’ অংশ সরাসরি সেই যুবকদের লক্ষ্য করছে, যারা প্রথমবার কর্মজীবনে প্রবেশ করছে। যারা সদ্য পড়াশোনা শেষ করে জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করছে, তাদের দু’কিস্তিতে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রोत्सাহনমূলক অনুদান দেওয়া হবে। এটি শুধু তাদের আর্থিক চাপ লাঘব করবে না, বরং তাদের আর্থিক সাক্ষরতার গুরুত্ব সম্পর্কেও সচেতন করবে। এই দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমাদের দেশে অনেক যুবক চাকরি পেলেও সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অভ্যাস গড়ে তুলতে পারে না। এই অনুদানের একটি অংশ সঞ্চয়ী হিসাবে জমা রাখা বাধ্যতামূলক হবে, যাতে তাদের মধ্যে আর্থিক শৃঙ্খলার অভ্যাস গড়ে ওঠে। যোজনার দ্বিতীয় অংশটি নিয়োগকারীদের প্রণোদনা দেওয়ার জন্য। যতদিন শিল্প ও পরিষেবা খাত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে না, ততদিন যুবকদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না। সরকার পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, নিয়োগকারীদের ওপর চাপ কমাতে তারা প্রস্তুত। যদি কোনও কোম্পানি নতুন কর্মী নিয়োগ করে এবং তার বেতন এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত হয়, তবে সরকার দুই বছর ধরে প্রতি কর্মীর জন্য মাসিক তিন হাজার টাকা ভর্তুকি দেবে। উৎপাদন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এই প্রণোদনা চার বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এটি স্পষ্ট করে যে ভারত কেবল পরিষেবা খাতে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না, বরং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ অভিযানে গতি এনে উৎপাদন খাতকেও অর্থনীতির মেরুদণ্ড বানাতে চায়। আজ দেখা যাচ্ছে যে কেন্দ্র সরকারের বেশিরভাগ বড় পরিকল্পনাই তৃণমূল স্তরে পৌঁছে যাচ্ছে। জনধন যোজনা, উজ্ব্বলা, আয়ুষ্মান ভারত, ডিজিটাল ইন্ডিয়া, স্টার্টআপ ইন্ডিয়া এবং উৎপাদন-সংক্রান্ত প্রণোদনা (পিএলআই) তার উদাহরণ। এই পরিকল্পনাগুলো সমাজ ও অর্থনীতিতে রূপান্তর এনেছে। তাই বিকশিত ভারত রোজগার যোজনার ক্ষেত্রেও আশা করা হচ্ছে যে এটি শুধুই ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং যুবকদের বাস্তব সুযোগ করে দেবে। তাই বলা ভুল হবে না যে এই যোজনার প্রভাব ভারতের সামাজিক কাঠামোর ওপরও পড়বে। প্রকৃতপক্ষে এটিও একটি সত্য যে আমাদের দেশে আজও অসংগঠিত খাতের অংশ অত্যন্ত বড়। বিপুল সংখ্যক মানুষ কোনও সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই অস্থায়ী কাজে নিযুক্ত। কিন্তু এই যোজনা সরাসরি ইপিএফও–তে নিবন্ধিত কর্মী এবং প্যান–লিঙ্কড হিসাবযুক্ত নিয়োগকারীদের লক্ষ্য করছে। এর মানে হলো, কোটি কোটি যুবক ও লক্ষ লক্ষ প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ হবে। আর যখন কর্মশক্তি আনুষ্ঠানিক হয়, তখন তারা স্বাস্থ্যবিমা, পেনশন, ভবিষ্যৎনিধি ও অন্যান্য সুবিধা পায়। এতে সমাজে বৈষম্য কমে এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিস্তার ঘটে। ভারতের মহাশক্তি হওয়ার পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার জনসংখ্যা-গঠন। আজ ভারতের অর্ধেকের বেশি মানুষ ৩০ বছরের কম বয়সী। এই ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ আমাদের জন্য যেমন সুযোগ, তেমনি চ্যালেঞ্জও। যদি এই যুবকদের যথাযথ শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান দেওয়া যায়, তবে তারা শুধু ভারতের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে না, বরং বিশ্বজুড়েও ভারতীয় দক্ষতার ছাপ ফেলবে। কিন্তু যদি এই যুবকরা বেকারত্ব ও হতাশার শিকার হয়, তবে সামাজিক অস্থিরতাও তৈরি হতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রী বিকশিত ভারত রোজগার যোজনা সময়োপযোগী এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ। এই যোজনা ভারতের সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে বাস্তব রূপ দেয়, যেখানে প্রতিটি যুবক কেবল চাকরিই নয়, বরং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের সুযোগ পায়।