সীমানার ওপারে সাইবার অপরাধের মোকাবিলা
সকাল সকাল ডেস্ক চার্বী অরোরা (মার্কিন দূতাবাস, নয়াদিল্লি) অপরাধীরা ফোন কল, মেসেজ এবং বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডিং ব্যবহার করে সরকারি সংস্থা ও ব্যবসার ছদ্মবেশ ধারণ করে এবং হাজার হাজার মাইল দূর থেকেও ভুক্তভোগীদের অর্থ বা সংবেদনশীল তথ্য দিতে প্রতারিত করে। যেহেতু এই সাইবার-সক্ষম জালিয়াতি নেটওয়ার্কগুলি আমেরিকানদের দ্রুত লক্ষ্যবস্তু করছে, তাই আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা লাইন হয়ে উঠেছে। নয়াদিল্লিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন-এর লিগ্যাল অ্যাটাশে সুহেল দাউদ বলেন যে এই নেটওয়ার্কগুলির মোকাবিলা ঘনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের উপর নির্ভর করে। “এফবিআই প্রতিষ্ঠিত আইনি ও অপারেশনাল অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে।” তিনি বলেন। “আমাদের সহযোগিতায় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ তদন্ত সমন্বয়, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত আদান-প্রদান অন্তর্ভুক্ত।” একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি এফবিআই-এর ইন্টারনেট ক্রাইম কমপ্লেইন্ট সেন্টার (আইসি3)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী 2024 সালে সাইবার-সক্ষম অপরাধ এবং জালিয়াতি থেকে ক্ষতির পরিমাণ 16.6 বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের তুলনায় 33 শতাংশ বেশি। যেহেতু অপরাধীরা আরও অবৈধ লাভ অর্জন করে, তারা তাদের কার্যক্রম সীমানা পেরিয়ে প্রসারিত করে। প্রযুক্তি এই বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে। দাউদ ব্যাখ্যা করেন, “তারা নতুন প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সমসাময়িক ঘটনা ব্যবহার করে জালিয়াতিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।” আজ কিছু প্রতারক ভুক্তভোগীদের ঠকাতে এআই ব্যবহার করে নকল ছবি, ইমেল এবং ভয়েস তৈরি করে। তারা জোর দিয়ে বলেন, “এটি কোনো সামান্য সমস্যা নয়, এটি ডিজিটাল ক্ষেত্রে পরিচালিত সংগঠিত অপরাধ।” জালিয়াতি নেটওয়ার্কের পর্দাফাঁস অনেক সাইবার জালিয়াতি পরিকল্পনা সংগঠিত বিদেশী কল সেন্টার থেকে পরিচালিত হয়। কিছু তো যোগাযোগ তালিকা কেনা বা নকল ওয়েবসাইট তৈরির জন্য কোম্পানিগুলিকে কাজ দেওয়ার মতো পরিষেবাগুলির “চুক্তি”ও করে। যেহেতু ভুক্তভোগী, প্রমাণ এবং অপরাধী প্রায়শই একাধিক দেশে ছড়িয়ে থাকে, তাই তদন্তের জন্য ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন। দাউদ একটি সাধারণ মামলার উদাহরণ দেন: “ভারতে একটি কল সেন্টার ধরা পড়ে কিন্তু ভুক্তভোগীরা মার্কিন নাগরিক এবং আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্র আমেরিকায় থাকে। ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এফবিআই-এর সাথে যোগাযোগ করে এবং এফবিআই ভুক্তভোগীদের সাথে যোগাযোগ করে ভারতীয় আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। এফবিআই ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রমাণের আর্থিক শৃঙ্খল সম্পূর্ণ করতেও সাহায্য করে কারণ ক্ষতি আমেরিকায় হয়েছিল।” এই সহযোগিতা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। দাউদ বলেন, “এই প্রমাণ এবং ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য নিশ্চিত করে যে ভারতে কল সেন্টার পরিচালকদের আদালতে জবাবদিহি করা হয়। এই সহযোগিতা ছাড়া মামলার বিচার সম্ভব নয়।” সাম্প্রতিক একটি সাফল্য আমেরিকা-ভারত সহযোগিতার প্রভাবকে তুলে ধরে। এফবিআই বাল্টিমোর ফিল্ড অফিস, মন্টগোমেরি কাউন্টি পুলিশ বিভাগ এবং মন্টগোমেরি কাউন্টি স্টেটস অ্যাটর্নি অফিস দ্বারা পরিচালিত যৌথ তদন্ত মেরিল্যান্ডের বাসিন্দা এবং শত শত অন্যান্য আমেরিকানদের লক্ষ্য করে জালিয়াতি পরিকল্পনাগুলিকে ভারতে সংগঠিত প্রতারক কল সেন্টার পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (সিবিআই) ডিসেম্বর 2025 সালে এই কল সেন্টারগুলিকে ভেঙে দেয় এবং প্রায় 5 কোটি ডলার চুরির জন্য দায়ী অপরাধী সিন্ডিকেটের নেতৃত্বদানকারী ছয় ভারতীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করে। দাউদ বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে এমন সাফল্যের অনেক উদাহরণ রয়েছে। এই সবই এফবিআই এবং ভারতীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অংশীদার হিসেবে হাতে হাত রেখে কাজ করার ফলে সম্ভব হয়েছে।” ব্যক্তিগত মামলার বাইরে, এই প্রচেষ্টাগুলি দীর্ঘমেয়াদী ব্যাঘাত ঘটায়, অপরাধী বাস্তুতন্ত্রকে দুর্বল করে—আর্থিক চ্যানেল, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং নিয়োগ পাইপলাইনগুলিকে কেটে দেয় যা জালিয়াতি অভিযানগুলিকে টিকিয়ে রাখে। সচেতনতা কেন গুরুত্বপূর্ণ সাইবার জালিয়াতি সব বয়স এবং পটভূমির মানুষকে প্রভাবিত করে। দাউদ ব্যাখ্যা করেন যে “একটি সাধারণ ভুল ধারণা হল যে সাইবার জালিয়াতি কেবল তাদেরকেই লক্ষ্য করে যারা প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ নয়, লোকেরা প্রায়শই মনে করে যে তারা কখনও প্রতারণার শিকার হবে না। এই প্রতারণাগুলি মানব মনোবিজ্ঞানের শোষণ করে, প্রযুক্তিগত দুর্বলতার নয়।” সাইবার জালিয়াতি কোনো ভুক্তভোগী-বিহীন অপরাধ নয়। এটি অবসরপ্রাপ্তদের,”পরিবার এবং ছোট ব্যবসাগুলিকে প্রভাবিত করে। অনেক ক্ষেত্রে মানসিক প্রভাব আর্থিক ক্ষতির সমান হয়। দাউদ বলেন, “সচেতনতা আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরক্ষাগুলির মধ্যে একটি, সামান্য সতর্কতাও মানুষকে প্রতারণা চিনতে এবং আর্থিক বা মানসিক ক্ষতি এড়াতে সাহায্য করতে পারে। প্রতারণার রিপোর্ট করাও গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি যদি অর্থ ইতিমধ্যেই হারিয়ে যায়, রিপোর্ট করলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্যাটার্ন চিনতে এবং অপরাধী নেটওয়ার্কগুলিকে ব্যাহত করতে সাহায্য করে।” প্রযুক্তি দ্রুত বিকশিত হয় এবং ক্রমাগত মিথস্ক্রিয়া নিশ্চিত করে যে তদন্তকারীরা অপরাধমূলক কৌশলগুলির থেকে এগিয়ে থাকে। এই অংশীদারিত্ব কেবল আলাদা আলাদা মামলা সমাধানের বিষয়ে নয় বরং টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নির্মাণের বিষয়ে।
শোক থেকে শক্তিতে উত্তরণ: মানভূমের নারী জাগরণের রূপকার নিভা দেবী
সকাল সকাল ডেস্ক দেবরাজ মাহাতোবাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে নারী শিক্ষা এক দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত এই যাত্রাপথে বহু মহীয়সী নারী নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ইতিহাসে সুপরিচিত, কিন্তু এমন অনেকেই আছেন যাঁরা নিভৃতে থেকে একটি জনপদের অন্ধকার দূর করেছেন। পুরুলিয়ার শিক্ষা মানচিত্রে তেমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন শ্রীমতী নিভা রায়চৌধুরী। ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মীদের প্রিয় ‘বড়দিমণি’ কেবল একজন শিক্ষিকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন রুক্ষ মানভূমের মাটিতে নারী শিক্ষার বীজ বপনকারী এক দূরদর্শী কারিগর।নিভা রায়চৌধুরীর জন্ম ১৯২০ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ঢাকার প্রখ্যাত কাশীপুর জমিদার বাড়িতে। সেই সময়ে জমিদারি আভিজাত্যের সমান্তরালে তাঁদের পরিবারে শিক্ষার এক গভীর ধারা প্রবাহিত ছিল।তাঁর মাতামহ বংশের ইতিহাসও ছিল সমান গৌরবান্বিত। কলকাতার ভবানীপুরের বিখ্যাত ‘মজুমদার বাড়ি’ ছিল তাঁর মামার বাড়ি। নিভা দেবীর মা ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী স্নাতকদের মধ্যে অন্যতম এবং হাইকোর্টের প্রথম ভারতীয় বিচারপতি চন্দ্রমাধব ঘোষের পৌত্রী। এই পারিবারিক ঐতিহ্যই নিভা দেবীর অন্তরে আধুনিক চিন্তা ও শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগের জন্ম দিয়েছিল।কলকাতার গোখেল মেমোরিয়াল স্কুলে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয়। মেধাবী নিভা দেবী ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অসাধারণ ফল করেন। কিন্তু সেই যুগে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথ নারীদের জন্য মসৃণ ছিল না। তা সত্ত্বেও তিনি ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক এবং পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর (এম.এ.) ডিগ্রি অর্জন করেন। এই উচ্চশিক্ষা লাভের পেছনে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ শ্রী হরপ্রসাদ মিত্রের প্রেরণা তাঁকে মানসিকভাবে ঋদ্ধ করেছিল।নিভা দেবীর বিবাহিত জীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। মাত্র ১৯ বছর বয়সে অকাল বৈধব্য তাঁর জীবনের ওপর এক কালো ছায়া ফেলে দেয়। কিন্তু এই শোক তাঁকে স্তব্ধ করতে পারেনি। তাঁর দেওর, বিশিষ্ট পণ্ডিত ডঃ এম. এন. রায়, এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নিভা দেবীর মেধা ও কর্মশক্তিকে সমাজের কল্যাণে নিয়োগ করাই হবে শোক থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। ডঃ রায়ের অনুপ্রেরণায় নিভা দেবী সামাজিক কুসংস্কারের শৃঙ্খল ভেঙে শিক্ষার ব্রতে আত্মনিয়োগ করেন।পঞ্চাশের দশকের শুরুতে নিভা রায়চৌধুরী যখন পুরুলিয়ায় আসেন, তখন এই অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত অবহেলিত। তৎকালীন বিহার সরকারের নির্দেশে তিনি ‘শান্তময়ী বালিকা বিদ্যালয়’-এর প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।সেই সময় পুরুলিয়া ছিল মূলত বাঙালি অধ্যুষিত কিন্তু প্রশাসনিকভাবে বিহারের অংশ। নারী শিক্ষার হার ছিল নগণ্য এবং যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল শোচনীয়। রক্ষণশীল সমাজে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো ছিল বিলাসিতা মাত্র। নিভা দেবী নিজে বাড়ি বাড়ি ঘুরে অভিভাবকদের বুঝিয়ে ছাত্রীদের স্কুলে আনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।তিনি জানতেন, কেবল অক্ষরজ্ঞানই শিক্ষা নয়। তাঁর নেতৃত্বে স্কুলে চালু হয় নাচ, গান, আবৃত্তি ও বিতর্ক সভা। তিনি বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানমনস্কতা ছাড়া আধুনিক সমাজ গড়া অসম্ভব। তাঁরই প্রচেষ্টায় স্কুলে বিজ্ঞানের পঠন-পাঠন উন্নত হয়।পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের সহযোগিতায় স্কুলের বিজ্ঞান ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং ১৯৫৬ সালে রাজ্যপাল পদ্মা নাইডু এর উদ্বোধন করেন।১৯৯৮ সালের ২রা জানুয়ারি এই মহান শিক্ষাব্রতী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তিনি যে দীপশিখা জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন, তা আজও অমলিন। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে পুরুলিয়া জেলা বিজ্ঞান মেলায় ‘নিভা রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রবর্তিত হয়েছে।শ্রীমতী নিভা রায়চৌধুরী কেবল একটি নাম নয়, তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। ঢাকার জমিদারি বিলাস বিসর্জন দিয়ে পুরুলিয়ার রুক্ষ মাটিতে শিক্ষার যে ফল্গুধারা তিনি বইয়ে দিয়েছিলেন, তা আজও বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রীদের প্রেরণা জোগায়। প্রতিকূলতাকে জয় করে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, ‘বড়দিমণি’র জীবন তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।তথ্যসূত্র : ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায় (পুরুলিয়া জেলা বিজ্ঞান আধিকারিক), শান্তময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের লেখা
বিস্মৃতির অতলে এক মহাজীবন ‘সরস্বতী রাজমণি’
সকাল সকাল ডেস্ক সিদ্ধার্থ রায়, পাটনা সময়টা ছিল ১৯৪২ সাল। রেঙ্গুন (বর্তমান মিয়ানমার) শহরের সবচেয়ে ধনী এলাকায় বিশাল প্রাসাদে বাস করতেন এক ভারতীয় পরিবার। বাবা ছিলেন সোনার খনির মালিক। জন্ম থেকেই মেয়েটি দেখেছে অঢেল সম্পদ। দামি গাড়ি, রেশমি পোশাক আর হীরা-জহরত—এটাই ছিল তার শৈশব। তার নাম সরস্বতী রাজামণি। সরস্বতী রাজামণির জন্ম ১৯২৭ সালে বার্মায়, তাঁর বাবা স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন কট্টর সমর্থক ছিলেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি বার্মায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। রাজমণির বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর।কিন্তু নিয়তি তার জন্য রাজপ্রাসাদ নয়, লিখে রেখেছিল জঙ্গল আর বারুদের গন্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুঙ্গে থাকাকালীন রেঙ্গুনে এসেছেন ভারতের স্বাধীনতার শেষ আশা—নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। হাজার হাজার মানুষের সামনে তিনি বজ্রকন্ঠ ঘোষণা করলেন— “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”। সেদিন ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরী রাজামণির শরীরের রক্তে যেন আগুন ধরে গেল। তিনি সেই মুহূর্তেই নিজের গলার হার, হাতের বালা, কানের দুল—সব খুলে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’–এর তহবিলে জমা দিয়ে দিলেন। এই উদার পদক্ষেপটি নেতাজির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়নি, যিনি জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারেন যে রাজামণি রেঙ্গুনের অন্যতম ধনী ভারতীয়ের মেয়ে। পরের দিনই, তিনি সমস্ত গয়না ফেরত দেওয়ার জন্য রাজামণের বাড়িতে পৌঁছান। পরদিন সকালে সেই বিশাল প্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়াল এক সেনা জিপ। জিপ থেকে নামলেন স্বয়ং নেতাজি। তিনি এসেছিলেন সেই গয়নাগুলো ফেরত দিতে। তিনি ভেবেছিলেন, আবেগের বশে ছোট মেয়েটি ভুল করেছে, এত দামি গয়না দান করার বয়স তার নয়। কিন্তু নেতাজির চোখের দিকে তাকিয়ে রাজামণি যে উত্তর দিয়েছিলেন, তা ইতিহাস হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন— “নেতাজি, ওটা ভুল করে দিইনি। ওটা আমার দেশের জন্য দান। আর দান করা জিনিস আমি ফিরিয়ে নিই না।” রাজামণি একটি উদার পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন যেখানে মেয়েদের জন্য খুব একটা বিধিনিষেধ ছিল না। গভীর দেশপ্রেমিক এই মেয়েটির বয়স যখন মাত্র ১০ বছর তখন থেকেই সে শ্যুটিং এ দক্ষতা অর্জন করেছিল। নেতাজি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তিনি মেয়েটির চোখে কোনো ভয় দেখলেন না, দেখলেন ইস্পাতের মতো জেদ। তিনি হাসলেন। নাম দিলেন—‘সরস্বতী’। আর বললেন, ‘তোমাকে আমার দলে চাই। কিন্তু বন্দুক হাতে নয়, তোমার কাজ হবে আরও কঠিন’। ‘রাজামণি’র মৃত্যু ও ‘মণি’র জন্ম হল। নেতাজির নির্দেশে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। মেয়েদের লম্বা চুল কেটে ফেলা হলো। পরানো হলো ঢিলেঢালা শার্ট আর প্যান্ট। সরস্বতী রাজামণি হয়ে গেলেন—‘মণি’। তার সঙ্গী হলেন আরেক সাহসী মেয়ে—দুর্গা। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলো গুপ্তচরবৃত্তির। সেসময়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপ্তচর বিভাগে নীরা আর্য, সরস্বতী রাজমণি, মনবতী আর্য এবং দুর্গা মল্লা-র মত নির্ভীক মেয়েরা জীবনকে বাজী রেখে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, রাজমণিকে একজন কর্মীর ছদ্মবেশে কলকাতার ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে গুপ্তচর হিসেবে পাঠানো হয়েছিল যাতে তিনি ব্রিটিশদের গোপন তথ্য পেতে পারেন এবং আই এন এ-এর সাথে তা ভাগ করে নিতে পারেন। ১৯৪৩ সালে ভারতীয় সীমান্তে নেতাজির গোপন সফরের সময় নেতাজিকে হত্যার ব্রিটিশ পরিকল্পনা উন্মোচনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভাবা যায়? ১৫ বছরের এক কিশোরী, যে কয়েকদিন আগেও পালঙ্কে ঘুমাতো, সে এখন ব্রিটিশ মিলিটারির মেস-এ কাজ করছে ‘বয়’ হিসেবে! তাদের কাজ ছিল ব্রিটিশ অফিসারদের জুতো পালিশ করা, ঘর ঝাড়ু দেওয়া আর চা পরিবেশন করা। ব্রিটিশ জেনারেলরা ভাবত, এরা তো সাধারণ স্থানীয় বাচ্চা ছেলে, এরা ইংরেজির কী বুঝবে? তাই তাদের সামনেই চলত যুদ্ধের গোপন মিটিং। ম্যাপ খুলে তারা দেখাত—কোথায় আইএনএ-র ওপর বোমা ফেলা হবে, কোন রাস্তা দিয়ে রসদ যাবে। প্রায় দুই বছর ধরে সরস্বতী রাজামণি এবং তার মহিলা সহকর্মীরা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য ছেলেদের ছদ্মবেশে নিজেদেরকে ধারণ করেছিলেন। আর ঘরের কোণে জুতো পালিশ করতে করতে ‘মণি’র কান খাড়া থাকত। তাঁর মস্তিষ্ক দ্রুত রেকর্ড করে নিত প্রতিটি তারিখ, প্রতিটি কোড। কাজ শেষ করে বাথরুমে গিয়ে চিরকুটে সব লিখে, রুটির ভেতর বা জুতোয় লুকিয়ে সেই খবর পৌঁছে দেওয়া হতো নেতাজির ক্যাম্পে। দিনের পর দিন, মৃত্যুর সাথে এই লুকোচুরি চলতে লাগল। এল সেই কালরাত্রি: এক অসীম সাহসের রোমাঞ্চকর কাহিনী। গুপ্তচরের জীবন মানেই প্রতি মুহূর্তে ধরা পড়ার ভয়। একদিন সত্যি হলো সেই দুঃস্বপ্ন। রাজামণির সঙ্গী দুর্গা ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়ে গেলেন। খবর এল, তাঁকে মিলিটারি জেলে আটকে রাখা হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তার ওপর অমানুষিক অত্যাচার শুরু হবে কথা বের করার জন্য। আইএনএ-র নিয়ম ছিল কঠোর—ধরা পড়লে নিজেকে শেষ করে দাও, কিন্তু ধরা দিও না। সবাই রাজমণিকে বলল, “পালিয়ে এসো, ওখানে গেলে তুমিও মরবে।” কিন্তু রাজমণি সেদিন বলেছিলেন— “আমার বন্ধু ধরা পড়েছে, আর আমি পালিয়ে আসব ? এটা আমি হতে দেব না।” রাতের অন্ধকারে, ছেলেদের ছদ্মবেশে রাজমণি ঢুকে পড়লেন ব্রিটিশদের সেই কঠোর নিরাপত্তার দুর্গে। তিনি জানতেন প্রহরীদের দুর্বলতা। তিনি প্রহরীদের খাবারে ও চায়ে মিশিয়ে দিলেন শক্তিশালী আফিম। প্রহরীরা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন চাবি চুরি করে তিনি খুললেন দুর্গার সেলের দরজা।দুর্গাকে নিয়ে যখন তিনি জেলের পাঁচিল টপকাচ্ছেন, ঠিক তখনই বেজে উঠল সাইরেন। শুরু হলো সার্চলাইটের আলো আর এলোপাথাড়ি গুলি। অন্ধকারে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ মনে হলো আগুনের একটা গোলা এসে লাগল তার ডান পায়ে। একটা বুলেট রাজমণির পা ভেদ করে চলে গেছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মাটি। যন্ত্রণায় শরীর দুমড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি থামলেন না। কারণ থামলেই মৃত্যু—শুধু নিজের নয়, তার বন্ধুরও। আহত পায়ে, রক্তক্ষরণ হতে থাকা অবস্থায়, তিনি আর দুর্গা পাশের গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়লেন। ব্রিটিশ সৈন্যরা কুকুর নিয়ে তাদের খুঁজছে। বাঁচার জন্য রাজমণি আর দুর্গা একটি বিশাল গাছের ওপর চড়ে বসলেন। বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে— টানা তিন দিন (৭২ ঘণ্টা) সেই গাছের ওপর বসে ছিলেন তাঁরা। পায়ে গুলি, শরীর জ্বরে পুড়ছে, জল নেই, খাবার নেই। নিচে ব্রিটিশ পেট্রল ঘুরছে। একটু শব্দ হলেই সব শেষ। তিন দিন পর যখন ব্রিটিশরা হাল ছেড়ে চলে গেল, তখন তারা গাছ থেকে নেমে খোঁড়াতে খোঁড়াতে পৌঁছালেন আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাম্পে। আজাদ হিন্দ ক্যাম্পে ফিরে তিনি যন্ত্রণায় প্রায় অজ্ঞান, তখন তাঁকে দেখতে এলেন নেতাজি। ডাক্তাররা যখন তার পা থেকে বুলেট বের করলেন, নেতাজি সেই লড়াকু মেয়েটিকে স্যালুট করে বলেছিলেন— “আমি জানতাম না আমাদের বাহিনীতে এত বড় বারুদ লুকিয়ে আছে। তুমি ভারতের বীরাঙ্গনা, তুমি আমার ঝাঁসির রানি।” নেতাজি তাঁকে জাপানের সম্রাটের দেওয়া নিজের পিস্তল উপহার দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাজমণি চেয়েছিলেন শুধু দেশের স্বাধীনতা। রাজমণির সাহসিকতার জন্য, তাঁকে পদক দিয়ে সম্মানিত করা হয় এবং রেজিমেন্টে লেফটেন্যান্ট পদে প্রোন্নতি করা হয়। বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া এক কিংবদন্তী নারীর নাম সরস্বতী রাজমণি। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু যে মেয়েটি দেশের জন্য নিজের যৌবন, রক্ত আর বাবার সম্পত্তি সব দিয়েছিলেন—দেশ কি তাকে মনে রেখেছিল ? না। ইতিহাসের বইয়ে তাঁর নাম জায়গা পায়নি। যে রাজমণি একসময় সোনার পালঙ্কে ঘুমাতেন, জীবনের শেষ কয়েকটা দশক তিনি কাটিয়েছেন চেন্নাইয়ের রায়পেট্টায়—এক কামরার এক জরাজীর্ণ ভাড়া বাড়িতে। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। সরকার তাকে মুক্তিযোদ্ধার পেনশন দিতে অনেক দেরি করেছিল। তবুও তার কোনো অভিযোগ ছিল না। ২০০৪
প্রাচীন ভারতে নগরবধূর এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস
সিদ্ধার্থ রায়, পাটনা বৈশালী জেলা প্রাচীন ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যা বিশ্বের প্রথম প্রজাতন্ত্র হিসেবে পরিচিত, মহাবীরের জন্মস্থান, বুদ্ধের শেষ ধর্মোপদেশের স্থান, এবং বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের জন্য পবিত্র। এই জেলাটি তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি কলা ও লিচুর জন্যও বিখ্যাত। প্রাচীন ভারতের গণতান্ত্রিক শহর বৈশালী বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যের অর্ন্তগত। সে সময়ের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী এবং নর্তকী আম্রপালী বাস করতেন এই বৈশালী শহরে। আম্রপালীর জন্ম হয় আজ থেকে ২,৫০০ বছর আগে। মাহানামন নামে এক ব্যক্তি শিশুকালে আম্রপালীকে আম গাছের নিচে খুঁজে পান। তাঁর আসল বাবা-মা কে ইতিহাস ঘেঁটেও তা জানা যায়নি । যেহেতু তাকে আম গাছের নিচে পাওয়া যায় তাই তার নাম রাখা হয় আম্রপালী। অর্থাৎ আমগাছের নবীন পাতা। মাহানমন পেশায় মালী ছিলেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী আম্রপালীকে লালন পালন করেন। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা দিতেই আম্রপালীকে নিয়ে হইচই পড়ে যায়। তাঁর রূপে চারপাশের মানুষ বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়ে যান । দেশ-বিদেশের রাজা, রাজপুত্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ তাঁকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে ওঠে। নানা জায়গায় থেকে তাকে নিয়ে দ্বন্দ, ঝগড়া আর বিবাদের খবরও আসতে থাকে। সবাই তাকে একনজর দেখতে চান, বিয়ে করতে চান।ইতিহাস বলে বৈশালির রাজা মনুদেব যখন আম্রপালিকে প্রথম দেখেন তখন থেকেই তিনি তাকে “নিজের” অধিকারে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করতে শুরু করেন। তিনি আম্রপালির বিয়ের দিন আম্রপালির শৈশব প্রেম এবং হবু বর পুষ্পকুমারকে হত্যা করেন এবং এরপর রাজার নির্দেশে বৈশালীর সকল ক্ষমতাবান ও ধনবান ব্যক্তি মিলে আম্রপালিকে নিয়ে বৈঠকে বসেন। নানা আলোচনার পর তৎকালীন বৈশালীর ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা যে সিদ্ধান্ত নেন তা হল, আম্রপালীকে কেউ বিয়ে করতে পারবেন না। কারণ তার রুপ। সে একা কারো হতে পারে না। আম্রপালী হবে সবার। সে হবে একজন নগরবধু, মানে পতিতা। এটা ছিল একটা বিস্ময়কর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত । ইতিহাসে এভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে কাউকে পতিতা বানানো হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত খুবই বিরল ! একটি সরকারী ঘোষণায় আম্রপালিকে বৈশালীর নগরবধূ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাঁকে সাত বছরের জন্য রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দরী ও মেধাবী মেয়েদের জন্য নির্ধারিত বৈশালী জনপদ কল্যায়নী উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। আম্রপালী তার প্রেমিকদের নির্বাচন করতে পারতেন কিন্তু পূর্বোক্ত রীতি অনুসারে তিনি কোনও একজনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে পারতেন না। আম্রপালীকে নগরবধূ করার জন্য সে সভায় পাঁচটি শর্ত রাখা হয়েছিল :- (১) নগরের সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় তার ঘর হবে ।(২) তার মুল্য হবে প্রতি রাত্রির জন্য পাঁচশত স্বর্ণমুদ্রা । (৩) একবারে মাত্র একজন তাঁর গৃহে প্রবেশ করতে পারবেন। (৪ ) শক্র বা কোন অপরাধীর সন্ধানে প্রয়োজনে সপ্তাহে সর্বোচ্চ একবার তাঁর গৃহে প্রবেশ করা যাবে। (৫) তাঁর গৃহে কে এলেন আর কে গেলেন- এ নিয়ে কোন অনুসন্ধান করা যাবে না। সবাই এসব শর্ত মেনে নেন। এভাবে দিনে দিনে আম্রপালী বিপুল ধন-সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। তার রুপের কথাও দেশ-বিদেশে আরও বেশী করে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। প্রাচীন ভারতের মগধ রাজ্যের রাজা ছিলেন বিম্বিসার। কথিত রয়েছে যে রাজার স্ত্রীর সংখ্যাও নাকি অনেক ছিল ! নর্তকীদের নাচের এক অনুষ্ঠানে তিনি এক নর্তকীর নাচ দেখে বলেছিলেন, এ নর্তকী বিশ্বসেরা ।তখন তার একজন সভাসদ বলেন- মহারাজ, এই নর্তকী আম্রপালীর নখের যোগ্য নয় ! বিম্বিসারের এই কথাটি নজর এড়ায়নি । তিনি তার সেই সভাসদের থেকে আম্রপালী সম্পর্কে বিস্তারিত শুনে তাকে কাছে পাবার বাসনা করেন। কিন্তু তার সভাসদ বলেন, সেটা সম্ভব নয় । কারণ, তাহলে আমাদের যুদ্ধ করে বৈশালী রাজ্য জয় করতে হবে আর আম্রপালীর দেখা পাওয়াও এত সহজ নয়। দেশ-বিদেশের বহু রাজাসহ রাজপুত্ররা আম্রপালীর প্রাসাদের সামনে তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। কিন্তু মন না চাইলে তিনি কাউকে দেখা দেন না। একথা শুনে বিম্বিসারের আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ছদ্মবেশে বৈশালী রাজ্যে গিয়ে আম্রপালীকে দেখে আসবেন। কি এমন আছে সেই নারীর মাঝে, যার জন্য পুরো পৃথিবী পাগল হয়ে আছে ! তারপর বহু চড়াই উৎরাই শেষে রাজার আম্রপালীর সাথে দেখা করার সুযোগ হয়। আম্রপালীর প্রাসাদ আম্রকুঞ্জে। কিন্তু দেখা করতে গিয়ে রাজা চমকে উঠেন, এত কোন নারী নয় ; যেন সাক্ষাৎ পরী ! এ কোনভাবেই মানুষ হতে পারেন না। এত রুপ মানুষের কিভাবে হতে পারে ! কিন্তু অবাক রাজার জন্য আরও অবাক কিছু অপেক্ষা করছিল। কারণ, আম্রপালী প্রথম দেখাতেই তাঁকে মগধ রাজ্যের রাজা বলে চিনে ফেলেন এবং জানান- তিনি তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন বহু আগে থেকেই। এই কথা শুনে রাজার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। রাজা সাথে সাথে তাঁকে তাঁর রাজ্যের রাজরাণী বানানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু আম্রপালী জানান, তাঁর রাজ্যের মানুষ এটা কখনোই মেনে নেবেন না। উল্টো বহু মানুষের জীবন যাবে এবং রক্তপাত ঘটবে ! তাই রাজাকে দ্রুত এখান থেকে চলে যেতে বলেন। কিন্তু বিম্বিসার বৈশালী আক্রমন করে আম্রপালীকে পেতে চান। ওদিকে আম্রপালী তাঁর নিজের রাজ্যের কোন ক্ষতি চান না। তাই তিনি কিছুদিন অবস্থানের পর রাজাকে তাঁর নিজ রাজ্যে ফেরত পাঠান এবং বৈশালীতে কোন আক্রমণ হলে তিনি তা মেনে নেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। পরবর্তীতে ইতিহাস জানান দেয় যে বিম্বিসারের পুত্র অজাতশত্রুও আম্রপালীর প্রেমে মগ্ন ছিলেন । তিনি বিম্বিসারকে আটক করে নিজে সিংহাসন দখল করে বসেন এবং আম্রপালীকে পাওয়ার জন্য বৈশালী রাজ্য আক্রমণ করে বসেন। কিন্তু দখল করতে সক্ষম হননি এবং খুব বাজেভাবে আহত হন। যুদ্ধের পর দেশের এহেন অবস্থায় বিধ্বস্ত হয়েছিলেন বৈশালীর নগরবধূকিন্তু তবু তিনি মগধ রাজ অজাতশত্রুর কুক্ষিগত হননি কভূ। পরবর্তীতে আম্রপালীর সেবায় সুস্থ হয়ে গোপনে তার নিজের রাজ্যে ফেরত যান। সেদিনও আম্রপালী অজাতশত্রুর বিয়ের প্রস্তাব সবিনয়ে ফিরিয়ে দেন। অজাতশত্রুর সাথে যুদ্ধে ধ্বংসলীলার পর ফের মাথা তুলে দাঁড়ায় বৈশালী। ধীরে ধীরে আবার স্বস্থির জীবন কাটাতে থাকেন আম্রপালী। আম্রপালীর জীবনে একের পর এক বৈচিত্রতা ও নাটকীয়তার পর শেষের দিকে এক প্রগাঢ় শান্তি ও উপাসনায় মগ্ন জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তখন গৌতম বুদ্ধর সময়কাল। গৌতম বুদ্ধ তার কয়েকশ সঙ্গী নিয়ে বৈশালী রাজ্যে এলেন। একদিন নিজের মহলের বারান্দা থেকে এক বৌদ্ধ তরুণ সন্ন্যাসীকে দেখে আম্রপালীর মনে ধরে গেল । তিনি ভাবলেন, দেশ-বিদেশের রাজারা আমার পায়ের কাছে এসে বসে থাকেন আর এত সামান্য একজন মানুষ। তিনি সেই সন্ন্যাসীকে চার মাস তার কাছে রাখার জন্য গৌতম বুদ্ধকে অনুরোধ করলেন। সবাই ভাবলেন, বুদ্ধ কখনই রাজি হবেন না। কারণ, একজন সন্ন্যাসী এমন একজন পতিতার কাছে থাকবেন ; এটা হতেই পারে না। কিন্তু গৌতম বুদ্ধ তাকে রাখতে রাজি হলেন এবং এটাও বললেন, আমি ‘শ্রমণ’ এর (তরুণ সে সন্ন্যাসীর নাম ছিল) চোখে কোন কামনা-বাসনা দেখছি না । সে চার মাস থাকলেও নিষ্পাপ হয়েই ফিরে আসবে- এটা আমি নিশ্চিত ! চার মাস শেষ হল। গৌতম বুদ্ধ তার সঙ্গীদের নিয়ে চলে যাবেন। তরুণ শ্রমণের কোন খবর নেই । তবে কি আম্রপালীর রুপের কাছেই হেরে গেলেন শ্রমণ ? সেদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে তরুণ শ্রমণ ফিরে আসেন। তার পিছনে পিছনে আসেন একজন নারী । সেই নারীই ছিলেন আম্রপালী। আম্রপালী তখন বুদ্ধকে বলেন, তরুণ
দিগ্বিজয় সংগঠনের শক্তির কথা উল্লেখ করলেন, দিলেন দলের নেতৃত্বকে বার্তা
সকাল সকাল ডেস্ক রাঁচি কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা দিগ্বিজয় সিং লালকৃষ্ণ আদভানি এবং নরেন্দ্র মোদীর একটি পুরনো ছবি পোস্ট করে যেভাবে লিখেছেন যে আরএসএস-এর একজন স্বয়ংসেবক এবং বিজেপির একজন তৃণমূল কর্মী মাটিতে বসে মুখ্যমন্ত্রী এবং তারপর প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তা নিয়ে আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক। এর কারণ আরও বেশি, কারণ তিনি এই ছবির সাথে তার মনের কথা সেই সময় শেয়ার করেছেন, যখন কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক চলছিল। তিনি উক্ত ছবিটিকে প্রভাবশালী বলে বর্ণনা করে এটিকে সংগঠনের শক্তির প্রতীকও বলেছেন। উল্লেখযোগ্য শুধু এটিই নয় যে তাকে সংগঠনের শক্তি বোঝানোর জন্য এই ছবিটিই উপযুক্ত মনে হয়েছে, বরং এটিও যে তিনি তার পোস্টে মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এবং প্রধানমন্ত্রী মোদীকেও ট্যাগ করেছেন। যদিও এই পোস্ট নিয়ে আলোচনার বাজার গরম হওয়ার পর তিনি সাফাই দিয়েছেন যে আমি কেবল সংগঠনের প্রশংসা করেছি এবং আমি তো আরএসএস এবং মোদীজির ঘোর বিরোধী, কিন্তু তার কথা থেকে এটি তো স্পষ্ট হয়েই গেছে যে তিনি কংগ্রেসের সাংগঠনিক দুর্বলতা নিয়ে চিন্তিত এবং তিনি চান যে দলের নেতৃত্ব সংগঠনের দিকে মনোযোগ দিক। এটি কয়েক দিন আগে তার সেই পোস্ট থেকে আরও ভালোভাবে বোঝা যায়, যেখানে তিনি রাহুল গান্ধীকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন যে কংগ্রেসের সংস্কার এবং বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজন। এই পোস্টে তিনি এই প্রত্যাশা তো ব্যক্ত করেছিলেন যে রাহুল এমনটা করবেন, কিন্তু এর সাথে এটিও বলেছিলেন যে সমস্যা হল তাকে রাজি করানো কঠিন। এটি প্রথমবার নয়, যখন কংগ্রেসের কোনো নেতা দলের দুর্বলতাগুলো তুলে ধরেছেন, কিন্তু কোথাও কোনো মৌলিক পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। এটি এই কারণে হচ্ছে না, কারণ গান্ধী পরিবার চাটুকার নেতাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত। কংগ্রেসে তারই কদর আছে, যে পরিবারের গুণগান করে। এক সময় গান্ধী পরিবার কংগ্রেসের শক্তি ছিল, কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। ইন্দিরা গান্ধীর সময় তো তখনও ভালো ছিল, কিন্তু তার মৃত্যুর পর যখন রাজীব গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী করা হল তখন চাটুকার নেতাদের গুরুত্ব বেড়ে গেল এবং কংগ্রেস দুর্বল হতে থাকল। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যা থেকে উদ্ভূত সহানুভূতির কারণে ১৯৮৪ সালে তো কংগ্রেস বিপুল জয় পেয়েছিল, কিন্তু তারপর থেকে সে কখনও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। আজ সোনিয়া এবং রাহুলের কংগ্রেস সেই আঞ্চলিক দলগুলোর উপর নির্ভরশীল, যারা তার থেকেই ভেঙে তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের লাগাম যদিও খাড়গের হাতে, কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা গান্ধী পরিবারের কাছেই আছে এবং তারা সংগঠনকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে নিজেদের ব্যর্থতার দোষ মোদী সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের উপর চাপাতে ব্যস্ত।
ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের ঐতিহাসিক জয়
সকাল সকাল ডেস্ক। ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট দল প্রথমবারের মতো একদিনের বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাস গড়েছে। এই জয় শুধু একটি ট্রফি জেতার নয়, এটি ভারতীয় মেয়েদের প্রতিভা, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। এই সাফল্য দেশের লাখো মেয়ের জন্য নতুন পথ খুলে দিয়েছে—যেখানে তারা খেলাধুলা বা অন্য যেকোনো ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে। এই জয় সমাজের পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এটি প্রমাণ করেছে, মেয়েরাও ছেলেদের মতোই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে জয় আনতে পারে। এর ফলে শুধু মহিলার ক্ষমতায়নই নয়, খেলাধুলার গুরুত্বও সমাজে আরও বৃদ্ধি পাবে। কারণ আজকের যুগে খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়, বরং একটি দেশের উন্নতির প্রতীক। মহিলা দলের এই জয় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর আগে কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে ভারতের মেয়েরা শিরোপা জিততে পারেনি। এতদিন মহিলা বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড এবং নিউজিল্যান্ডেরই আধিপত্য ছিল। ভারতের জয় তাই শুধু নিজেদের নয়, উন্নয়নশীল দেশের নারী ক্রিকেটারদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। ফাইনাল ম্যাচের আগে থেকেই দেশের মানুষের উচ্ছ্বাস ছিল তুঙ্গে। স্টেডিয়ামে বিপুল দর্শকসমাগম এবং খেলোয়াড়দের প্রতি বিশ্বাসই প্রমাণ করেছিল যে ভারতীয় দল এবার ইতিহাস গড়বে। অধিনায়ক হরমনপ্রীত কৌর ও তার দল সেই প্রত্যাশা পূরণ করেছে। অনেকে এই জয়কে ১৯৮৩ সালের পুরুষ দলের বিশ্বকাপ জয়ের সঙ্গে তুলনা করছেন। যেমন তখন কাপিল দেবের নেতৃত্ব ভারতীয় ক্রিকেটের চেহারা বদলে দিয়েছিল, তেমনই আজ মহিলা দলের জয় ভবিষ্যতের প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। ২০০৬ সালে যখন বিসিসিআই মহিলা ক্রিকেটের দায়িত্ব নেয়, তখন থেকেই পরিবর্তন শুরু হয়। সমান পুরস্কার, ভালো সুযোগ-সুবিধা ও মহিলা প্রিমিয়ার লিগ চালু করার ফলে আজ ভারতের কন্যারা বিশ্বের শীর্ষে। এই জয় সেই দীর্ঘ পরিশ্রম ও বিশ্বাসের ফল।
আরেকটি বাসে আগুন, দেশে জননিরাপত্তা ঈশ্বরের হাতে
আমাদের দেশে গণপরিবহন কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তার প্রমাণ হলো দশ দিনের মধ্যে দুটি এসি বাসে আগুন লেগে ৪৫ জনের বেশি যাত্রীর মৃত্যু। প্রথম দুর্ঘটনায় ১৪ অক্টোবর জয়সলমের থেকে যোধপুরগামী একটি এসি বাসে শর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগে ২৬ জন যাত্রী মারা যান। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার তদন্তে জানা গেছে যে বাসের কাঠামোতে অনেক নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছিল। দ্বিতীয় ঘটনাটি গত দিন অন্ধ্রপ্রদেশে ঘটেছে। এখানে হায়দ্রাবাদ থেকে বেঙ্গালুরুগামী একটি এসি বাসে আগুন লেগে ২০ জন বাসযাত্রী মারা গেছেন। এই দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে যে বাসের নিচে একটি মোটরসাইকেল চলে এসেছিল। এতে তার ফুয়েল ট্যাঙ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং তাতে আগুন লেগে যায়।
জোট রাজনীতির ধর্ম
অশোক গেহলটের এই ঘোষণা থেকে বোঝা যায় যে, এখনও পর্যন্ত এমনটা না হওয়ার কারণ ছিল কংগ্রেসের অনিচ্ছা। এই অনিচ্ছা থেকে এটাই স্পষ্ট যে কংগ্রেসকে এখনও জোট রাজনীতির ধর্মের মর্ম জানতে হবে। শেষ পর্যন্ত সে এই সাধারণ কথাটি কেন বুঝতে পারল না যে বিহারে আরজেডিই প্রধান বিরোধী দল এবং তেজস্বী যাদব তার সর্বসম্মত নেতা। কংগ্রেসের মতে, তারা মহাজোটের ঐক্যবদ্ধতার জন্য এই ঘোষণা করেছে।
বিশ্বসংস্কৃতি, সাহিত্য ও টেলিভিশনের টানাপোড়েন
বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে টেলিভিশন যখন ভারতীয় ঘরে প্রবেশ করতে শুরু করল, তখন অনেকে ভেবেছিলেন—এ যেন নতুন দিগন্ত উন্মোচন। আড্ডার আসরে, রাতের খাবারের টেবিলে কিংবা গ্রামীণ হাটে–বাজারে, সাদা-কালো পর্দার আলো হয়ে উঠেছিল বিনোদনের প্রধান আকর্ষণ।
রিলসের দুনিয়া আর হারিয়ে যাওয়া সামাজিক আদর্শ
সকাল সকাল ডেস্ক। ভারতের সামাজিক চেতনা একসময় গান্ধী, নেহরু, ভগত সিং, আম্বেদকর আর সুভাষের মতো মহাপুরুষদের কাহিনি থেকে গড়ে উঠত। আজ সেই জায়গা দখল করেছে সোশ্যাল মিডিয়ার “ভাইরাল তারকারা”। লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার আর লাইকসওয়ালা ব্লগার আর রিল-নির্মাতারা তরুণ প্রজন্মের নতুন রোল মডেল হয়ে উঠেছে। বিনোদনের নামে এই সংস্কৃতি আসল আদর্শকে আড়াল করে দিচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে—আমাদের আগামী প্রজন্ম কি ত্যাগ আর সংগ্রামের উত্তরাধিকারকে মনে রাখবে, নাকি কেবল “ট্রেন্ডিং ভিডিও”-র মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে? কখনো এই দেশের আত্মা বাস করত তার মহাপুরুষদের চিন্তা আর সংগ্রামে। আমাদের আদর্শ ছিলেন মহাত্মা গান্ধী, যিনি সত্য আর অহিংসা দিয়ে সাম্রাজ্য কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। ভগত সিং আর চন্দ্রশেখর আজাদ, যারা প্রাণ বিসর্জন দিয়ে তরুণদের সাহস আর আত্মত্যাগের বার্তা দিয়েছিলেন। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, যার ডাক আজও শোনা যায়—“তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।” ড. ভীমরাও আম্বেদকর, যিনি আধুনিক ভারতের সংবিধানের ভিত্তি গড়েছিলেন। চৌধুরী ছোটুরাম, যিনি কৃষক আর শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর উঁচু করেছিলেন, সমাজে ন্যায়ের লড়াই লড়েছিলেন। এরা সেই মানুষ, যারা সংগ্রাম, ত্যাগ আর চিন্তাশীলতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। গ্রামের আড্ডা থেকে শুরু করে শহরের বৈঠকখানা পর্যন্ত, প্রতিটি সভা-সমিতিতে এই মহাপুরুষদের ছবি ঝুলত। শিশুরা তাদের গল্প শুনে বড় হতো। সমাজে যে-ই এগিয়ে যেতে চাইত, সে এই আদর্শ থেকে প্রেরণা নিত। ত্যাগ, শৃঙ্খলা, সাহস আর সমাজসেবাই রোল মডেলের সংজ্ঞা ছিল। রোল মডেল হওয়া মানে ছিল অন্যকে অনুপ্রাণিত করা, সমাজকে দিকনির্দেশ দেওয়া আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উঁচুতে নিয়ে যাওয়া। সময় বদলেছে। প্রযুক্তি আর সোশ্যাল মিডিয়া পুরো ছবিটাই উল্টে দিয়েছে। এখন রোল মডেল মানে সমাজে গভীর ছাপ ফেলা মহাপুরুষ নয়, বরং সেই ব্যক্তি, যিনি ক্যামেরার সামনে সবচেয়ে বেশি হৈচৈ করে, সবচেয়ে অদ্ভুত কাণ্ড করে আর যার ভিডিও সবচেয়ে বেশি “ভাইরাল” হয়। আজ তরুণদের মুখে যাদের নাম শোনা যায়, তারা কোনো আন্দোলনের নায়ক নন, কোনো বড় মতাদর্শের বাহকও নন। তারা হলেন “গোয়ার ফ্যামিলি ব্লগ”, “টিঙ্কু সুটো আঁলি”, “ঢিমাকানা সিং কুঁচকির নাচনওয়ালা”—এমন চরিত্র, যারা কেবল হাসি-ঠাট্টা, চাকচিক্য আর দেখনদারির জোরে বিখ্যাত হয়ে গেছেন। বিরোধাভাস হলো, মানুষ তাদের দেখে নিজের সময়, শক্তি, এমনকি কখনো কখনো নিজের চিন্তাভাবনাও খরচ করে ফেলছে। আজ গ্রামের পর গ্রাম, গলির পর গলি জুড়ে বাচ্চা আর তরুণরা এই ইউটিউব চ্যানেল, টিকটক-স্টাইল রিল আর ইনস্টাগ্রাম লাইভওয়ালাদেরকেই আদর্শ হিসেবে মানতে শুরু করেছে। আগে যেখানে শিশুরা বলত, তারা বড় হয়ে ভগত সিং বা আম্বেদকরের মতো হতে চায়, এখন অনেক শিশু বলে বসে—তারা “ইউটিউবার”, “ব্লগার” বা “ইনফ্লুয়েন্সার” হতে চায়। সোশ্যাল মিডিয়ার এই ধারা শুধু বিনোদনেই সীমাবদ্ধ নয়। এটা ধীরে ধীরে আমাদের সমাজের চিন্তা আর সংস্কারকে প্রভাবিত করছে। যখন কোনো মহিলা কেবল মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার জন্য নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্ক জনসমক্ষে এনে ফেলে, যখন স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া বিনোদনে পরিণত হয়, যখন “লুগাই লুগাই কো আপনা খসম বতান লাগি”-র মতো কথা ট্রেন্ড হতে শুরু করে, তখন স্পষ্ট বোঝা যায় যে আমাদের সমাজের বড় একটি অংশ বিনোদন আর মজার নামে গুরুতর মূল্যবোধ থেকে সরে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন বিপজ্জনক, কারণ সমাজ গড়ে ওঠে তার নির্বাচিত আদর্শের মতো। যদি রোল মডেলরা হন সেইসব লোক, যারা শুধু হাততালি আর ভিউয়ের জন্য অদ্ভুত কাণ্ড করে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ত্যাগ আর সংগ্রামের বদলে সস্তা জনপ্রিয়তার পথই বেছে নেবে। আসল পরিশ্রম, পড়াশোনা, মনন আর সামাজিক অবদান পিছিয়ে যাবে। এটাও অস্বীকার করা যায় না যে এই প্রবণতার একটি অর্থনৈতিক দিকও আছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো জনপ্রিয়তাকে সরাসরি অর্থের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে। যার ভিডিও বেশি চলবে, তার আয়ও বেশি হবে। তাই লক্ষ লক্ষ তরুণ না ভেবেই এই পথে দৌড়াচ্ছে। তারা ভাবে সমাজসেবার চেয়ে অনেক বেশি লাভজনক হলো মজার ভিডিও বানানো। এ কারণেই মহাপুরুষদের জীবনী পড়া তরুণদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, আর “কনটেন্ট ক্রিয়েটর” হওয়ার ভিড় বাড়ছে। কিন্তু এই অবস্থা কি স্থায়ী? সমাজ কি সত্যিই এত দ্রুত আদর্শ থেকে বিমুখ হয়ে যাবে? এর উত্তর এত সহজ নয়। ইতিহাস সাক্ষী যে প্রতিটি সমাজেই এক সময় আসে, যখন মূল্যবোধ ফাঁপা মনে হয় আর বাহ্যিক চাকচিক্য বেশি প্রভাব ফেলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যায় সেই সমাজ, যারা নিজেদের সত্যিকারের আদর্শকে মনে রাখে। ভারতের মতো দেশে, যার আত্মা স্বাধীনতা সংগ্রাম আর সামাজিক ন্যায়ের লড়াই থেকে গড়ে উঠেছে, সেখানে মানুষ কোনোদিনও মহাপুরুষদের ভুলে যেতে পারে না। প্রয়োজন এক ভারসাম্য আনার। বিনোদন আর প্রযুক্তি জীবনের অংশ, কিন্তু এগুলোকে আদর্শ করা যায় না। রোল মডেল হওয়া উচিত সেইসব মানুষ, যারা সমাজকে এগিয়ে নেবে, মানুষের মধ্যে আস্থা আর প্রেরণা জাগাবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ত্যাগ, সাহস আর সেবার পথে চালিত করবে। আজও এমন মানুষ আমাদের চারপাশে আছেন—বিজ্ঞানী, শিক্ষক, কৃষক, সেনা, ডাক্তার, সমাজকর্মী—যারা নীরবে নিজেদের পরিশ্রম আর সততার মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সমাজের উচিত এই গল্পগুলো শিশু ও তরুণদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। মিডিয়া আর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব আছে যে তারা শুধু সস্তা বিনোদনকেই মঞ্চ দেবে না, বরং আসল নায়কদের কাহিনি প্রকাশ করবে। স্কুল-কলেজে মহাপুরুষদের জীবনী আবার পড়ানো হোক, স্থানীয় স্তরে সমাজসেবী আর কর্মঠ মানুষদের সামনে আনা হোক। তাহলেই আমরা সেই হারানো ভারসাম্য ফিরে পাবো, যেখানে বিনোদন থাকবে তার জায়গায়, আর আদর্শ থাকবে তার জায়গায়। আজ যখন আমরা পিছনে ফিরে তাকাই আর পূর্বপুরুষদের উত্তরাধিকার স্মরণ করি, তখন স্পষ্ট বোঝা যায় যে আমাদের যেসব মহাপুরুষ দেশ আর সমাজকে গড়ে দিয়েছিলেন, তারা কোনো রিল, কোনো ট্রেন্ড বা ক্ষণিক জনপ্রিয়তার অংশ ছিলেন না। তারা বেছে নিয়েছিলেন কঠিন পথ, সংগ্রাম করেছিলেন, আর জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন সমাজ আর জাতির জন্য। তাদের তুলনায় আজকের “ট্রেন্ডিং তারকারা” অনেক হালকা আর ক্ষণস্থায়ী। সমাজকে এটা বুঝতে হবে যে রোল মডেল কেবল তারা নন, যাদের লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার আছে। রোল মডেল তারা, যারা তাদের জীবন, চিন্তা আর সংগ্রামের মাধ্যমে অন্যকে সঠিক পথ দেখায়। যদি আমরা এটা বুঝতে পারি, তবে হয়তো আবার আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম ভগত সিং, আম্বেদকর আর ছোটুরামের মতো আদর্শকে পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করবে, কোনো “কুঁচকি নাচানো” ব্লগারকে নয়।