কান্তকবি রজনীকান্ত সেনঃ বাংলার কাব্য ও সঙ্গীত জগতে একটি অবিস্মরণীয় নাম

সকাল সকাল ডেস্ক

মনোতোষ মণ্ডল, বোকারো 

বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমসাময়িক যে পাঁচজন কবির নাম এক সঙ্গে স্মরণ করা হয়, বাংলার মানুষ তাঁদের পঞ্চকবি নামে সম্বোধন করেন। এঁরা মূলতঃ কেবল কাব্য রচয়িতা ছিলেন না, বরং এঁরা সবাই খ্যাতনামা সঙ্গীত স্রষ্টাও নৌছিলেন। অর্থাৎ এঁরা সবাই একযোগে কবি, গীতিকার ও সুরকারও ছিলেন।‌ বহু পরিচিত এই পাঁচজন কবির নাম হচ্ছে -- বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ডি এল রায় নামে খ্যাত দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, কান্তকবি রজনীকান্ত সেন, ইতিহাস প্রসিদ্ধ অতুল প্রসাদ সেন ও বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এঁদের মধ্যে প্রথম তিন জনের জন্ম হয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে আর অতুল প্রসাদ সেনের জন্ম হয়েছিল -- ১৮৭১ সালের ২০ শে অক্টোবর। কিন্তু এঁদের মধ্যে কনিষ্ঠতম কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম হয়েছিল -- ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ মুহূর্তে ১৮৯৯ সালে। এই পঞ্চ কবির কৃতিত্ব ও কাব্যিক সহ সাঙ্গিতিক অবদান প্রতিটি বাঙালী বুদ্ধিজীবীর জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এঁদেরকে বাদ দিয়ে বাংলার সাহিত্য জগতের কল্পনা করা মানে ভিত্তিহীন অট্টালিকা নির্মাণ করা। এঁদের প্রধান বৈশিষ্ট্য --  এঁদের দ্বারা রচিত সঙ্গীত সমূহকে তাঁদের নামের সঙ্গে যুক্ত করে নামকরণ করা হয়েছে। যেমন রবীন্দ্রনাথ রচিত গান সমূহকে একযোগে বলা হয় -- রবীন্দ্র সংগীত । ঠিক তেমনি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় রচিত গীত সমূহের সামগ্রিক নাম -- দ্বিজেন্দ্র গীতি। এইভাবে রজনীকান্ত কর্তৃক রচিত গীতসমূহকে একযোগে বলা হয় -- কান্তগীতি ও আর নজরুল রচিত সঙ্গীতকে বলা হয় -- নজরুল গীতি । কিন্তু অতুল প্রসাদ রচিত গান সমূহকে বলা হয় -- অতুল প্রসাদের গান কিন্তু আমার বিচারে অতুল প্রসাদ রচিত গান সমূহকে বলা উচিত -- অতুলগীতি। এই পঞ্চকবি রচিত গান সমূহ সমবৈশিষ্ট্যে রচিত। এঁদের রচনার মধ্যে ভক্তিমূলক গান ও দেশাত্মবোধক গানের আধিক্য ও প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। 
যাই বা হোক উপরিউক্ত পঞ্চকবির মধ্যে আজকের আলোচ্য বিষয় বাংলা সাহিত্যে কান্তকবির অবদান। কারণ আজ ২৬ শে জুলাই তাঁর শুভ জন্মদিন। কান্তকবি নামে সমধিক পরিচিত রজনীকান্তের জন্ম হয়েছিল -- ১৮৬৫ সালের ২৬শে জুলাই বর্তমান বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জ জেলার অন্তর্গত বেলকুচি উপজেলার ভাঙাবাড়ী গ্রামে। রজনীকান্ত ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা কবি, দেশপ্রেমিক ও ঈশ্বরপ্রেমী। তাঁর রচিত ভক্তিমূলক গান সমূহের মধ্যে ঈশ্বরপ্রেমের ভাবনা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই পরিলক্ষিত হয়। 
রজনীকান্ত সেনের পিতা গুরুপ্রসাদ সেন কর্মজীবনে একজন বিচারক ছিলেন ও সেইসঙ্গে তিনি একজন খ্যাতনামা সঙ্গীতজ্ঞও ছিলেন। তাঁর মাতার নাম ছিল -- মনমোহিনী দেবী যিনি একজন ধর্মশীলা গৃহকর্ত্রী ছিলেন। রজনীকান্তের শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল -- রাজশাহী জেলা ও কোচবিহার জেলার মধ্য থেকে। প্রথমতঃ কোচবিহারের জেনকিন্স স্কুল থেকে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন ও পরবর্তীতে রাজশাহী কলেজ থেকে এফ এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অবশেষে কলকাতার সিটি কলেজ থেকে বি এ ডিগ্রি সহ বি এল উপাধি লাভ করেন। ১৮৯১ সালে ওকালতি পাস করার পর তিনি ক্রমশঃ রাজশাহী, নাটোর সিরাজগঞ্জ আদালতে ওকালতি করেন। যদিও তিনি জীবিকার্থে ওকালতি করতেন কিন্তু অবসর সময়ে সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করতেন। এটাই ছিল তাঁর জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। কবিতা ও সঙ্গীত রচনার মাধ্যমে তিনি এক নবযুগের সূত্রপাত করার সফল প্রয়াস করেছেন। আর তাঁর এই বিশেষ কৃতিত্বের জন্য বাঙালী জনগোষ্ঠী অবশ্যই কৃতজ্ঞ। 
কবিতা রচনা ও সঙ্গীত সর্জন করা তাঁর রক্তের মধ্যেই নিহিত ছিল। কারণ তাঁর পিতাও সঙ্গীত স্রষ্টা ছিলেন। আর রজনীকান্ত অতি অল্প বয়স থেকেই গান রচনা শুরু করেছিলেন। তিনি একদিকে যেমন ভক্তি মূলক গান রচনা করে জনগণের মধ্যে ঈশ্বর প্রেমের ভাবনা জাগ্রত করার চেষ্টা করেছেন ঠিক তেমনি অন্যদিকে দেশাত্মবোধক গান রচনা করে জনগণের মধ্যে দেশপ্রেমের গভীর চেতনা উদ্রেক করতেও সক্ষম হয়েছেন। সুতরাং বাংলার কাব্য জগতে তিনি অবশ্যই একজন প্রশংসনীয় ব্যষ্টিত্ব। তাঁর রচিত নিম্নলিখিত ভক্তিমূলক গানটি জনসমাজে আজো সমভাবে সমাদৃত। গানটি হচ্ছে --

তুমি নির্মল কর, মঙ্গল করে, মলিন মর্ম মুছায়ে,
তব পূণ্যকিরণ দিয়ে যাক, মোর মোহ কালিমা ঘুচায়ে।

উপরিউক্ত গানটির বর্ণে বর্ণে ঈশ্বর প্রেমের ভাবনা পরিস্ফুট। কবি ঈশ্বরের কাছে তাঁর মনের গোপনে নিভৃত ভবনে লুকিয়ে থাকা গভীর আকুতি গানের মাধ্যমে ব্যক্ত করার অনবদ্য প্রয়াস করেছেন। তিনি তাঁর করযুগল বদ্ধ করে ঈশ্বরের কাছে যে আকুতি নিবেদন করেছেন তিনি নিজের মঙ্গলার্থে করেন নি। কারণ তিনি চেয়েছেন যে, সকল মানুষের মনের কালিমা যেন মঙ্গলময়ের কৃপায় ধূয়ে মুছে শেষ হয়ে যায়। তাঁর প্রার্থনা মন্ত্র এটাই প্রমাণ করে যে, কৃপাময়ের কৃপায় মানবমনের সমস্ত কালিমা নিমিষে শেষ হয়ে যায়। তিনি আরো বলেছেন যে, তাঁর পূণ্য কিরণের স্পর্শে মনের মলিনতা, কল্মষতা অচিরেই দূর হয়ে যায়। তাঁরই আলোয় আলোকিত মন মানুষকে আধ্যাত্মিকতার পথ অবলম্বনে উদ্বুদ্ধ করে। কারণ ঈশ্বরের প্রকাশিকা শক্তির তুলনায় সমস্ত উজ্জ্বল বস্তুই নিষ্প্রভ। তাঁর এই অতুলনীয় প্রকাশিকা শক্তির মহিমা বর্ণন করতে গিয়ে কঠোপনিষদ গ্রন্থে বলা হয়েছে:–
” ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকাঃ
নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোহয়মগ্নিঃ।
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং
তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি।।”

অর্থাৎ এই মহাবিশ্বের সমস্ত প্রকাশিকা শক্তি পরমপিতা পরমেশ্বরের মধ্যেই নিহিত। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-তারা, নক্ষত্রমণ্ডল সবই তাঁরই আলোকে আলোকিত।
যাই বা হোক রজনীকান্ত সেন বাংলার সাহিত্য জগতে একজন ক্ষণজন্মা প্রতিভা সম্পন্ন ব্যষ্টি ছিলেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়। অতএব তাঁর মূল্যবান কৃতিত্ব ও অবদানের কথা ইতিহাসের পাতায় চিরতরে স্মরণীয় ও বরণীয় হয়েই থাকবে।‌দেশপ্রেমের গভীর ভাবনায় আপ্লুত রজনীকান্ত সেন পরাধীনতাকে মানব জীবনের চরম অভিশাপ বলেই মনে করতেন। তাই তিনি স্বাধীনতার সুখ কবিতায় একটি বাবুই পাখি ও চড়ুই পাখির কথোপকথনের মাধ্যমে অতি সহজ ভাবে স্বাধীনতার মহত্ত্ব প্রকাশ করেছেন। তিনি একটি স্তবকে লিখেছেন:–
” বাবুই হাসিয়া কয়, সন্দেহ কী তায়?
কষ্ট পাই, তবু থাকি, নিজের বাসায়।
পাকা হোক, তবু ভাই, পরের ও বাসা,
নিজ হাতে গড়া মোর, কাঁচা ঘর খাসা।।”

অর্থাৎ অপরের নির্মিত রাজপ্রাসাদের তুলনায় স্বনির্মিত পর্ণকুটীর শতগুণ শ্রেয়। কারণ ঐ কুঁড়ে ঘরে স্বাধীনতা আছে, স্বতন্ত্রতা আছে, আর সেই সঙ্গে স্বাভিমানের মতো মস্ত বড় আত্মনির্ভরতার দৃষ্টান্ত আছে। কারণ পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ মানুষের মনে সব সময় হীনমন্যতার সৃষ্টি হয়, যা মানুষের মন থেকে মানবীয় মূল্যবোধ কেড়ে নেয়। সুতরাং মনে রাখা দরকার — স্বাধীনতা হীনতায় কেউ বাঁচতে চায় না। কারণ পরাধীনতার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরমুখী প্রাণীনতা জাগ্রত হয় না। আর ঈশ্বরমুখী প্রাণীনতা ছাড়া কেউ বলতে পারে না —
“আমরাই জয় করিব ভূবন,
রণমুখী নয়, হরিমুখী করি মন।”

বিশ্বজয় করতে হলে প্রথমে মানুষের মন জয় করতে হবে। কারণ তরবারির জয় দুদিনের যা তরবারিতে মরচে ধরার আগেই শেষ হয়ে যায়।
মানবজীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য স্বাধীনতা একান্তই প্রয়োজন। কিন্তু স্বাধীনতা শব্দের অপপ্রয়োগ মানুষের অগ্রগতিকে অবরুদ্ধ করে। কারণ স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা সমার্থক নয়। অতএব স্বাধীনতা মানে যদিচ্ছা পথ চলা নয় — স্বাধীনতা মানে অনুশাসন মেনে প্রগতির পথে, বিকাশের পথে, স্বাবলম্বিতার পথে তেজস্বিতার সঙ্গে এগিয়ে যাওয়া। অনুশাসনহীনতা মানুষকে প্রগতির পথে নয় অধোগতির পথেই নিয়ে যায়। সুতরাং সামঞ্জস্য পূর্ণ সমাজ নির্মাণ কল্পে অনুশাসনকে মোটেই অবহেলা করা চলে না। অনুশাসন সম্বন্ধে আলোচনা প্রসঙ্গে বিংশ শতাব্দীর মহান দার্শনিক ও সত্যদ্রষ্টা ঋষি শ্রী শ্রী আনন্দমূর্তিজী তাঁর রচিত ” নমঃ শিবায় শান্তায়” গ্রন্থে বলেছেন:–
“হিতার্থে শাসনমিতি অনুশাসনম্” — অর্থাৎ স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে নিয়মানুবর্তিতার যে শাসন, উচ্ছৃঙ্খলতার বিরুদ্ধে শৃঙ্খলার যে শাসন, দুশ্চরিত্রতার বিরুদ্ধে চারিত্রিক স্থৈর্যের যে শাসন, অধোগামিতার বিরুদ্ধে উৎগামিতার যে শাসন — এই ধরণের সর্বপ্রকার নিম্নগ ও বহু বিশ্লেষণাত্মক গতির বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বগ ও সংশ্লেষণাত্মিকা গতির যে শাসন তাই অনুশাসন।”
উপরিউক্ত বক্তব্যটিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে, সুসংবদ্ধ ও সুসামঞ্জস্য পূর্ণ সমাজ নির্মাণ কল্পে অনুশাসনকে মোটেই অবহেলা করা চলে না, চলবে না। কারণ অনুশাসন হচ্ছে — অগ্রগতির দ্যোতক, সামাজিক উন্নয়নের অগ্রদূত। যাই বা হোক ধান ভানতে গিয়ে অনেকটাই শিবের গীত গাওয়া হলো। অবশ্য এই শিবের গীত মোটেই অপ্রয়োজনীয় নয়, কারণ ন্যায় নীতির শাসন ব্যতিরেকে সমাজের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়। সুতরাং সময় পেলেই যৎকিঞ্চিৎ আধ্যাত্মিক আলোচনা একান্তই কাম্য। হ্যাঁ, আবার ফিরে আসি আজকের আলোচ্য বিষয়ে ।
রবীন্দ্র যুগের সমসাময়িক কবি হিসেবে রজনীকান্ত সেনের নাম অবশ্যই উল্লেখযোগ্য। কারণ তিনি ছিলেন একজন স্বনামধন্য দেশপ্রেমিক ও খ্যাতনামা সুকবি ও সুগায়ক। তবে অতিশয় দুঃখের সঙ্গে বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, ১৯১০ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর তিনি মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে ইহলোকের সমস্ত মায়া পরিত্যাগ করে মৃত্যু বরণ করেন — এটা অবশ্যই অভাবনীয় শোকবার্তা যা প্রতিটি মানুষের হৃদয়কে ব্যাকুল করে দেয়। কিন্তু প্রকৃতির বাঁধা ধরা নিয়ম হচ্ছে – যে আসে সে যায়।‌সুতরাং তিনি অবশ্যই প্রকৃতির নিয়ম মেনেই বাংলার সাহিত্য প্রেমী জনগণকে অনাথ করে এক অদৃশ্য জগৎপানে চলে গেছেন। যে পাঁচজন কবির নাম এই প্রবন্ধে উল্লিখিত হয়েছে, তাঁদের কেউই ভৌতিক শরীর নিয়ে বেঁচে নেই কিন্তু পাঠক বর্গের হৃদয়ে তাঁরা আজো চির স্মরণীয় হয়ে আছেন ও থাকবেন। তাই আলোচনা শেষ করার আগে তাঁদের সবাইকে জানাই শতকোটি প্রণাম ও আন্তরিক শ্রদ্ধা।অয়মস্তু।

Read More News

কুমিরমুড়ি গ্রামের ছেলে থেকে জাতীয় পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্র নির্মাতা, রবি রাজ মুর্মুর সাফল্যের গল্প

সকাল সকাল ডেস্ক রাঁচি, ২৪ জুলাই: ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলার জাদুগোড়ার কুমিরমুড়ি গ্রামের...

Read More