ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা, হরমুজ না খুললে ধ্বংসের হুঁশিয়ারি আমেরিকার

সকাল সকাল ডেস্ক:

তেহরান/ওয়াশিংটন: গত ৩৮ দিন ধরে চলা আমেরিকা-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের মাঝে ইরান স্বীকার করেছে যে তাদের পারমাণবিক জ্বালানি চক্রণ কেন্দ্রে হামলা হয়েছে। একইসঙ্গে আমেরিকার সেই সতর্কবার্তা ঘিরে ইরানে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে—মঙ্গলবার নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে যদি হরমুজ প্রণালী না খোলা হয়, তাহলে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হবে।

ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা মধ্য ইরানের ইয়েলোকেক উৎপাদন কেন্দ্রে হামলার নিন্দা জানিয়ে একে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তার লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে। শাহিদ রাজাই নেজাদ সুবিধা নামেও পরিচিত এই কেন্দ্রটি ইয়াজদ প্রদেশের আরদাকান শহরে অবস্থিত। এটি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে ইউরেনিয়াম আকরিককে ইয়েলোকেকে রূপান্তর করা হয়। বছরে প্রায় ৬০ টন ইউরেনিয়াম অক্সাইড উৎপাদনের ক্ষমতা রয়েছে এই কেন্দ্রের। ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে ‘জাতীয় পারমাণবিক প্রযুক্তি দিবস’-এ এর উদ্বোধন করা হয়। এটি ইরানি পারমাণবিক বিজ্ঞানী শহীদ দারিউশ রাজাই নেজাদের সম্মানে নামকরণ করা হয়েছে।

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা এক্স-এ জানিয়েছে, এই হামলা শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনার নিরাপত্তার স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি ইরানের রিঅ্যাক্টর ফুয়েল সাপ্লাই চেইনের উপর সরাসরি আঘাত। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তি শান্তি ও মানবকল্যাণের জন্য। ভারী বোমাবর্ষণেও এই কর্মসূচি থামবে না।” তবে হামলার সময় ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।

উল্লেখযোগ্যভাবে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান দিন যত যাচ্ছে ততই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইরানও প্রতিপক্ষ দেশ ও তাদের মিত্রদের ওপর পাল্টা হামলা শুরু করেছে। মঙ্গলবার ভোরে ইসরায়েল তেহরানসহ একাধিক শহরে তীব্র আক্রমণ চালায়। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হরমুজ প্রণালী খোলার সময়সীমা যত ঘনিয়ে আসছে, ততই মধ্যপ্রাচ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। ইরান জানিয়েছে, ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিকে তারা গুরুত্ব দেয় না; তাদের অবকাঠামো লক্ষ্য করা হলে সমান জবাব দেওয়া হবে।

টাইমস অফ ইসরায়েল, সিবিএস নিউজ ও আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস (আইডিএফ) তেহরানসহ ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের ঘাঁটি, ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র এবং পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্ট। ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট ও ড্রোন ব্যবহার করে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তেহরানের পাশাপাশি পশ্চিমাঞ্চলীয় উপশহর কারাজেও জোরালো বিস্ফোরণ হয়েছে। মেহরাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আশপাশেও বিস্ফোরণের খবর মিলেছে। সোমবার সারাদিন ধরে চলা হামলায় অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। একইসঙ্গে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন খাড়ি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকেও লক্ষ্য করে আঘাত হানছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় সতর্ক করে বলেছেন, মঙ্গলবারের সময়সীমার মধ্যে যদি হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি না খোলা হয়, তাহলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হবে। হোয়াইট হাউসও সতর্ক করে বলেছে, ইরান যদি আলোচনায় গুরুত্ব না দেয়, তাহলে “তাকে প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।”

এই প্রেক্ষাপটে ইরানের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক উপমন্ত্রী আলিরেজা রহিমি দেশবাসীকে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চারপাশে মানবশৃঙ্খল গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “মঙ্গলবার দুপুর ২টায় আমরা সবাই একসঙ্গে দাঁড়িয়ে এই বার্তা দেব—সার্বজনীন অবকাঠামোর উপর হামলা একটি যুদ্ধাপরাধ।”

এদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, “এক রাতেই ইরানকে ধ্বংস করা সম্ভব,” এবং পরিস্থিতিকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে তেহরান সতর্ক করেছে, এ ধরনের হামলার পরিণতি শুধু এই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আরও বিস্তৃত হবে।

এর আগে, ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির একটি প্রস্তাবকে গুরুত্বপূর্ণ বললেও ট্রাম্প তা অপর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করেন। ইরান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের দাবি জানায়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনেই জানিয়েছেন, কমান্ডারদের মৃত্যু হলেও ইরানের সেনাবাহিনী পিছু হটবে না।

Read More News

Read More