সকাল সকাল ডেস্ক
স্টকহোম: অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যবৃদ্ধি এবং আর্থিক অস্থিরতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন দুই মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট ই. হল এবং মাইকেল উডফোর্ড। সোমবার সুইডেনের স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস তাঁদের নাম ঘোষণা করেছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। রবার্ট ই. হল স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এবং মাইকেল উডফোর্ড কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত।
সমষ্টিগত অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক সঙ্কট মোকাবিলায় কার্যকর নীতি নির্ধারণের তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁদের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। পুরস্কার বাবদ দুই অর্থনীতিবিদ যৌথভাবে এক কোটি ২০ লক্ষ সুইডিশ ক্রোনা পাবেন। মার্কিন মুদ্রায় যার মূল্য প্রায় ১২ লক্ষ ডলার।
রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের অর্থনীতি পুরস্কার কমিটির চেয়ারম্যান জন হ্যাসলার দুই গবেষকের অবদানের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারের আকস্মিক পরিবর্তনের মতো পরিস্থিতিতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি কীভাবে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি গড়ে তুলতে এই গবেষণা বিশেষভাবে সহায়ক হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে রাজস্বনীতি এবং মুদ্রানীতির মধ্যে যথাযথ সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি ব্যয়, করকাঠামো, সুদের হার এবং বাজারে অর্থের জোগান নিয়ন্ত্রণের মতো সিদ্ধান্ত সামগ্রিক অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, তা বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে হল ও উডফোর্ডের গবেষণা নতুন দিশা দেখিয়েছে। বিশেষত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা কীভাবে বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং ভোগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে, সেই বিষয়টি তাঁদের গবেষণায় গুরুত্ব পেয়েছে।
১৯৭০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে তেল সঙ্কটের ফলে অর্থনৈতিক অস্থিরতা তীব্র আকার ধারণ করেছিল। অশোধিত তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্বের হার বৃদ্ধি এবং একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি তৎকালীন অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। এই ধরনের জটিল পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে পরবর্তী সময়ে সমষ্টিগত অর্থনীতির গবেষণায় নতুন পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
হল ও উডফোর্ডের গবেষণায় সামগ্রিক উৎপাদন ও আয়ের পাশাপাশি পরিবার, শ্রমিক, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তনের ফলে সাধারণ মানুষের আচরণ ও বাজারের প্রত্যাশা কীভাবে বদলে যায়, তা গাণিতিক মডেলের সাহায্যে বিশ্লেষণ করার পদ্ধতি সমষ্টিগত অর্থনীতির গবেষণাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের সুদের হার পরিবর্তন, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা করনীতির সংশোধনের মতো সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে এই ধরনের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে অর্থনৈতিক নীতি নির্ধারণে এই তাত্ত্বিক কাঠামো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতিতে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক প্রদত্ত অর্থনৈতিক বিজ্ঞান পুরস্কার নামে পরিচিত। অর্থনৈতিক তত্ত্ব ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিবছর এই সম্মান দেওয়া হয়। চলতি বছরের পুরস্কারের ঘোষণায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সঙ্কট মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি গ্রহণের গুরুত্ব নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে।
No Comment! Be the first one.