হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প-শি মুখোমুখি, কোন কোন ইস্যুতে নজর ভারতেরও

সকাল সকাল ডেস্ক

ওয়াশিংটন: ফের মুখোমুখি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন চিনের প্রেসিডেন্ট। তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে আমেরিকায় পৌঁছেছেন শি। বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির রাষ্ট্রনেতার এই বৈঠক ঘিরে নজর আন্তর্জাতিক মহলের। বাণিজ্য থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তাইওয়ান থেকে ইরান—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠতে পারে আলোচনার টেবিলে।

দুই দেশের সম্পর্কে আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাণিজ্য। গত কয়েক মাসে শুল্ক নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেজিংয়ের সংঘাত কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও মূল বিরোধ মেটেনি। বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ বাড়ানোর মাধ্যমে নতুন করে সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং বাজারে প্রবেশাধিকার নিয়ে দুই দেশের প্রতিযোগিতা এখনও তীব্র।

এক সময় চিনা পণ্যের উপর বিপুল শুল্ক চাপিয়েছিল ওয়াশিংটন। পাল্টা পদক্ষেপে বেজিংও মার্কিন পণ্যের উপর শুল্ক বৃদ্ধি এবং বিরল খনিজের রফতানি নিয়ন্ত্রণের পথে হেঁটেছিল। পরে আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কিছুটা কমে। তবে দুই দেশই যে একে অপরকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে তা স্পষ্ট।

এআই নিয়ে নতুন লড়াই

এ বারের বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এআই প্রযুক্তিতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে আমেরিকা ও চিনের প্রতিযোগিতা ক্রমশ বাড়ছে। উন্নত চিপ এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে চিনের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে ওয়াশিংটন। অন্যদিকে বেজিংয়ের অভিযোগ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আটকে দেওয়ার লক্ষ্যেই আমেরিকা এই বিধিনিষেধ চাপাচ্ছে।

এআইয়ের নিরাপত্তা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। কোনও বড় ধরনের এআই-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত তথ্য আদানপ্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে গভীর প্রতিযোগিতার মধ্যে কতটা বাস্তব সমঝোতা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

তাইওয়ান নিয়ে বাড়তি উত্তাপ

ট্রাম্প-শি বৈঠকের অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয় হতে চলেছে তাইওয়ান। স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে বেজিং। অন্যদিকে তাইওয়ানের সঙ্গে আমেরিকার অনানুষ্ঠানিক সম্পর্ক এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দীর্ঘদিন ধরেই চিনের আপত্তির কারণ।

বৈঠকের আগেও তাইওয়ানে মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে ওয়াশিংটনকে সতর্ক করেছে চিন। ফলে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ান প্রশ্নে ভবিষ্যতে কী অবস্থান নেয়, তা বোঝার চেষ্টা করবেন শি। একই সঙ্গে আমেরিকার রাজনৈতিক ও কৌশলগত মহলের একটি অংশও তাইওয়ান প্রশ্নে বেজিংকে কোনও বড় ছাড় দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক।

ইরান নিয়েও মতপার্থক্য

আলোচনায় পশ্চিম এশিয়া এবং ইরানের প্রসঙ্গও উঠে আসতে পারে। তেহরানের সঙ্গে বেজিংয়ের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে ওয়াশিংটনের। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের আবহে আমেরিকা চাইছে, ইরানের উপর নিজের প্রভাব ব্যবহার করে উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা নিক চিন।

চিন অবশ্য ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ফলে ইরান প্রশ্নে দুই দেশের কৌশলগত স্বার্থের পার্থক্য বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কেন নজর রাখছে ভারত

ট্রাম্প-শি বৈঠকের দিকে সতর্ক নজর থাকবে নয়াদিল্লিরও। কারণ আমেরিকা ও চিনের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি ইন্দো-প্যাসিফিক এবং বৃহত্তর এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

একদিকে আমেরিকার সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতা রয়েছে। অন্যদিকে চিনের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। ফলে ওয়াশিংটন-বেজিং সম্পর্কের বড় পরিবর্তন হলে তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব ভারতের উপরও পড়তে পারে।

বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সেমিকন্ডাক্টর, এআই এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে মার্কিন-চিন সমঝোতা অথবা নতুন সংঘাত—দুই পরিস্থিতিই ভারতের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন ভারতীয় রফতানি এবং উৎপাদন ক্ষেত্রের সামনে নতুন সুযোগ বা চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

সব মিলিয়ে, বৃহস্পতিবারের ট্রাম্প-শি বৈঠকের গুরুত্ব কোনও একটি চুক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্যিক সংঘাত কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকে, প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা কোন পথে এগোয় এবং তাইওয়ান ও ইরানের মতো স্পর্শকাতর প্রশ্নে দুই পক্ষ কী অবস্থান নেয়—তার উপর আগামী দিনে বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তির সম্পর্কের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে। আর সেই সমীকরণের উপর নজর থাকবে ভারতেরও।

Read More News

Read More