তিন বছর পর শ্রেণিকক্ষে গাজার শিশুরা, ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই নতুন শুরুর স্বপ্ন

সকাল সকাল ডেস্ক

গাজা: দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পর আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরতে শুরু করেছে গাজার লাখ লাখ শিশু। তবে পরিচিত স্কুলবাড়ি নয়, কারও ক্লাস বসছে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে, কারও আবার তাঁবু কিংবা অস্থায়ী কাঠামোর নীচে। যুদ্ধের ক্ষত সঙ্গে নিয়েই শুরু হয়েছে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ। অধিকাংশ পরিবারের আর্থিক অবস্থা এতটাই সঙ্কটজনক যে সন্তানদের জন্য স্কুলের পোশাক, খাতা-কলম কিংবা প্রয়োজনীয় শিক্ষা সামগ্রী কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাষ্ট্রসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতে গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ বিদ্যালয় ধ্বংস অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাজার শিক্ষা আধিকারিকদের দাবি, প্রায় ৬ লক্ষ ৬০ হাজার শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে সশরীরে ক্লাস এবং নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

খান ইউনিসের শিক্ষা পরিচালক ইব্রাহিম রমাদানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতে প্রায় ২২ হাজার শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। প্রাণ হারিয়েছেন ৫৩২ জন শিক্ষক-সহ ৭৭০ জনেরও বেশি শিক্ষা কর্মী। এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও স্কুলে পঠনপাঠন ফের শুরু হওয়াকে নতুন আশার প্রতীক হিসেবে দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

খান ইউনিসের শিক্ষার্থী মুয়ায়াদ আবু মুস্তফার কথায়, প্রায় তিন বছর পর সে আবার স্কুলে ফিরেছে। নতুন শিক্ষাবর্ষ তার কাছে আনন্দের পাশাপাশি নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ। যদিও তার বর্তমান ‘শ্রেণিকক্ষ’ একটি তাঁবু। সেখানে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা নেই। মেঝেতে বসেই পড়াশোনা করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অনেকের ভালো জুতো নেই, খাতা-কলমেরও অভাব রয়েছে।

যুদ্ধে বন্ধুদের হারানোর বেদনা নিয়েই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চায় মুস্তফা। তার কথায়, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, তাঁবুর ভিতরে বসেও তারা শিক্ষা চালিয়ে যাবে।

একই ছবি ১৫ বছরের বাস্তুচ্যুত শিক্ষার্থী সমর আবু সালমির জীবনেও। পরিবারের সঙ্গে তাঁবুতে বসবাস করলেও সে আবার ক্লাসে ফিরেছে। দীর্ঘদিন মোবাইলের পর্দায় পড়াশোনা করতে হয়েছে তাকে। শিক্ষকদের সঙ্গে সরাসরি দেখা করার সুযোগও ছিল না। এখন অস্থায়ী স্কুলে ফিরতে পেরে নিজের স্বপ্নের দিকে আবার এগিয়ে যাওয়ার আশা দেখছে সমর।

তবে শিক্ষা সামগ্রীর অভাব তারও নিত্যসঙ্গী। পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে প্রয়োজনীয় খাতা, কলম, পোশাক বা অন্যান্য সামগ্রী কেনা সম্ভব হচ্ছে না। সমরের স্মৃতিতে যুদ্ধের আগের জীবন সম্পূর্ণ অন্যরকম। তখন প্রয়োজনীয় শিক্ষা সামগ্রী থেকে পোশাক—সবকিছুই সহজে পাওয়া যেত। এখন সেই স্বাভাবিক জীবন তার কাছে অনেক দূরের স্মৃতি।

গাজা উপত্যকাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসের মধ্যেও আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থাগুলির সহায়তায় ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রক ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের পঠনপাঠন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁবু, ত্রিপল, টিন ও কাঠ দিয়ে বহু অস্থায়ী বিদ্যালয় তৈরি করা হয়েছে।

কোনও কোনও স্কুল তৈরি হয়েছে বালিতে ঢাকা খোলা জায়গায়। কিছু অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে কয়েকটি তোশক এবং একটি ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া কার্যত আর কিছুই নেই। আবার বহু স্কুল ভবন এখনও বাস্তুচ্যুত পরিবারের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

১৪ বছরের শিক্ষার্থী ইয়ামেন আবু সামরার কথাতেও উঠে এসেছে বদলে যাওয়া বাস্তবতার ছবি। যুদ্ধের আগে স্কুলে যাওয়ার সঙ্গে যে আনন্দ জড়িয়ে ছিল, এখন তার জায়গা নিয়েছে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক। স্কুলে যাওয়ার পথেও গুলি, রকেট এবং বিমান হামলার ভয় তাদের তাড়া করে বলে জানিয়েছে সে।

শিক্ষা আধিকারিকদের আশা, ইউনিসেফের সহায়তায় চলতি শিক্ষাবর্ষে অন্তত ৫ লক্ষ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী অস্থায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সশরীরে ক্লাস করার সুযোগ পাবে। যারা এখনও স্কুলে ফিরতে পারছে না অথবা সংঘাতের সময় গাজা ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছে, তাদের জন্য অনলাইন শিক্ষার ব্যবস্থাও চালু রাখা হবে।

ধ্বংসস্তূপ, তাঁবু, শিক্ষা সামগ্রীর অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্যেও গাজার শিশুদের স্কুলে ফেরা তাই শুধু নতুন শিক্ষাবর্ষের সূচনা নয়—স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আকাঙ্ক্ষারও প্রতিফলন।

Read More News

Read More