সকাল সকাল ডেস্ক
সরকারি স্কুলের Mid-Day Meal প্রকল্পে ISKCON-কে দায়িত্ব দেওয়া, ডিম-মাছের বদলে নিরামিষ মেনুর সম্ভাবনা এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে শুরু আইনি লড়াই।
রাজ্যের সরকারি স্কুলগুলির Mid-Day Meal প্রকল্পে বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। Mid-Day Meal-এ ডিম ও মাছের পরিবর্তে নিরামিষ খাদ্যতালিকা চালুর সম্ভাবনা এবং রান্না ও সরবরাহের দায়িত্ব ISKCON-এর হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে দায়ের হয়েছে একটি জনস্বার্থ মামলা (PIL)। এই মামলায় শিশুদের পুষ্টি, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং সরকারি নীতির স্বচ্ছতা—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চে মামলাটির জরুরি শুনানির আবেদন করা হলেও, রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল সুরজিৎ নাথ মিত্র প্রস্তুতির জন্য সময় চান। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে আগামী মঙ্গলবার মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে।

কী অভিযোগ তুলেছেন মামলাকারী?
জনস্বার্থ মামলায় মূলত দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, Mid-Day Meal-এ ডিম বা অন্যান্য প্রাণিজ প্রোটিন বাদ দেওয়া হলে শিশুদের পুষ্টির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে দাবি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্কুলগুলিতে ডিম মিড-ডে মিলের অন্যতম প্রধান পুষ্টিকর উপাদান হিসেবে দেওয়া হয়ে আসছে। মামলাকারীর বক্তব্য, ডিমের পরিবর্তে শুধুমাত্র রাজমা, ডাল বা নিরামিষ খাদ্য দেওয়া হলে প্রয়োজনীয় প্রাণিজ প্রোটিন থেকে অনেক পড়ুয়া বঞ্চিত হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, রাজ্যের হাজার হাজার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) মহিলা বর্তমানে স্কুলের মিড-ডে মিল রান্নার সঙ্গে যুক্ত। যদি এই দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে অন্য কোনও সংস্থার হাতে চলে যায়, তাহলে তাঁদের কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কোনও অস্বচ্ছতা বা অনিয়ম রয়েছে কি না, সেটিও আদালতের নজরে আনার আবেদন করা হয়েছে।
West Bengal Budget 2026-এ হয়েছিল ঘোষণা
এই বিতর্কের সূত্রপাত West Bengal Budget 2026-এ। বাজেট পেশের সময় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ঘোষণা করেছিলেন, কলকাতা পুরনিগম এলাকার স্কুলগুলিতে Mid-Day Meal ব্যবস্থাকে আরও উন্নত, স্বাস্থ্যসম্মত এবং মানসম্মত করতে ISKCON-এর সহযোগিতা নেওয়া হবে।
একইসঙ্গে প্রাথমিক স্তরের পড়ুয়াদের জন্য মিড-ডে মিলের বরাদ্দও বাড়ানো হয়। আগে যেখানে মাথাপিছু বরাদ্দ ছিল ৬ টাকা ৭৮ পয়সা, তা বৃদ্ধি করে ১০ টাকা করা হয়েছে। যদিও উচ্চ প্রাথমিক স্তরের বরাদ্দ আগের মতোই ১০ টাকা ৭১ পয়সা রাখা হয়েছে।
আরও অন্য খবরের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজ
ISKCON-এর ভূমিকা নিয়ে কেন প্রশ্ন?
সরকারি ঘোষণায় ISKCON-এর সহযোগিতার কথা বলা হলেও, সংস্থাটি ঠিক কীভাবে খাবার প্রস্তুত ও সরবরাহ করবে, স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা কী থাকবে কিংবা বর্তমান ব্যবস্থা কতটা পরিবর্তিত হবে—সে বিষয়ে এখনও বিস্তারিত নির্দেশিকা প্রকাশ করা হয়নি।
এই অস্পষ্টতাকেই কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। শিক্ষাবিদ, অভিভাবক এবং রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সরকারকে সম্পূর্ণ রূপরেখা প্রকাশ করা উচিত, যাতে কোনও বিভ্রান্তি না থাকে।
গুজরাত মডেল নিয়ে জল্পনা
বিতর্কের অন্যতম কারণ গুজরাতের অভিজ্ঞতা। সেখানে বহু এলাকায় ISKCON দীর্ঘদিন ধরে মিড-ডে মিল সরবরাহ করে থাকে এবং সম্পূর্ণ নিরামিষ খাদ্যতালিকা অনুসরণ করা হয়। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গেও একই ধরনের মডেল চালু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন মামলাকারীরা।
তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি যে ডিম সম্পূর্ণভাবে তুলে দেওয়া হবে বা রাজ্যের সব স্কুলে নিরামিষ মেনু বাধ্যতামূলক করা হবে। ফলে এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা সরকারি নির্দেশ এখনও প্রকাশিত হয়নি।

সরকারি অবস্থান ও আদালতের ভূমিকা
এখনও পর্যন্ত রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আদালতে বিস্তারিত জবাব দাখিল করা হয়নি। অ্যাডভোকেট জেনারেল সময় চাওয়ার পর আদালত আগামী মঙ্গলবার শুনানির দিন নির্ধারণ করেছে। সেই শুনানিতে সরকার প্রকল্পের উদ্দেশ্য, Mid-Day Meal-এর নতুন কাঠামো, ISKCON-এর দায়িত্ব এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির ভবিষ্যৎ ভূমিকা সম্পর্কে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
জনসাধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
বর্তমানে Mid-Day Meal প্রকল্পে ডিম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়েছে—এমন কোনও সরকারি নির্দেশ জারি হয়নি। একইভাবে, স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির দায়িত্বও আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়নি। বিষয়টি এখন বিচারাধীন এবং কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের পাশাপাশি সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থানের দিকেই নজর রয়েছে। আদালতের পরবর্তী শুনানির পর প্রকল্পের ভবিষ্যৎ রূপরেখা আরও স্পষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মামলাকারীর অভিযোগ, এক দিকে আমিষ খাবারের পুষ্টিগুণ থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে পড়ুয়াদের।
No Comment! Be the first one.