সকাল সকাল ডেস্ক
যুবদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান তৈরিতে ৫১টি ITI আধুনিকীকরণের পরিকল্পনা, শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগে বদলাবে কারিগরি শিক্ষার চেহারা
পশ্চিমবঙ্গে কারিগরি শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল রাজ্য সরকার। PM Setu Yojana এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টকে কেন্দ্র করে রাজ্যের ৫১টি ITI বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটকে বেসরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালনার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। কলকাতার বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্সে আয়োজিত পঞ্চম বিশ্ব এমএসএমই দিবস (MSME Day 2026) উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন।
মন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল যুবসমাজকে কর্মসংস্থানের জন্য প্রস্তুত করা এবং শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। সেই কারণেই PM Setu Yojana এবং স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পগুলির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

৫১টি ITI-তে আসছে বেসরকারি বিনিয়োগ
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জানান, রাজ্যের ৫১টি আইটিআইকে বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে পরিচালনা করা হবে। এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আসবে এবং দ্রুত পরিকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব হবে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন রাজ্যে শিল্প সংস্থাগুলির সঙ্গে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষার মান উন্নত করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও সেই মডেল অনুসরণ করা হবে। টাটা-সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেট সংস্থাগুলির সঙ্গে যৌথভাবে আইটিআই পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে তিনি জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আধুনিক যন্ত্রপাতি, উন্নত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা এবং শিল্পক্ষেত্রের চাহিদা অনুযায়ী নতুন কোর্স চালু করা সহজ হবে। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রশিক্ষণ শেষে দ্রুত চাকরির সুযোগ পেতে পারেন।
PM Setu Yojana-র মাধ্যমে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্য
উচ্চশিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, শুধু শিক্ষার প্রসার নয়, শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের যোগসূত্র তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য। সেই উদ্দেশ্যেই PM Setu Yojana-কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ এবং শিল্পক্ষেত্রের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের ধারণা, ভবিষ্যতের শিল্প ও ব্যবসার প্রয়োজন মেটাতে দক্ষ কর্মী তৈরি করা গেলে রাজ্যের অর্থনীতিও শক্তিশালী হবে।
মন্ত্রী বলেন, অতীতে বহু গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় প্রকল্পের যথাযথ ব্যবহার হয়নি। তবে বর্তমান সরকার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করতে চায় না এবং কর্মমুখী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে এগোতে চায়।
আরও অন্য খবরের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজ
শিল্পপতিদের বিনিয়োগের আহ্বান
অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিল্পপতি ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, শুধুমাত্র সরকারি ভর্তুকি দিয়ে শিল্পায়ন সম্ভব নয়। একটি সুস্থ ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার ও শিল্পক্ষেত্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি জানান, শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক বাধা দূর করতে সরকার বদ্ধপরিকর। বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স এবং অন্যান্য বণিক সংগঠনগুলির সহযোগিতায় বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, সরকার তার দায়িত্ব পালন করবে, তবে রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বেসরকারি বিনিয়োগকারীদেরও এগিয়ে আসতে হবে। যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে একটি শক্তিশালী শিল্প ও বাণিজ্যিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
অতীত সরকারের সমালোচনা
নিজের বক্তব্যে জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় বিগত কয়েক দশকের রাজ্য সরকারের নীতিরও সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এর ফলে শিক্ষাব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক স্লোগানের আড়ালে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি উপেক্ষিত হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি বদলাতে চায় এবং শিক্ষাকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।
ছোট ব্যবসা ও স্বনির্ভরতার বার্তা
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে ছোট ব্যবসা ও স্বনির্ভর উদ্যোগের গুরুত্বও তুলে ধরেন। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি বড় ব্র্যান্ডের পাশে যদি কোনও ছোট উদ্যোক্তা আধুনিক পরিষেবা ও উন্নত পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারেন, তবে সাধারণ মানুষ অবশ্যই সেই পরিষেবাকে গ্রহণ করবেন।
তাঁর মতে, রাজ্যের বহু ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীকে অতীতে যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়নি। এখন PM Setu Yojana এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো হবে।
সাধারণ মানুষের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত?
৫১টি আইটিআইয়ের আধুনিকীকরণ এবং বেসরকারি অংশীদারিত্বের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন। শিল্পক্ষেত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি হওয়ায় চাকরির সম্ভাবনাও বাড়তে পারে।
একইসঙ্গে শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে রাজ্যের অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে শিক্ষা, দক্ষতা এবং শিল্প—এই তিন ক্ষেত্রকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশলেই জোর দিচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
No Comment! Be the first one.