সকাল সকাল ডেস্ক
বেজিং: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সামরিক সহযোগিতার পরিধি আরও বাড়াল চিন। লাওসে একটি যৌথ বিমান প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কেন্দ্র চালু করেছে বেজিং। প্রকাশ্যে চিন ও লাওস এটিকে দুই দেশের বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষণ এবং সহযোগিতার কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরলেও, বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, ভবিষ্যতে সেখানে চিনা সামরিক কর্মী ও বিমান মোতায়েনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েনের উত্তরে বান কুন বিমানক্ষেত্রে কেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে। উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে সেখানে নির্মাণকাজ শুরু হয়। তৈরি হয়েছে নতুন রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে এবং একাধিক ভবন। যে এলাকার বড় অংশ আগে কৃষিজমি ছিল, সেখানে এখন বিমান প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে।
চিনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দাবি, এই কেন্দ্র কোনও তৃতীয় দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না। দুই দেশ যৌথ ভাবে এটি পরিচালনা করবে। মূল উদ্দেশ্য লাওসের বিমান বাহিনীর পাইলট ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। যদিও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত প্রশিক্ষণের জন্য সেখানে চিনা বিমান, প্রশিক্ষক এবং সামরিক কর্মীদের উপস্থিতি প্রয়োজন হতে পারে। ফলে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি ভবিষ্যতে বেজিংয়ের স্থায়ী সামরিক উপস্থিতির ক্ষেত্র তৈরি করবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ জোশুয়া কার্লান্টজিকের মতে, বিদেশে চিনের বিমান বাহিনীর এই ধরনের পরিকাঠামো তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর ধারণা, লাওসের পর ভবিষ্যতে বেজিংয়ের ঘনিষ্ঠ আরও কয়েকটি দেশে একই ধরনের কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে। নিরাপত্তা গবেষক কলিন কো-র মতে, বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে লাওসের কেন্দ্রটি চিনের নতুন কৌশলের ইঙ্গিত হতে পারে।
বিদেশে চিনের সামরিক পরিকাঠামো অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০১৭ সালে আফ্রিকার জিবুতিতে প্রথম বিদেশি সামরিক সহায়তা ঘাঁটি তৈরি করে বেজিং। পরবর্তী সময়ে সেখানে পরিকাঠামো সম্প্রসারণ করা হয়েছে। কম্বোডিয়ার রিয়াম নৌঘাঁটির আধুনিকীকরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে চিনের। ওই নৌঘাঁটিকে কেন্দ্র করে আমেরিকা-সহ কয়েকটি দেশ আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তবে লাওসের কেন্দ্রটি জিবুতি বা রিয়ামের মতো বড় সামরিক পরিকাঠামো নয় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। বর্তমান ব্যবস্থাটি মূলত প্রশিক্ষণ এবং অপেক্ষাকৃত হালকা বিমান পরিচালনার উপযোগী। এশিয়া বিষয়ক সামরিক বিশেষজ্ঞ কার্ল থেয়ারের মতে, এখনই এই কেন্দ্রকে বড় ধরনের সামরিক সঙ্কট হিসেবে দেখার কারণ নেই। তবে বিদেশে চিনের সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণের ধারায় এটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
চিনের সঙ্গে লাওসের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কও এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। লাওসের অন্যতম প্রধান ঋণদাতা বেজিং। পরিকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি সামরিক ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ছে। নতুন কেন্দ্রের মাধ্যমে লাওস প্রশিক্ষণ ও সামরিক সহায়তা পাবে, অন্য দিকে দেশটির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে চিন।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চিনের সামরিক প্রভাব বৃদ্ধির বিষয়টি ভারতের কাছেও কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে আমেরিকা, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডও লাওসে চিনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখছে। বিশেষ করে বান কুনে ভবিষ্যতে কী ধরনের বিমান মোতায়েন করা হয়, কত জন চিনা সামরিক কর্মী সেখানে থাকেন এবং কেন্দ্রটির ব্যবহার প্রশিক্ষণের বাইরে সম্প্রসারিত হয় কি না, তার উপরই নির্ভর করবে এর ভবিষ্যৎ কৌশলগত গুরুত্ব।
আপাতত বেজিং ও ভিয়েনতিয়েন এটিকে যৌথ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবেই তুলে ধরছে। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চিনের ক্রমবর্ধমান সামরিক যোগাযোগের মধ্যে বান কুনের এই নতুন পরিকাঠামো নজর কেড়েছে। এখন দেখার, কেন্দ্রটি শুধুই প্রশিক্ষণের কাজে সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি ভবিষ্যতে চিনের আরও বিস্তৃত সামরিক উপস্থিতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
No Comment! Be the first one.