সকাল সকাল ডেস্ক
দুবাই ও নয়াদিল্লি : প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় মাঝ-আকাশে ককপিটের ভিতরেই সহকর্মীর ধারালো অস্ত্রের হামলার শিকার হলেন ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার। গুরুতর আহত অবস্থাতেও অসীম সাহসিকতা, সংযম ও উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে তিনি বিমানের ১৮০ জন যাত্রীর জীবন রক্ষা করেছেন। তাঁর এই অসাধারণ সাহসিকতার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-সহ একাধিক বিশ্বনেতা প্রশংসা করেছেন।
মাঝ-আকাশে কী ঘটেছিল?
ঘটনাটি ঘটে বুধবার সকালে ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড১০৭৩ বিমানে। বিমানটি প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ছিল। সেই সময় ককপিটের ভিতরে ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছারের ওপর তাঁরই সহকারী পাইলট ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রাণঘাতী হামলা চালান। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বিমানটি ছিনতাই করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছিল।
আচমকা হামলার ফলে বিমানটির নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয় এবং সেটি একপর্যায়ে প্রায় ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় নেমে আসে। বিমানের ভিতরে তখন আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। যাত্রীরা বুঝতে পারছিলেন না, বিমানটি শেষ পর্যন্ত নিরাপদে অবতরণ করতে পারবে কি না।
গুরুতর আহত হয়েও দায়িত্বে অটল স্মিত
হামলায় গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত হওয়ার পরও ক্যাপ্টেন স্মিত নিজের সংযম হারাননি। তিনি হামলা প্রতিহত করার পাশাপাশি ককপিটের দরজা খুলতে সক্ষম হন। এর ফলে বিমানে থাকা কয়েকজন কর্মরত নন এমন পাইলট এবং কেবিন ক্রু দ্রুত ককপিটে প্রবেশ করেন।
তাঁরা হামলাকারী সহকারী পাইলটকে নিরস্ত্র করে নিয়ন্ত্রণে আনেন। এরপর বিমানের জরুরি নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়। শেষ পর্যন্ত ১৮০ জন যাত্রীকে নিয়ে বিমানটি সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবুক বিমানবন্দরে নিরাপদে জরুরি অবতরণ করে। হামলাকারী সহকারী পাইলটকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
বিশ্বনেতাদের প্রশংসা
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ক্যাপ্টেন স্মিতের সাহসিকতার প্রশংসা করে তাঁকে নায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ভয়াবহ বিপদের মুখে গুরুতরভাবে আহত হয়েও স্মিত অসীম সাহস দেখিয়েছেন এবং অন্যদের জীবন রক্ষার দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। তাঁর সাহসিকতার কারণেই বহু মানুষ বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন মোদী।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-ও স্মিতের সাহসিকতার প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, গুরুতর অবস্থার মধ্যেও পাইলট নিজের বিচারবুদ্ধি ও সংযম হারাননি। তাঁর মতে, স্মিত একজন সত্যিকারের নায়ক।
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু-ও ক্যাপ্টেন স্মিতের সাহসিকতাকে কুর্নিশ জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, গুরুতরভাবে জখম হওয়ার পরও স্মিত হামলার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান এবং ককপিটের দরজা খুলে দেন। এর ফলে অন্যরা ভিতরে ঢুকে হামলাকারীকে আটক করতে সক্ষম হন এবং একটি বড় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হয়।
কে এই সাহসী পাইলট?
গুজরাতি বংশোদ্ভূত ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার একজন অভিজ্ঞ বিমানচালক। ২০১১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত প্রায় ১১ বছর তিনি ভারতের স্পাইসজেট সংস্থায় কাজ করেছেন। এরপর ২০২২ সালে দুবাইয়ের এই বিমান সংস্থায় যোগ দেন।
বোয়িং-৭৩৭ বিমান চালানোর পাশাপাশি তিনি বহু তরুণ পাইলটকে প্রশিক্ষণও দিয়েছেন। পড়াশোনাতেও কৃতী স্মিত ওয়েলিংকর ইনস্টিটিউট থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
সৌদি আরবে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাসের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার জানানো হয়েছে, আহত ক্যাপ্টেন স্মিত বর্তমানে তাবুকের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর শারীরিক অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল রয়েছে। চিকিৎসকরা তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখছেন।
নিজের জীবন বিপন্ন জেনেও ১৮০ জন যাত্রীর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছার যে সাহস ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
No Comment! Be the first one.