সকাল সকাল ডেস্ক
রিয়াধ: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়ল বিশ্ব জ্বালানি বাজারে। হামলার পর গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট–ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মানদেব প্রণালির কৌশলগত পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। ফলে আরব উপদ্বীপের দুই প্রান্তের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ পথ ঘিরে চাপ আরও বেড়েছে।
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ। প্রায় ১,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনটি দেশের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রগুলিকে লোহিত সাগরের উপকূলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালি এড়িয়েও আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পাঠানোর সুযোগ পায় রিয়াধ। সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে হরমুজ দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় এই পাইপলাইনের গুরুত্ব আরও বেড়েছিল।
সৌদি জ্বালানি মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে রিয়াধ ও মদিনা অঞ্চলে ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনের বিভিন্ন অংশে হামলা হয়। এরপর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। সৌদি বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং সম্পত্তির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। তবে তেল রপ্তানিতে ঠিক কতটা প্রভাব পড়েছে, তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ও বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলিতে এই পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ ব্যারেল তেল পরিবহণ করা হয়েছে। যা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের আনুমানিক ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান। ফলে পাইপলাইন দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তার বড় প্রভাব পড়তে পারে।
এর মধ্যেই বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হুতিদের অগ্রগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ইয়েমেনের সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হুতিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম বা ময়উন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। দ্বীপটি বাব আল-মানদেব প্রণালির মাঝামাঝি অবস্থিত। ফলে লোহিত সাগরে প্রবেশ ও বেরোনোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী দ্বীপটি থেকে সরে যাওয়ার পর হুতি যোদ্ধারা নৌযানে সেখানে পৌঁছয়। বাব আল-মানদেব উপকূলের বিভিন্ন এলাকাতেও সশস্ত্র যোদ্ধা ও সামরিক যান মোতায়েন করা হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে।
হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি অবশ্য দাবি করেছেন, আগে থেকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সৌদি জাহাজ ছাড়া অন্য জাহাজগুলির জন্য সমুদ্রপথ নিরাপদ রয়েছে।
এদিকে ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলার জন্য কারা সরাসরি দায়ী, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরাকে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হামলার পর ইরাকের মাইসান প্রদেশে সামরিক অভিযানের দায়িত্বে থাকা এক শীর্ষ কমান্ডারকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ইরান সীমান্তবর্তী মাইসান দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে পরিচিত।
ইরাক সরকার সৌদি আরবে হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে। সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ইরান সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ শালামচেহ সীমান্তপথও বন্ধ করেছে বাগদাদ। হামলার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে বড় আকারে অভিযান চলছে বলে নিরাপত্তা সূত্রের দাবি।
সৌদি আরব এখনও পাল্টা সামরিক হামলার পথে না হাঁটার সিদ্ধান্তে অটল। তবে রিয়াধ জানিয়েছে, দেশের নিরাপত্তা ও স্বার্থ রক্ষায় ‘প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা’ নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
পরিস্থিতির মধ্যে সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন হুতিদের মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য, ওয়াশিংটন আপাতত হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে নামতে আগ্রহী নয়। তবে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য এবং সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে সহযোগিতা দেওয়া হতে পারে।
No Comment! Be the first one.