সকাল সকাল ডেস্ক
তেহরান/ওয়াশিংটন: মধ্যপ্রাচ্যে ফের দ্রুত অবনতি হচ্ছে পরিস্থিতি। এক মাস আগে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার পর বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে একাধিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। দক্ষিণ ইরানের হরমুজ প্রণালীর সংলগ্ন এলাকায় দুটি সেতু, একটি রেলস্টেশন এবং একটি বিমানবন্দরকে লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম। এসব হামলায় অন্তত চারজন নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন বলে ইরানের সরকারি সূত্রের দাবি। এর জবাবে জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের দাবি করেছে ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণ পথ হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হরমোজগান প্রদেশে একটি সেতুর উপর হামলায় তিনজন নিহত এবং নয়জন আহত হন। পৃথকভাবে বন্দর আব্বাসে চালানো আরেকটি হামলায় একজনের মৃত্যু ও আটজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, টানা ষষ্ঠ রাতের মতো পরিচালিত এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা এবং সামরিক রসদ পরিবহণ ব্যবস্থায় আঘাত হানা। যদিও ইরানের দাবি, হামলায় গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক পরিবহণ পরিকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে পশ্চিম ইরানের বুশেহর শহরেও বিস্ফোরণের খবর মিলেছে। শহরটিতেই ইরানের একমাত্র অসামরিক পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত। তবে ওই কেন্দ্রের কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি।
হামলার পরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় তেহরান। আইআরজিসি দাবি করেছে, জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে। ইরানের অভিযোগ, আহভাজ শহরের কাছে একটি শিশু ক্যানসার হাসপাতালের সংলগ্ন এলাকায় মার্কিন হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এই হামলাকে ‘বর্বরোচিত আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
আহভাজের এক বাসিন্দা সংবাদমাধ্যমকে জানান, পরপর একাধিক বিস্ফোরণে গোটা এলাকা কেঁপে ওঠে। তাঁর দাবি, কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্তত ১১ থেকে ১২টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যার অভিঘাতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ইরানের পাল্টা হামলার পর সতর্কতা জারি করেছে মার্কিন মিত্র দেশগুলিও। কুয়েত জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। বাহরিনেও বিমান হামলার সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হয়েছে।
ইরানের সেনাবাহিনীর এক শীর্ষ মুখপাত্র জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীর প্রশ্নে কোনও আপস করা হবে না। একই সঙ্গে তিনি মার্কিন সেনাকে গোটা অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানান। গত জুন মাসে হওয়া সমঝোতার পর অল্প সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল শুরু হলেও সম্প্রতি তেহরান ঘোষণা করেছে, মার্কিন সামরিক চাপ অব্যাহত থাকলে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হতে পারে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের বন্দরগুলির উপর নৌ অবরোধ আরও জোরদার করেছে। মার্কিন বাহিনীর দাবি, ওমান উপসাগরে একটি জাহাজে তল্লাশি চালানো হয়েছে এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে অন্তত তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজকে বিকল্প পথে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে দুই পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। সে দেশের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেছেন, আলোচনার মাধ্যমেই সংকটের সমাধান সম্ভব। তবে ইরানের প্রধান আলোচক মহম্মদ বাকের গালিবাফ স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোনও সমঝোতার মূল্য তখনই থাকবে, যখন তার শর্ত বাস্তবে কার্যকর হবে।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লিভিট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখনও কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখতে চান। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করা হলে তার কঠোর মূল্য দিতে হবে ইরানকে। এর আগে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তেহরান আলোচনায় না ফিরলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতু-সহ আরও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর উপর হামলা বাড়ানো হতে পারে।
ইরানের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া নতুন মার্কিন হামলায় এখনও পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্রমশ জটিল হয়ে ওঠা এই সংঘাত শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্ব জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার উপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা।
No Comment! Be the first one.