ইসলামাবাদ: ইরান-মার্কিন সংঘাতকে কেন্দ্র করে পশ্চিম এশিয়ায় চলমান অস্থিরতার প্রভাব এবার সরাসরি পড়তে শুরু করেছে পাকিস্তানের জ্বালানি সরবরাহে। পেট্রল ও ডিজেলের দাম কয়েক দফায় বৃদ্ধির পর জ্বালানি সাশ্রয়ে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি অফিসের কর্মদিবস কমানো এবং হাটবাজার ও শপিংমল আগেভাগে বন্ধ করার মতো পদক্ষেপ বিবেচনা করছে ইসলামাবাদ।
জ্বালানির ব্যবহার কীভাবে কমানো যায়, তা নিয়ে মঙ্গলবার রাতে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানে সরকারি ও বেসরকারি—দুই ক্ষেত্রেই জ্বালানির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
জ্বালানি সংকটের মধ্যেই নতুন করে বেড়েছে পেট্রল ও ডিজেলের দাম। মঙ্গলবার রাতে পেট্রলের দাম লিটারপ্রতি ৪ টাকা ১০ পয়সা এবং হাই-স্পিড ডিজেলের দাম ৬ টাকা ৪১ পয়সা বাড়ানো হয়েছে। পাকিস্তানের পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, এর ফলে পেট্রলের দাম দাঁড়িয়েছে লিটারপ্রতি ৩৮৪ টাকা ৩৪ পয়সা এবং হাই-স্পিড ডিজেলের দাম ৪১৫ টাকা ৮৩ পয়সা।
সরকারের দাবি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল আমদানিতে তৈরি হওয়া সমস্যার কারণে জ্বালানি সরবরাহের উপর চাপ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরে পেট্রল ও ডিজেলের ব্যবহার কমানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাব্য ব্যবস্থাকে ঘিরে পাকিস্তানে ‘স্মার্ট লকডাউন’ শব্দটিও আলোচনায় এসেছে। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি অফিসে সপ্তাহে চারদিন কাজ এবং তিনদিন ছুটির ব্যবস্থা চালুর কথা রয়েছে। কর্মদিবসগুলোতেও বিকালের মধ্যে অফিস বন্ধ করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে।
একই সঙ্গে হাটবাজার, বিপণিবিতান ও শপিংমলের সময়সীমা কমানোর কথাও ভাবা হচ্ছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, রাত ৮টার পর বাজার ও শপিংমল বন্ধ রাখতে হতে পারে। খাবারের দোকান ও রেস্তোরাঁ রাত ১০টার মধ্যে বন্ধ করার পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে।
তবে ‘স্মার্ট লকডাউন’ নিয়ে প্রকাশিত খবরকে সরাসরি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখতে নারাজ পাকিস্তান সরকারের একাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মুসাদিক মালিক জানিয়েছেন, সরকার জ্বালানি ও ব্যয় সাশ্রয়ের বিভিন্ন উপায় বিবেচনা করছে। তার অর্থ এই নয় যে গোটা দেশের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।
এর আগে তথ্যমন্ত্রী আত্তা তারারও জানিয়েছিলেন, সরকারি ব্যয় কমাতে একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। মঙ্গলবারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আলোচিত প্রস্তাবগুলো সেই বৃহত্তর ব্যয় সংকোচন পরিকল্পনারই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাকিস্তানের উপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী আওয়াইস লেঘারি। মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়ায় সরকারের ব্যয়ের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ভর্তুকি মূল্যে জ্বালানি সরবরাহেও সীমা নির্ধারণের পরিকল্পনা সামনে এসেছে। জ্বালানিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেল চালকদের সপ্তাহে সর্বোচ্চ পাঁচ লিটার ভর্তুকিযুক্ত পেট্রল এবং ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের প্রতি ১০ দিনে সর্বোচ্চ ১০ লিটার পেট্রল দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকারের জ্বালানি সাশ্রয় ও মূল্যবৃদ্ধির পদক্ষেপ ঘিরে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। বিরোধী দলগুলোর একাংশ জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেওয়ার কথা জানিয়েছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অসন্তোষ সামাল দেওয়াও শাহবাজ শরিফ সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
No Comment! Be the first one.