সকাল সকাল ডেস্ক
বেজিং: একসময় চিনের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের তালিকার শীর্ষে ছিলেন তিনি। সম্পত্তির পরিমাণ পৌঁছেছিল কয়েক লক্ষ কোটি টাকায়। আবাসন ব্যবসা থেকে ফুটবল ক্লাব—সাম্রাজ্যের বিস্তার ছিল বিশাল। সেই এভারগ্রান্ড প্রতিষ্ঠাতা শু জিয়াইন এখন যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত। চিনের আবাসন বাজারের অভূতপূর্ব উত্থানের অন্যতম মুখ থেকে কারাগারে পৌঁছনোর তাঁর এই যাত্রা কার্যত একটি যুগের পতনের প্রতীক।
চিনের ধসে পড়া আবাসন সংস্থা এভারগ্রান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ৬৭ বছরের শু জিয়াইনকে একাধিক আর্থিক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছে শেনঝেন ইন্টারমিডিয়েট পিপলস কোর্ট। ক্যান্টনিজ ভাষায় হুই কা ইয়ান নামেও পরিচিত এই শিল্পপতির বিরুদ্ধে প্রতারণা, ঘুষ, তহবিল আত্মসাৎ-সহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
বিপুল জরিমানা, সম্পত্তি উদ্ধারের নির্দেশ
আদালত শু-র উপর ৮.৮২ বিলিয়ন ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ১.৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার জরিমানা করেছে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১২,৫৪৩ কোটি টাকা। পাশাপাশি এভারগ্রান্ডের চিনের মূল ভূখণ্ডের অন্যতম প্রধান অপারেটিং সংস্থা হেংডা রিয়েল এস্টেটকে ৭ বিলিয়ন ইউয়ান জরিমানা করা হয়েছে।
চিনের সরকারি সংবাদমাধ্যমের দাবি, দেশের কোনও ফৌজদারি মামলায় কর্পোরেট ক্ষেত্রে আরোপিত সবচেয়ে বড় জরিমানাগুলির মধ্যে এটি অন্যতম।
আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, বেআইনিভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ, তহবিল সংগ্রহে প্রতারণা, বেআইনি ঋণ প্রদান, ভুয়ো সিকিউরিটি ইস্যু, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন এবং কর্পোরেট ঘুষ-সহ একাধিক আর্থিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শু।
অভিযুক্তদের বেআইনি উপার্জন ও সম্পত্তি উদ্ধারেরও নির্দেশ দিয়েছে আদালত। সেই অর্থ বা সম্পত্তি সম্পূর্ণ উদ্ধার করা সম্ভব না হলে ঘাটতি পূরণে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
শুধু শু নন, তাঁর দুই ছেলে-সহ এভারগ্রান্ডের ৫৬ জন কর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সাজা ২২ মাস থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত। অনেকের উপর জরিমানা এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশও রয়েছে।
দরিদ্র পরিবার থেকে চিনের ধনকুবের
১৯৫৮ সালে চিনের হেনান প্রদেশের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম শু জিয়াইনের। মাত্র এক বছর বয়সে মাকে হারান। নিজের শৈশবের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, অভাব ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। খাবার থেকে পোশাক—সব ক্ষেত্রেই প্রবল অর্থকষ্টের মধ্যে বড় হয়েছেন তিনি।
পড়াশোনা শেষে ধাতুবিদ্যায় শিক্ষা নিয়ে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্পাত কারখানায় চাকরি শুরু করেন। কিন্তু ১৯৯২ সালে শেনঝেনে চলে যাওয়ার পর তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন এভারগ্রান্ড।
চিনের দ্রুত সম্প্রসারিত আবাসন বাজারকে কাজে লাগিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য তৈরি করে এভারগ্রান্ড। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক আবাসন প্রকল্প শুরু হয়। ২০০৯ সালে হংকংয়ের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয় সংস্থাটি। আইপিও থেকে প্রায় ৭২৯ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে এভারগ্রান্ড।
এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি শু-কে। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৪৫.৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। ভারতীয় মুদ্রায় যা প্রায় ৪.৩৩ লক্ষ কোটি টাকা। সেই সময় তিনি চিনের ধনীতম ব্যক্তিদের একজন হওয়ার পাশাপাশি এশিয়ার অন্যতম ধনকুবের হয়ে ওঠেন।
যে ঋণেই উত্থান, সেই ঋণেই পতন
এভারগ্রান্ডের দ্রুত সম্প্রসারণের নেপথ্যে ছিল বিপুল ঋণ। নতুন প্রকল্প, জমি কেনা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণে ধার নেওয়ার উপর অত্যন্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল সংস্থাটি। পরিস্থিতি বদলে যায় ২০২০ সালে।
আবাসন ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঋণ এবং ফাটকাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতে বেজিং কঠোর আর্থিক বিধিনিষেধ চালু করে। এর অন্যতম ছিল ‘থ্রি রেড লাইনস’ নীতি। আবাসন সংস্থাগুলির ঋণের মাত্রা এবং আর্থিক অবস্থার উপর কঠোর সীমা আরোপ করা হয়।
বিপুল ঋণের বোঝায় থাকা এভারগ্রান্ডের পক্ষে নতুন ঋণ নিয়ে পুরনো দায় মেটানো ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ে। নগদের সংকট বাড়তে থাকে। চাপ বাড়ে বিনিয়োগকারী, ঋণদাতা এবং বাড়ির ক্রেতাদের উপর।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে ফিচ রেটিংস এভারগ্রান্ডকে ডিফল্টার ঘোষণা করে। সংস্থার বিভিন্ন দফতরের বাইরে বিক্ষোভও শুরু হয়। যদিও ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে কর্মীদের উদ্দেশে লেখা চিঠিতে শু দাবি করেছিলেন, এভারগ্রান্ড দ্রুত ‘অন্ধকার সময়’ কাটিয়ে উঠবে। বাস্তবে সেই প্রত্যাবর্তন আর হয়নি।
ফুটবল মাঠেও তৈরি করেছিলেন সাম্রাজ্য
আবাসন ব্যবসার পাশাপাশি ফুটবলের প্রতিও প্রবল আগ্রহ ছিল শু-র। ২০১০ সালে তিনি সমস্যায় থাকা গুয়াংঝো ফুটবল ক্লাব কিনে নেন। পরবর্তীতে সেটির নাম হয় গুয়াংঝো এভারগ্রান্ড।
ক্লাবটির পিছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেন শু। আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার ও কোচ আনা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই চিনের ফুটবলে অন্যতম শক্তিশালী ক্লাবে পরিণত হয় গুয়াংঝো এভারগ্রান্ড এবং একাধিক বড় সাফল্য পায়।
শু-র বিলাসবহুল জীবনযাপনও ছিল আলোচনার বিষয়। দামি গাড়ি, ইয়ট এবং বহুমূল্য পোশাকের প্রতি তাঁর আগ্রহ নিয়ে চিনা সংবাদমাধ্যমে বহু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ফরাসি বিলাসবহুল ব্র্যান্ড হার্মেসের বেল্ট পরার অভ্যাসের কারণে তাঁকে কখনও কখনও ‘বেল্ট শু’ বলেও উল্লেখ করা হত।
কয়েক বছরেই উধাও বিপুল সম্পদ
এভারগ্রান্ডের আর্থিক সংকট যত গভীর হয়েছে, ততই কমেছে শু-র ব্যক্তিগত সম্পত্তি। ২০১৭ সালে যেখানে তাঁর সম্পত্তির মূল্য ৪২ থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ছিল, কয়েক বছরের মধ্যেই তার বড় অংশ হারিয়ে যায়। ২০২৩ সালে বিভিন্ন ধনী ব্যক্তির তালিকায় তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ আনুমানিক ১.৮ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে নেমে আসে।
২০২৩ সালে শু-কে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার খবর সামনে আসে। তারপর দীর্ঘ সময় তাঁকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। ২০২৫ সালে এভারগ্রান্ডের শেয়ার বাজার থেকে বাদ পড়ার সময়ও জনসমক্ষে দেখা যায়নি সংস্থার প্রতিষ্ঠাতাকে।
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে শেনঝেনের আদালত জানিয়েছিল, একাধিক অভিযোগে নিজের দোষ স্বীকার করে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন শু। কয়েক মাসের মধ্যেই এল তাঁর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায়।
একসময় চিনের আবাসন ব্যবসার সাফল্যের অন্যতম প্রতীক ছিলেন শু জিয়াইন। আজ তাঁর ঠিকানা কারাগার। ফলে তাঁর উত্থান-পতনের কাহিনি শুধু এক ধনকুবেরের ভাগ্যবদলের গল্প নয়, একই সঙ্গে বিপুল ঋণের উপর দাঁড়িয়ে তৈরি হওয়া আবাসন সাম্রাজ্যের ঝুঁকিরও এক নজির হয়ে থাকল।
No Comment! Be the first one.