সকাল সকাল ডেস্ক
বেজিং: চীনের চাকরির বাজারে ক্রমশ চাপ বাড়ছে। জুলাই মাসে দেশটিতে তরুণদের বেকারত্বের হার বেড়ে ১৭.৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বিপুল সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক একই সময়ে কর্মসংস্থানের বাজারে প্রবেশ করায় চাকরির জন্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বহু ক্ষেত্রে স্নাতক ডিগ্রির পরিবর্তে মাস্টার্স ডিগ্রিধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
চীনের জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর ১৯ আগস্ট প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার জুনে ছিল ১৪.৯ শতাংশ। জুলাইয়ে তা এক ধাক্কায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ১৭.৯ শতাংশ হয়েছে। এর আগে টানা তিন মাস তরুণদের বেকারত্বের হার কমেছিল।
গত বছরের জুলাইয়ে এই হার ছিল ১৭.৮ শতাংশ। এরপর আগস্টে তা বেড়ে ১৮.৯ শতাংশে পৌঁছেছিল। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে শিক্ষার্থীদের বাদ দিয়ে নতুন পদ্ধতিতে বেকারত্বের হিসাব শুরু হওয়ার পর সেটিই ছিল সর্বোচ্চ হার।
রেকর্ড সংখ্যক স্নাতক চাকরির বাজারে
চীনের অর্থনৈতিক গতি শ্লথ হওয়ার পাশাপাশি নতুন স্নাতকদের বিপুল সংখ্যাও কর্মসংস্থানের বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। চলতি গ্রীষ্মে আনুমানিক ১ কোটি ২৭ লাখ বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক চাকরির বাজারে প্রবেশ করেছেন। গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৪ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছে। কোনও কোনও সংস্থা কর্মীসংখ্যা কমাচ্ছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান নতুন নিয়োগ স্থগিত রেখেছে। ফলে সীমিত সংখ্যক পদের জন্য বিপুল সংখ্যক আবেদনকারীর মধ্যে কঠিন প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
চাকরির জন্য মাস্টার্স ডিগ্রির চাহিদা
চাকরির বাজারে শিক্ষাগত যোগ্যতার মানদণ্ডও ক্রমশ বাড়ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এমন পদের ক্ষেত্রেও মাস্টার্স ডিগ্রিধারীরা আবেদন করছেন, যেখানে আগে স্নাতক ডিগ্রিই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হত। এর ফলে শুধুমাত্র স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে চাকরি খুঁজতে নামা তরুণদের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
২২ বছর বয়সী ক্লেয়ার ওয়াং জিলিন জিয়ানঝু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রোডাক্ট ডিজাইনে স্নাতক হয়েছেন। বর্তমানে তিনি বিদেশে মাস্টার্স করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ওয়াংয়ের বক্তব্য, দেশের বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিয়োগের শর্ত পর্যালোচনা করে তিনি দেখেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই মাস্টার্স ডিগ্রিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের পক্ষে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
শুধু চীনের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা তরুণরাই নন, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফেরা চাকরিপ্রার্থীরাও একই ধরনের প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছেন।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইক থেকে ই-কমার্স ম্যানেজমেন্টে মাস্টার্স করা ২৪ বছর বয়সী ভিকি ঝাওয়ের অভিজ্ঞতাও একই রকম। তাঁর মতে, চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার মানদণ্ড আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এমনকি প্রাথমিক স্তরের বিভিন্ন পদের জন্যও চীনের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স ডিগ্রিধারীরা আবেদন করছেন।
উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরির দিকে ঝোঁক
বেসরকারি ক্ষেত্রে চাকরির তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে অনেক তরুণ এখন আরও উচ্চশিক্ষার দিকে ঝুঁকছেন। কেউ মাস্টার্স বা অন্য উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করে নিজেদের যোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। এর ফলে তাঁদের চাকরির বাজারে প্রবেশের সময়ও পিছিয়ে যাচ্ছে।
একই সঙ্গে সরকারি চাকরির প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। চীনে সরকারি চাকরিকে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল কর্মসংস্থান হিসেবে দেখা হয়। ফলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে তরুণদের একটি অংশ সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারের উদ্যোগ
তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে চীনা সরকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন স্নাতকদের নিয়োগ করা প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংস্থাগুলিকেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির জন্য উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
কোম্পানি ও বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে নতুন স্নাতকদের জন্য আরও পদ তৈরি এবং তাঁদের নিয়োগে উৎসাহিত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
তা সত্ত্বেও জুলাইয়ের বেকারত্বের পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান এখনও চীনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে রেকর্ড সংখ্যক নতুন স্নাতক, অন্যদিকে নিয়োগে সংস্থাগুলির সতর্কতা এবং ক্রমবর্ধমান শিক্ষাগত যোগ্যতার চাহিদা—সব মিলিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
No Comment! Be the first one.