সকাল সকাল ডেস্ক
পরিচিত কোনও মানুষের নাম জানা আছে, জায়গাটিও চেনা, এমনকি কোনও সাধারণ শব্দও বহুবার ব্যবহার করেছেন—তবু প্রয়োজনের মুহূর্তে কিছুতেই মনে পড়ছে না। মনে হচ্ছে উত্তরটি যেন জিভের ডগায় আটকে রয়েছে। কিছুক্ষণ পর আবার আচমকাই মনে পড়ে গেল। এমন অভিজ্ঞতা কমবেশি প্রায় সকলেরই হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অবস্থাকে বলা হয় ‘টিপ-অফ-দ্য-টাং’।
মাঝে মধ্যে এমন ঘটনা ঘটলেই স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে, এমনটা ধরে নেওয়ার কারণ নেই। সাধারণত এটি মস্তিষ্কের স্মৃতি থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। তবে পরিচিত নাম বা শব্দ মনে করতে না পারার ঘটনা যদি ঘন ঘন ঘটতে শুরু করে, ক্রমশ বাড়ে কিংবা দৈনন্দিন কথাবার্তায় সমস্যা তৈরি করে, তা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
কেন পরিচিত শব্দ মনে পড়ে না?
‘টিপ-অফ-দ্য-টাং’-এর সময় শব্দটি সাধারণত স্মৃতি থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। বরং নির্দিষ্ট মুহূর্তে সেই শব্দটি খুঁজে বের করার প্রক্রিয়ায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে শব্দটির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য মনে থাকে, অথচ ঠিক শব্দটিই মুখে আসে না। কয়েক সেকেন্ড বা মিনিট পরে কোনও বিশেষ চেষ্টা ছাড়াই সেটি আবার মনে পড়তে পারে।
ভাষা ও স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় শব্দ মনে পড়ে। এই প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে ধীর হয়ে গেলে পরিচিত শব্দও মনে করতে অসুবিধা হতে পারে।
অতিরিক্ত মানসিক চাপ, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং ক্লান্তি সাময়িকভাবে তথ্য মনে করার ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতি থেকে কোনও তথ্য খুঁজে বের করার গতি কিছুটা কমে যাওয়াও স্বাভাবিক। তাই মাঝেমধ্যে কারও নাম বা কোনও শব্দ মনে না পড়া মানেই স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, এমন নয়।
কখন সতর্ক হওয়া প্রয়োজন?
সমস্যা যদি আগের তুলনায় বাড়তে থাকে, নিয়মিত কথাবার্তায় বাধা সৃষ্টি করে কিংবা স্মৃতি ও চিন্তাভাবনার অন্য পরিবর্তনের সঙ্গে দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ভিটামিন বি-১২-এর ঘাটতি, থাইরয়েডের সমস্যা, অবসাদ, উদ্বেগ, শ্রবণশক্তির সমস্যা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবিটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার সঙ্গেও স্মৃতি ও মনোযোগের পরিবর্তন যুক্ত থাকতে পারে।
বারবার পরিচিত মানুষের নাম বা সাধারণ শব্দ ভুলে যাওয়া, অন্যের কথার ধারা অনুসরণ করতে সমস্যা হওয়া কিংবা নিজের বক্তব্য ঠিকভাবে প্রকাশ করতে না পারলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। পরিচিত জায়গায় পথ হারিয়ে ফেলা, অস্বাভাবিক বিভ্রান্তি বা দৈনন্দিন পরিচিত কাজ করতে অসুবিধা হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
হঠাৎ সমস্যা হলে জরুরি চিকিৎসা
শব্দ খুঁজে পেতে অসুবিধা যদি হঠাৎ শুরু হয় এবং তার সঙ্গে কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখের একপাশ বেঁকে যাওয়া, হাত-পা বা শরীরের একপাশ দুর্বল হয়ে পড়া কিংবা হঠাৎ বিভ্রান্তির মতো উপসর্গ দেখা দেয়, তা স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অপেক্ষা না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
শব্দ মনে না পড়লে কী করবেন?
কোনও শব্দ মনে না এলে সেটি জোর করে মনে করার চেষ্টা না করে কিছুক্ষণ অন্যদিকে মন দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজন হলে শব্দটির অর্থ বা সেটি কী বোঝায়, তা অন্যভাবে বর্ণনা করে কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়া যায়। পরে আবার শব্দটি মনে করার চেষ্টা করা যেতে পারে।
পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাবার, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা মস্তিষ্কের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি নতুন কিছু শেখা ও নিয়মিত মানসিকভাবে সক্রিয় থাকার অভ্যাসও উপকারী।
সুতরাং, মাঝেমধ্যে পরিচিত কোনও নাম বা শব্দ মনে না পড়া সাধারণ ঘটনা। কিন্তু এই সমস্যা যদি বারবার হতে থাকে, ক্রমশ বাড়ে বা তার সঙ্গে আচরণ, স্মৃতি, ভাষা কিংবা দৈনন্দিন কাজকর্মে পরিবর্তন দেখা দেয়, তাহলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই উচিত।
No Comment! Be the first one.