সকাল সকাল ডেস্ক
তারাতলার নির্মীয়মাণ গোডাউন ধসের মর্মান্তিক ঘটনার পর রাজ্যজুড়ে বহুতল নির্মাণের নিরাপত্তা নিয়ে কড়া পদক্ষেপ শুরু করেছে প্রশাসন। Building Audit Kolkata-এর মাধ্যমে কলকাতা পুরসভা ছ’তলা বা তার বেশি উচ্চতার আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে। একইসঙ্গে তারাতলা দুর্ঘটনার তদন্তে উঠে এসেছে পুরসভার অনুমোদন ঘিরে কমিশন-ভিত্তিক একটি প্রভাবশালী দালাল চক্রের অভিযোগ, যা গোটা নির্মাণ ব্যবস্থাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
কেন শুরু হচ্ছে Building Audit Kolkata?
তারাতলার দুর্ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে কলকাতা-সহ রাজ্যের ১৩টি পুরসভা এলাকায় আপাতত নতুন নির্মাণকাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি Building Audit Kolkata-এর প্রথম ধাপে প্রতিটি ওয়ার্ডে কতগুলি ছ’তলা বা তার বেশি ভবন রয়েছে এবং কোথায় নির্মাণকাজ চলছে, তার বিস্তারিত তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।
কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, নির্মীয়মাণ ও সম্পূর্ণ হওয়া বহুতলগুলির পৃথক তথ্য সংগ্রহ করতে। প্রশাসনের মতে, এই তথ্যভাণ্ডার তৈরি হলে পরবর্তী প্রযুক্তিগত অডিট দ্রুত ও আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

কীভাবে হবে বহুতলের নিরাপত্তা পরীক্ষা?
রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দফতরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের অডিট কমিটি গঠন করেছে। অন্যদিকে কলকাতা পুরসভা বরোভিত্তিক যৌথ পরিদর্শন দল গঠন করছে।
এই দলে থাকবেন—
- পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের আধিকারিক
- পূর্ত দফতরের প্রতিনিধি
- কেএমডিএ-র বিশেষজ্ঞ
- সিইএসসি ও রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদের প্রযুক্তিবিদ
- কলকাতা পুলিশ
- দমকল বিভাগ
- বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের আধিকারিক
Building Audit Kolkata-এর মূল লক্ষ্য হবে ভবনের কাঠামোগত স্থায়িত্ব, নির্মাণের গুণমান এবং অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করা।
আরও অন্য খবরের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজ
ডেভেলপারদের কাছ থেকে চাওয়া হচ্ছে বিস্তারিত তথ্য
সমীক্ষাকে আরও নির্ভুল করতে কলকাতা পুরসভা একটি বিশেষ তথ্যপত্র চালু করেছে। সংশ্লিষ্ট ডেভেলপার বা নির্মাণকারী সংস্থাগুলিকে জমা দিতে হবে—
- প্রকল্পের ধরন
- পুরসভার অনুমোদনের নথি
- ব্যবহৃত নির্মাণ প্রযুক্তি
- স্ট্রাকচারাল তথ্য
- অন্যান্য প্রয়োজনীয় নথি
এই তথ্য পুরসভার নিজস্ব ডেটাবেসের সঙ্গে মিলিয়ে সম্ভাব্য অসঙ্গতি বা অনিয়ম চিহ্নিত করা হবে।
শুধু ডেভেলপারদের নথিই নয়, লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিল্ডিং সার্ভেয়ার, স্থপতি এবং স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারদের কাছ থেকেও নকশা ও অনুমোদনের কাগজপত্র সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তারাতলা তদন্তে সামনে এল ‘দালাল চক্র’-এর অভিযোগ
এদিকে তারাতলার নির্মীয়মাণ গোডাউন ধসের ঘটনায় কলকাতা পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT)-এর তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
তদন্তকারীদের দাবি, পুরসভার অনুমোদন পাইয়ে দেওয়ার নামে একটি প্রভাবশালী দালাল চক্র সক্রিয় ছিল। অভিযোগ, প্রতি বর্গফুট নির্মাণের জন্য ২২০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হত।
এই ঘটনায় ইতিমধ্যেই আবদুল হামিদ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তদন্তে জানা গিয়েছে, তিনি গোডাউনের মালিকপক্ষের কাছ থেকে প্রতি বর্গফুটে ২০০ টাকারও বেশি কমিশন নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ।
প্রাক্তন মেয়রের ঘনিষ্ঠের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে SIT
লালবাজার সূত্রে খবর, তদন্তে পুরসভার অনুমোদন প্রক্রিয়ায় নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে জমা পড়া নথি দ্রুত অনুমোদনের জন্য পাঠানো হত। এই ঘটনায় প্রাক্তন মেয়রের এক ঘনিষ্ঠ সহায়কের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইতিমধ্যেই তাঁর শিবপুরের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে—
- দুটি মোবাইল ফোন
- গুরুত্বপূর্ণ নথি
- একাধিক রেজিস্টার
উদ্ধার করেছে তদন্তকারী দল। পাশাপাশি তাঁর ব্যাঙ্ক লেনদেনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দমকল ছাড়পত্র ও Soil Test নিয়েও প্রশ্ন
তদন্তকারীরা এখন জানতে চাইছেন, গোডাউন নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় দমকলের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না।
একইসঙ্গে মাটির ধারণক্ষমতা পরীক্ষার (Soil Test) রিপোর্ট সংগ্রহ করতে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। মূল বিল্ডিং প্ল্যানও চাওয়া হয়েছে কলকাতা পুরসভার কাছ থেকে।
এ পর্যন্ত ছয়জন গ্রেফতার হয়েছেন। আরও পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন পুরসভার দুই লাইসেন্সপ্রাপ্ত বিল্ডিং সার্ভেয়ার।
সাধারণ মানুষের জন্য কী বার্তা?
প্রশাসনের দাবি, Building Audit Kolkata-এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে তারাতলার মতো দুর্ঘটনা এড়ানোই মূল লক্ষ্য। নির্মাণে স্বচ্ছতা, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি এবং নিরাপত্তা মান কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত স্ট্রাকচারাল অডিট, অনুমোদিত নকশা মেনে নির্মাণ এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে শহরের বহুতল নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
No Comment! Be the first one.