সকাল সকাল ডেস্ক
ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের বালুচিস্তানে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া গাড়ির বহরে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই হামলায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ১৩ জন জওয়ান নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)। হামলার দায় স্বীকার করে সংগঠনটির সরকারি চ্যানেল ‘হাকাল’ এক মিনিট ৩৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। ভিডিওটিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলার দৃশ্য দেখানো হয়েছে।
হাকাল মিডিয়ার সূত্র উল্লেখ করে ‘দ্য বালুচিস্তান পোস্ট’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মির সদস্যরা মাস্তুংয়ের খড়কোচা এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি কনভয়কে লক্ষ্য করে হামলা চালায়। আইইডি বিস্ফোরণে একটি সাঁজোয়া গাড়ি ধ্বংস করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে। একই সঙ্গে আরও একটি সাঁজোয়া গাড়ি এবং কনভয়ের সঙ্গে থাকা অন্যান্য গাড়ির উপরও অতর্কিতে হামলা চালানো হয়।
বিএলএ-র দাবি, হামলায় ১৩ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ১০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। সংগঠনটির মুখপাত্র জানিয়েছেন, এই অভিযানে তাদের স্পেশাল ট্যাকটিক্যাল অপারেশন স্কোয়াডও অংশ নেয়। এই ইউনিটটি ‘ফতেহ স্কোয়াড’ নামেও পরিচিত।
প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা যায়, কনভয় আসার আগে একটি সেতুর নিচে বিস্ফোরক স্থাপন করা হচ্ছে। সাঁজোয়া গাড়ির কনভয় সেখানে পৌঁছনোর পর একটি গাড়ি শক্তিশালী বিস্ফোরণের কবলে পড়ে। হামলার পর ড্রোন থেকে ধারণ করা কিছু দৃশ্যও ভিডিওটিতে দেখানো হয়েছে।
বিএলএ পাকিস্তানে সক্রিয় একটি সশস্ত্র বালুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন। চলতি বছরের ১১ মার্চ বোলান জেলায় জাফর এক্সপ্রেস ট্রেনে হামলা চালিয়ে ১৮০ জনের বেশি মানুষকে পণবন্দি করার ঘটনার দায়ও সংগঠনটি নিয়েছিল। ওই অভিযানে বিএলএ-র ফিদায়িন ইউনিট ‘মজিদ ব্রিগেড’-এর পাশাপাশি স্পেশাল ট্যাকটিক্যাল অপারেশন স্কোয়াড অংশ নিয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
বালুচিস্তানকে পাকিস্তান থেকে স্বাধীন করার লক্ষ্য নিয়ে ২০০০ সালে বিএলএ প্রতিষ্ঠিত হয়। পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারি প্রতিষ্ঠান ছাড়াও বিশেষ করে চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর এবং চিনের অর্থায়নে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পকে অতীতে একাধিকবার নিশানা করেছে সংগঠনটি।
বিএলএ-র বিভিন্ন অভিযান মূলত মজিদ ব্রিগেড, ফতেহ স্কোয়াড এবং অন্যান্য সশস্ত্র ইউনিটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব ইউনিট মূলত গেরিলা কৌশলে হামলা চালানোর জন্য পরিচিত।
মজিদ ব্রিগেড প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১১ সালে। এটি বিএলএ-র বিশেষ বাহিনী হিসেবে পরিচিত এবং আত্মঘাতী হামলায় এই ইউনিটকে ব্যবহার করা হয়। ব্রিগেডটির নাম রাখা হয়েছে আব্দুল মজিদ বালুচের নামে। ১৯৭৪ সালে তৎকালীন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন আব্দুল মজিদ বালুচ। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানে একাধিক বড় হামলার সঙ্গে মজিদ ব্রিগেডের নাম জড়িয়েছে।
অন্যদিকে, ফতেহ স্কোয়াড প্রধানত বালুচিস্তানের পাহাড়ি এলাকায় পাকিস্তানি সামরিক টহলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা অভিযান পরিচালনা করে বলে জানা যায়। বিএলএ-র দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ‘অপারেশন হেরোফ’-এর সময় ফতেহ স্কোয়াড অন্য ইউনিটগুলির সঙ্গে যৌথভাবে বালুচিস্তানের ১৪টি স্থানে অবরোধ তৈরি করেছিল এবং সেই অভিযানে ৬২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছিলেন। তবে এই সংখ্যাগুলি বিএলএ-র নিজস্ব দাবি।
স্পেশাল ট্যাকটিক্যাল অপারেশন স্কোয়াডকে বিএলএ-র একটি বিশেষ ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ইউনিট মূলত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে হামলার সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হয়। বশির জাইব বালুচের নেতৃত্বাধীন বিএলএ-র এই ইউনিট পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাদের স্থানীয় সহযোগীদেরও লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে।
বালুচিস্তানের বর্তমান সংঘাতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও দীর্ঘ। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে যাওয়ার সময় কালাত রাজ্য স্বাধীনতা ঘোষণা করে। বর্তমান বালুচিস্তানের একটি বড় অংশ তখন কালাতের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে কালাতের সম্পর্ক নিয়ে টানাপড়েন তৈরি হয়। ১৯৪৮ সালের মার্চে কালাত পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকেই অঞ্চলটিতে অসন্তোষ ও সশস্ত্র বিদ্রোহের বিভিন্ন পর্যায় দেখা যায়।
১৯৪৮ সালের পর ১৯৫৮-৫৯, ১৯৭৩-৭৭ এবং ২০০৪ সালের পরবর্তী সময়েও বালুচিস্তানে একাধিক বিদ্রোহ হয়েছে। বালুচ জাতীয়তাবাদীদের অভিযোগ, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার বালুচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করলেও স্থানীয় মানুষ তার যথাযথ সুবিধা পান না। বিভিন্ন বালুচ গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সম্পদের ন্যায্য অংশীদারিত্ব এবং অধিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি জানিয়ে আসছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী বিভিন্ন সময় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের চেষ্টা করেছে। এসব অভিযানকে ঘিরে পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগও বিভিন্ন সময় সামনে এসেছে।
No Comment! Be the first one.