সকাল সকাল ডেস্ক
প্যারিস: শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত পড়ুয়া এবং শিক্ষা পরিকাঠামোর বেহাল দশার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে চলা ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে অভিবাসন ও ধর্মের প্রসঙ্গ জুড়ে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ফ্রান্সের বর্তমান অস্থিরতার নেপথ্যে রয়েছে ‘অনিয়ন্ত্রিত গণ-অভিবাসন’। একই সঙ্গে আন্দোলনকে ঘিরে ইসলাম সম্পর্কেও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন তিনি।
সামাজিক মাধ্যম ‘এক্স’-এ ট্রাম্প দাবি করেন, ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু স্কুল বা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নয়। তাঁর বক্তব্য, এর সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসনের সম্পর্ক রয়েছে। একই পোস্টে তিনি ফ্রান্সকে ‘ইসলামের দখলে নেওয়ার’ চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন।
তবে ফ্রান্সে চলমান ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত দাবিগুলি মূলত শিক্ষা ব্যবস্থার অর্থাভাব, শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত পড়ুয়া এবং স্কুল-কলেজের পরিকাঠামোগত সমস্যাকে কেন্দ্র করেই।
সেপ্টেম্বর থেকে আন্দোলন
সেপ্টেম্বরে প্যারিস থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে ফ্রান্সের একাধিক শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। প্যারিসের পাশাপাশি মার্সেই, লিলে, লিওঁ, নঁতে, স্ট্রাজবার্গ ও রেন-সহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সরকারি ক্ষেত্রের কর্মী ও কয়েকটি শ্রমিক সংগঠনের অংশগ্রহণের কথাও জানা গিয়েছে।
প্রতিবাদের অংশ হিসেবে বিভিন্ন হাইস্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করেছেন আন্দোলনকারীরা। অধিকাংশ জায়গায় সভা ও মিছিল হলেও কয়েকটি এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের খবরও সামনে এসেছে। কোথাও ব্যারিকেডে আগুন লাগানো ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে বলেও জানা গিয়েছে।
কী চাইছেন পড়ুয়ারা?
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি, শিক্ষা ব্যবস্থায় দ্রুত সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা। পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ, অনুপস্থিত শিক্ষকদের পরিবর্তে দ্রুত বদলি শিক্ষক নিয়োগ, শ্রেণিকক্ষে পড়ুয়ার সংখ্যা কমানো এবং পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ স্কুল ভবন সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী, স্কুলে নার্স ও সোশ্যাল ওয়ার্কার-সহ সহায়ক কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষায় আরও আসন তৈরির দাবিও রয়েছে।
পড়ুয়াদের সংগঠন ‘ইউনিয়ন সিন্ডিক্যাল লিসিইন’-এর দাবি, স্কুল ভবন সংস্কারের জন্য অন্তত ১০ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ করতে হবে। উচ্চশিক্ষায় অতিরিক্ত দেড় লক্ষ আসন তৈরি এবং বড় আকারে শিক্ষক নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও চাইছে সংগঠনটি।
সংঘর্ষ ঘিরে উদ্বেগ
বিক্ষোভ চলাকালীন বহু মানুষকে আটক বা গ্রেফতার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। আন্দোলনকারী এবং পুলিশ—উভয় পক্ষেরই আহত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছে। তবে গ্রেফতার ও আহতের মোট সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে।
লেন্স শহরে বিক্ষোভ চলাকালীন একটি বিস্ফোরক পুলিশি সরঞ্জামের আঘাতে এক কিশোর গুরুতর আহত হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে।
বাজেট ঘিরেও অসন্তোষ
ফ্রান্সের সরকার আগামী বছরের বাজেট নিয়ে আলোচনার মধ্যে থাকার সময়েই ছাত্র আন্দোলন তীব্র হয়েছে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন প্রস্তাব ঘিরে আগে থেকেই দেশের একাংশে অসন্তোষ রয়েছে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার দাবি-দাওয়ার সঙ্গে সরকারি পরিষেবা, মজুরি এবং ব্যয় সংকোচনের মতো বৃহত্তর অর্থনৈতিক বিষয়ও বিভিন্ন বিক্ষোভে উঠে আসছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার বার্তা দিয়েছে ফরাসি সরকার। শিক্ষক ঘাটতি, স্কুলের সময়সূচি এবং জরাজীর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংস্কার নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরির কথাও বলা হয়েছে।
ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন বিতর্ক
এরই মধ্যে ট্রাম্পের মন্তব্য ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। আন্দোলনকারীরা যেখানে মূলত শিক্ষা ব্যবস্থায় আরও অর্থ বরাদ্দ, শিক্ষক নিয়োগ এবং উন্নত পরিকাঠামোর দাবি তুলছেন, সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অভিবাসন ও ধর্মের প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন।
তবে ট্রাম্পের ‘অনিয়ন্ত্রিত গণ-অভিবাসন’ বা ফ্রান্সকে ‘ইসলামের দখলে নেওয়ার’ চেষ্টা সংক্রান্ত দাবির সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত দাবিগুলির সরাসরি যোগের কোনও প্রমাণ এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে তাঁর মন্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হলেও ফরাসি পড়ুয়ারা আপাতত শিক্ষা ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বরাদ্দ, শিক্ষক নিয়োগ এবং পরিকাঠামো উন্নয়নের দাবিতেই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
No Comment! Be the first one.