আইনের চোখ খোলাই থাকুক

সকাল সকাল ডেস্ক

তন্ময় সিংহ

ভারতবর্ষের ন্যায় সংহিতায় “লেডি জাস্টিস” এর যে ছবি পূর্বে ছিল, তা মূলত রোমান আইনের দেবীর ধারণা থেকে নেওয়া হয়েছিল এবং এই দেবীর চোখে কালো কাপড় দেওয়া থাকত যাতে নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। অপরাধীর সামাজিক পরিচয় বা আইনের দ্বারস্থ যিনি হয়েছেন তার সামাজিক পরিচয় না দেখে শুধুমাত্র সত্য ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এবং ধনী-দরিদ্রের মধ্যে কোন ভেদ না‌ করাই ছিলো, এই দেবীর ছবির মূল ধারণা। ভারতীয় সংবিধানে আইনের চোখে সবাই সমান এটা ভারতীয় আইন প্রস্তুত কারকেরা জনমানসে ধারণা তৈরি করতে পেরে ছিলেন । পরবর্তীকালে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি চন্দ্রচূড় সাহেবের আমলে এই আইনের দেবীর চোখের কালো কাপড় খুলে দেওয়া হয় এবং হাতে তরোয়ালের পরিবর্তে ভারতীয় সংবিধান দেওয়া হয়। নতুন শতাব্দীতে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এই বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে যে আইন অন্ধ নয় এবং সে সবাইকে সমান চোখে দেখে।

 পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাথে সাথে শাসক বিজেপি শিবির থেকে যেভাবে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসা বন্ধ করার জন্য বার্তা দিয়েছেন বিজেপি রাজ্য সভাপতি এবং বিজেপির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তাতে পরিবর্তনের পরে পশ্চিমবঙ্গে হানাহানি ও হিংসার ঘটনা যথেষ্ট কম হয়েছে। সারা ভারতে পশ্চিমবঙ্গের যে ছবি তৈরি হয়েছিল সিপিএম জমানার শেষের দিক থেকে তৃণমূল জমানা পর্যন্ত, সর্বাধিক রাজনৈতিক হানাহানি ও হিংসার রাজ্য হিসেবে সেই পরিচয় মুছতে বদ্ধপরিকর ছিল শাসক বিজেপি। এক্ষেত্রে তারা প্রায় সর্বত্রই অনেকাংশে সফল। পার্টি অফিস ভাঙ্গচুর, রাজনৈতিক হানাহানি ও সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার উপর আক্রমণের ঘটনা নজরে এলেও তা কখনোই সারা পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়নি। পরবর্তীকালে মন্ত্রিসভা গঠনের সাথে সাথে এবং প্রশাসন সক্রিয়ভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়ার ও গ্রেফতারি ঘটনায় এই আইনের শাসন দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা হচ্ছিল। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জির একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ডিম ও ঢিল ছোড়ার পরবর্তীতে সারা পশ্চিমবঙ্গে শাসকদলের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ডিম থেরাপি শুরু হয়েছে যা দেশের সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এছাড়াও প্রশাসনের তরফ থেকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্তদের কোমরে দড়ি পরিয়ে যে প্যারেড এর রীতি তৈরি হয়েছে তার নিন্দা করেছে মহামান্য হাইকোর্ট।

সারা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে জনতা বিভিন্ন পার্টি অফিস ও প্রাক্তন শাসক দলের কর্মীদের বাড়ি ঘেরাও করছে এবং সেখান থেকে বিভিন্ন রকম জিনিস উদ্ধার করছে। শুরু হচ্ছে ডিম থেরাপি। কোন রাজনৈতিক নেতা গ্রেপ্তার হলে তাকে কোর্টে পেশ করার সময় শুরু হচ্ছে ডিম থেরাপি। আবার বিভিন্ন পঞ্চায়েত গুলিতে প্রধান দেরকে আটকে রেখে শুরু হচ্ছে ডিম থেরাপি। কাউন্সিলর ও বিধায়কদের বাড়িতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিভিন্ন ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধারের পাশাপাশি শুরু হচ্ছে ডিম থেরাপি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শাসক দলের নেতাদের হাতে কর্মীদের লাগাম নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। কোন এলাকাতে শিক্ষক দেরিতে এলে তাকে ল্যাম্পপোস্ট বেধে রাখা হচ্ছে। বিদ্যালয়ে গিয়ে ডিম থেরাপি দেয়া হচ্ছে, জুতোর মালা পরানো হচ্ছে ।বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাকে বেঁধে রাখা হচ্ছে আবার তার সাথে থাকা প্রশাসনের আধিকারিক এবং সাংবাদিকদের ওপরও ছোঁড়া হয়ে যাচ্ছে ডিম। বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের প্রকাশ্যে কান ধরে উঠবস করতে দেখা যাচ্ছে। পুলিশ তাদের কোমরে দড়ি বেঁধে প্যারাড করাচ্ছে রাস্তাতে। হাইকোর্টের নিষেধ সত্ত্বেও চলছে এই অভ্যাস। ভারতীয় সংবিধান এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এই দুই পদ্ধতিকেই আইনি স্বীকৃতি দেয়নি। কোন এক অদৃশ্য অঙ্গুলি হেলনে যেন গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে চলেছে এই প্রয়োগ, সুতার সাথে বাঁধা পুতুলের মতন জোয়ারে গা ভাসিয়েছে জনতার একাংশ।

প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির তুলনায় ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের মূল কাঠামো যে আজও অবিকৃত আছে তার জন্য সবচেয়ে বেশি যার গুরুত্ব তা হলো ভারতীয় সংবিধান। সেই ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী সম্মানের সাথে বাঁচার অধিকার তাদের মৌলিক অধিকার। বিচার শুরুর আগে কোন ব্যক্তিকে জনসমক্ষে হেয় বা অপমান এই নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী। নতুন সরকারের প্রশাসনের তরফে আরো সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন। মানুষকে নীতি শিক্ষা দেওয়ার এই হাতে গরম পন্থা আসলে জনমানসে র মধ্যে উচ্ছৃংখলতা এবং নিজেই বিচার করে শাস্তি প্রদানের একটা মানসিকতা তৈরি করছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষককে প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া নাগরিকদের অবশ্য পালনীয় একটি কর্তব্য, কারণ আজকের শিশুরা আগামীর নাগরিক। শিক্ষকদের কোন সমস্যা থাকলে তার প্রতিবিধান আইন মেনে করা হোক। আবার অন্যদিকে দুর্নীতির সাথে যুক্ত থাকার অপরাধে গ্রেফতার হওয়া বিগত শাসকদলের নেতা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রের অপরাধের বিচার করার জন্য অপরাধীকে তার নাগরিক অধিকার সমেত দেশের বিচার ব্যবস্থার সামনে দাঁড় করিয়ে শাস্তি প্রদান করাই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আশা করব শাসনে বসার সাথে সাথেই যেভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিকে হিংসা মুক্ত করার জন্য শাসক শিবির চেষ্টা করেছিল, সেভাবেই সারা পশ্চিমবঙ্গে এই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে উচ্ছৃঙ্খলতা কে প্রশ্রয় না দিয়ে। নতুন সরকারের কাছে এটাই আমাদের আশা যেন বাস্তবায়ন হয় সবাইকে সাথে নিয়ে সবারই উন্নতির কর্মসূচি। 

Read More News

রেডিসন ব্লু হোটেলে এনডিএ বিধায়কদের ঐক্যের বার্তা, মক পোলের মাধ্যমে ভোটদান প্রশিক্ষণ

রাঁচি। ১৮ জুন ঝাড়খণ্ডে অনুষ্ঠিত হতে চলা রাজ্যসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এনডিএ শিবিরে উৎসাহ তুঙ্গে।...

Read More