সকাল সকাল ডেস্ক
শ্রীমতী অন্নপূর্ণা দেবী
দেশের যে কোনও গ্রাম, শহরতলি, বস্তি কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেলে আজ একটি পরিবর্তিত বাস্তবতা চোখে পড়ে। একসময় রান্নাঘরের চুলার কালো ধোঁয়া যে নববধূর চোখে জল আনত, আজ সেখানে উজ্জ্বলা যোজনার গ্যাসের নীল শিখা জ্বলছে। যে মা প্রতিদিন বহু দূর থেকে জল বহন করে আনতেন, আজ তাঁর বাড়ির আঙিনাতেই ‘হর ঘর জল’ প্রকল্পের কল থেকে বিশুদ্ধ পানীয় জল পৌঁছে যাচ্ছে। খোলা জায়গায় শৌচকর্মের যে বাধ্যবাধকতা একসময় নারীদের মর্যাদাকে আঘাত করত, আজ সেখানে স্বচ্ছ ভারত অভিযানের শৌচাগার সম্মানের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাথার উপর রয়েছে পাকা ছাদ, আর সেই বাড়ির মালিকানার নথিতে প্রথমবারের মতো নারীর নাম যুক্ত হয়েছে। হাতে রয়েছে জন-ধন অ্যাকাউন্টের পাসবই, আর মোবাইল ফোনে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা।
এ কোনও কল্পিত চিত্র নয়; বরং গত বারো বছরে নারী ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে দেশের বাস্তব অগ্রগতির প্রতিফলন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ‘নারী-নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন’-এর যে ধারণা সামনে এসেছে, তার ফলেই আজ ভারতীয় নারীরা বিকশিত ভারতের নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছেন।
এই পরিবর্তনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হলে আমাদের এক দশক পিছনে ফিরে তাকাতে হবে। একসময় মাতৃমৃত্যুর হার ছিল প্রতি লক্ষ জীবিত জন্মে ২১২। নারীর নিরাপত্তা ও সম্মান নিয়ে উদ্বেগ ছিল প্রবল। বহু গুরুত্বপূর্ণ আইন বছরের পর বছর ধরে ঝুলে ছিল। তিন তালাকের মতো সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য কোনও দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। রান্নাঘরের ধোঁয়া নারীদের স্বাস্থ্যকে বিপন্ন করত, আর জল সংগ্রহের কষ্ট ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। সেই সময় ভারতীয় নারী একটি নতুন সূচনার অপেক্ষায় ছিলেন।
আজ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক—জীবনের নিরাপত্তা—ক্ষেত্রেই অভূতপূর্ব অগ্রগতি ঘটেছে। দেশে মাতৃমৃত্যুর হার ২১২ থেকে কমে ৮৮-এ নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির তথ্য অনুযায়ী, যেখানে বিশ্বব্যাপী মাতৃমৃত্যুর হার কমার হার ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত, সেখানে ভারত এই ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের হার ৩৮.৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯০.৬ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী মাতৃ বন্দনা যোজনার মাধ্যমে কোটি কোটি মায়ের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিয়ে নিরাপদ মাতৃত্ব ও সুস্থ শিশুর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা জোরদার করা হয়েছে।
নারীদের মর্যাদা ও জীবনমান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। দেশে ১২ কোটিরও বেশি গার্হস্থ্য শৌচাগার নির্মিত হয়েছে, যা নারীদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করেছে। ১০.৫ কোটিরও বেশি পরিবার উজ্জ্বলা যোজনার সুবিধা পেয়েছে। একইসঙ্গে ১৬ কোটিরও বেশি পরিবারে নলবাহিত পানীয় জল পৌঁছে গেছে, যেখানে ২০১৪ সালে এই সুবিধা ছিল মাত্র ১৭ শতাংশ পরিবারের কাছে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার আওতায় নির্মিত প্রায় ৪ কোটি বাড়ির মধ্যে ৭৩ শতাংশ বাড়ির মালিকানায় নারীদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এই ঘটনা এক নতুন সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করেছে।
মর্যাদা থেকে এসেছে মালিকানা, আর মালিকানা থেকে জন্ম নিয়েছে আত্মবিশ্বাস। অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের এই যাত্রা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা তৈরির পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রায় ৫৬ কোটি জন-ধন অ্যাকাউন্টের মধ্যে ৫৬ শতাংশই নারীদের নামে। আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির মতে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের ব্যবধান প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভারত একটি অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
মুদ্রা যোজনার আওতায় প্রদত্ত ৫২ কোটিরও বেশি জামানত-মুক্ত ঋণের ৬৮ শতাংশ নারীদের কাছে পৌঁছেছে। স্ট্যান্ড-আপ ইন্ডিয়া কর্মসূচির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নারী উদ্যোক্তাদের প্রদান করা হয়েছে। দীনদয়াল অন্ত্যোদয় যোজনা–জাতীয় গ্রামীণ জীবিকা মিশনের অধীনে লক্ষ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী বিশাল আর্থিক সম্পদ গড়ে তুলেছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই ৩ কোটি নারী ‘লখপতি দিদি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীদের ক্রমবর্ধমান ভূমিকার প্রমাণ।
শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট। নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের হার ২০১৭-১৮ সালের ২৩.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩-২৪ সালে ৪১.৭ শতাংশে পৌঁছেছে। গ্রামীণ অঞ্চলে এই হার আরও বেশি। সুকন্যা সমৃদ্ধি যোজনার আওতায় কোটি কোটি কন্যাশিশুর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে বিপুল পরিমাণ সঞ্চয় জমা হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় লিঙ্গ সমতার সূচক একেরও বেশি হয়েছে, যা দেখায় যে মেয়েরা এখন উচ্চশিক্ষায় ছেলেদের সমান বা তারও বেশি অংশগ্রহণ করছে। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতভিত্তিক শিক্ষায়ও ভারতীয় কন্যাদের অংশগ্রহণ বিশ্বের সর্বোচ্চগুলির মধ্যে অন্যতম।
নারীদের এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক উত্থান রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হয়েছে। ২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো নারীদের ভোটদানের হার পুরুষদের ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ৩১ কোটিরও বেশি নারী ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, যা বিশ্বে নারীদের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই প্রেক্ষাপটেই বহু বছর ধরে ঝুলে থাকা নারী শক্তি বন্দন আইন সংসদে ঐতিহাসিকভাবে পাস হয়েছে। বর্তমানে তৃণমূল স্তরে ১৪.৫ লক্ষেরও বেশি নারী জনপ্রতিনিধি পঞ্চায়েত পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
নারীর নিরাপত্তা ও অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মুসলিম নারী বিবাহ অধিকার সংরক্ষণ আইন তিন তালাক প্রথার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্থাপিত একক সহায়তা কেন্দ্রগুলিতে সংকটাপন্ন নারীরা চিকিৎসা, আইনি সহায়তা ও মানসিক পরামর্শ পাচ্ছেন। নারী সহায়তা হেল্পলাইন ইতোমধ্যে লক্ষ লক্ষ নারীকে সহায়তা প্রদান করেছে। মিশন শক্তি, মিশন বাৎসল্য এবং সক্ষম অঙ্গনওয়াড়ির মতো কর্মসূচিগুলি নারী-নেতৃত্বাধীন ভারতের ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
তবে এই যাত্রা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। নারী ক্ষমতায়নের পথে নানা চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে এবং সরকার সেগুলি মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবুও আজ একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারতের নারী আর কেবল উন্নয়নের সুবিধাভোগী নন। তিনি নীতি প্রণয়নের অংশীদার, উন্নয়নের সহ-নির্মাতা এবং রাষ্ট্রগঠনের অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতীয় নারীরা আজ এমন এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন, যেখানে তাঁদের শক্তি, সক্ষমতা ও অংশগ্রহণই বিকশিত ভারতের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
No Comment! Be the first one.