সকাল সকাল ডেস্ক
সিদ্ধার্থ রায়, পাটনা
সময়টা ছিল ১৯৪২ সাল। রেঙ্গুন (বর্তমান মিয়ানমার) শহরের সবচেয়ে ধনী এলাকায় বিশাল প্রাসাদে বাস করতেন এক ভারতীয় পরিবার। বাবা ছিলেন সোনার খনির মালিক। জন্ম থেকেই মেয়েটি দেখেছে অঢেল সম্পদ। দামি গাড়ি, রেশমি পোশাক আর হীরা-জহরত—এটাই ছিল তার শৈশব। তার নাম সরস্বতী রাজামণি। সরস্বতী রাজামণির জন্ম ১৯২৭ সালে বার্মায়, তাঁর বাবা স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন কট্টর সমর্থক ছিলেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের গ্রেপ্তার এড়াতে তিনি বার্মায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। রাজমণির বয়স তখন মাত্র ১৫ বছর।কিন্তু নিয়তি তার জন্য রাজপ্রাসাদ নয়, লিখে রেখেছিল জঙ্গল আর বারুদের গন্ধ।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুঙ্গে থাকাকালীন রেঙ্গুনে এসেছেন ভারতের স্বাধীনতার শেষ আশা—নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু। হাজার হাজার মানুষের সামনে তিনি বজ্রকন্ঠ ঘোষণা করলেন— “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব”। সেদিন ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কিশোরী রাজামণির শরীরের রক্তে যেন আগুন ধরে গেল। তিনি সেই মুহূর্তেই নিজের গলার হার, হাতের বালা, কানের দুল—সব খুলে ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’–এর তহবিলে জমা দিয়ে দিলেন। এই উদার পদক্ষেপটি নেতাজির দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়নি, যিনি জিজ্ঞাসাবাদে জানতে পারেন যে রাজামণি রেঙ্গুনের অন্যতম ধনী ভারতীয়ের মেয়ে। পরের দিনই, তিনি সমস্ত গয়না ফেরত দেওয়ার জন্য রাজামণের বাড়িতে পৌঁছান।
পরদিন সকালে সেই বিশাল প্রাসাদের সামনে এসে দাঁড়াল এক সেনা জিপ। জিপ থেকে নামলেন স্বয়ং নেতাজি। তিনি এসেছিলেন সেই গয়নাগুলো ফেরত দিতে। তিনি ভেবেছিলেন, আবেগের বশে ছোট মেয়েটি ভুল করেছে, এত দামি গয়না দান করার বয়স তার নয়। কিন্তু নেতাজির চোখের দিকে তাকিয়ে রাজামণি যে উত্তর দিয়েছিলেন, তা ইতিহাস হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন— “নেতাজি, ওটা ভুল করে দিইনি। ওটা আমার দেশের জন্য দান। আর দান করা জিনিস আমি ফিরিয়ে নিই না।” রাজামণি একটি উদার পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন যেখানে মেয়েদের জন্য খুব একটা বিধিনিষেধ ছিল না। গভীর দেশপ্রেমিক এই মেয়েটির বয়স যখন মাত্র ১০ বছর তখন থেকেই সে শ্যুটিং এ দক্ষতা অর্জন করেছিল।
নেতাজি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তিনি মেয়েটির চোখে কোনো ভয় দেখলেন না, দেখলেন ইস্পাতের মতো জেদ। তিনি হাসলেন। নাম দিলেন—‘সরস্বতী’। আর বললেন, ‘তোমাকে আমার দলে চাই। কিন্তু বন্দুক হাতে নয়, তোমার কাজ হবে আরও কঠিন’। ‘রাজামণি’র মৃত্যু ও ‘মণি’র জন্ম হল। নেতাজির নির্দেশে শুরু হলো এক নতুন অধ্যায়। মেয়েদের লম্বা চুল কেটে ফেলা হলো। পরানো হলো ঢিলেঢালা শার্ট আর প্যান্ট। সরস্বতী রাজামণি হয়ে গেলেন—‘মণি’। তার সঙ্গী হলেন আরেক সাহসী মেয়ে—দুর্গা। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হলো গুপ্তচরবৃত্তির। সেসময়ে আজাদ হিন্দ ফৌজের গুপ্তচর বিভাগে নীরা আর্য, সরস্বতী রাজমণি, মনবতী আর্য এবং দুর্গা মল্লা-র মত নির্ভীক মেয়েরা জীবনকে বাজী রেখে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেদের উৎসর্গ করেছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, রাজমণিকে একজন কর্মীর ছদ্মবেশে কলকাতার ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিতে গুপ্তচর হিসেবে পাঠানো হয়েছিল যাতে তিনি ব্রিটিশদের গোপন তথ্য পেতে পারেন এবং আই এন এ-এর সাথে তা ভাগ করে নিতে পারেন। ১৯৪৩ সালে ভারতীয় সীমান্তে নেতাজির গোপন সফরের সময় নেতাজিকে হত্যার ব্রিটিশ পরিকল্পনা উন্মোচনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভাবা যায়? ১৫ বছরের এক কিশোরী, যে কয়েকদিন আগেও পালঙ্কে ঘুমাতো, সে এখন ব্রিটিশ মিলিটারির মেস-এ কাজ করছে ‘বয়’ হিসেবে! তাদের কাজ ছিল ব্রিটিশ অফিসারদের জুতো পালিশ করা, ঘর ঝাড়ু দেওয়া আর চা পরিবেশন করা। ব্রিটিশ জেনারেলরা ভাবত, এরা তো সাধারণ স্থানীয় বাচ্চা ছেলে, এরা ইংরেজির কী বুঝবে? তাই তাদের সামনেই চলত যুদ্ধের গোপন মিটিং। ম্যাপ খুলে তারা দেখাত—কোথায় আইএনএ-র ওপর বোমা ফেলা হবে, কোন রাস্তা দিয়ে রসদ যাবে।
প্রায় দুই বছর ধরে সরস্বতী রাজামণি এবং তার মহিলা সহকর্মীরা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য ছেলেদের ছদ্মবেশে নিজেদেরকে ধারণ করেছিলেন। আর ঘরের কোণে জুতো পালিশ করতে করতে ‘মণি’র কান খাড়া থাকত। তাঁর মস্তিষ্ক দ্রুত রেকর্ড করে নিত প্রতিটি তারিখ, প্রতিটি কোড। কাজ শেষ করে বাথরুমে গিয়ে চিরকুটে সব লিখে, রুটির ভেতর বা জুতোয় লুকিয়ে সেই খবর পৌঁছে দেওয়া হতো নেতাজির ক্যাম্পে। দিনের পর দিন, মৃত্যুর সাথে এই লুকোচুরি চলতে লাগল।
এল সেই কালরাত্রি: এক অসীম সাহসের রোমাঞ্চকর কাহিনী। গুপ্তচরের জীবন মানেই প্রতি মুহূর্তে ধরা পড়ার ভয়। একদিন সত্যি হলো সেই দুঃস্বপ্ন। রাজামণির সঙ্গী দুর্গা ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়ে গেলেন। খবর এল, তাঁকে মিলিটারি জেলে আটকে রাখা হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই তার ওপর অমানুষিক অত্যাচার শুরু হবে কথা বের করার জন্য। আইএনএ-র নিয়ম ছিল কঠোর—ধরা পড়লে নিজেকে শেষ করে দাও, কিন্তু ধরা দিও না। সবাই রাজমণিকে বলল, “পালিয়ে এসো, ওখানে গেলে তুমিও মরবে।” কিন্তু রাজমণি সেদিন বলেছিলেন— “আমার বন্ধু ধরা পড়েছে, আর আমি পালিয়ে আসব ? এটা আমি হতে দেব না।”
রাতের অন্ধকারে, ছেলেদের ছদ্মবেশে রাজমণি ঢুকে পড়লেন ব্রিটিশদের সেই কঠোর নিরাপত্তার দুর্গে। তিনি জানতেন প্রহরীদের দুর্বলতা। তিনি প্রহরীদের খাবারে ও চায়ে মিশিয়ে দিলেন শক্তিশালী আফিম। প্রহরীরা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন চাবি চুরি করে তিনি খুললেন দুর্গার সেলের দরজা।দুর্গাকে নিয়ে যখন তিনি জেলের পাঁচিল টপকাচ্ছেন, ঠিক তখনই বেজে উঠল সাইরেন। শুরু হলো সার্চলাইটের আলো আর এলোপাথাড়ি গুলি। অন্ধকারে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ মনে হলো আগুনের একটা গোলা এসে লাগল তার ডান পায়ে। একটা বুলেট রাজমণির পা ভেদ করে চলে গেছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে মাটি। যন্ত্রণায় শরীর দুমড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি থামলেন না। কারণ থামলেই মৃত্যু—শুধু নিজের নয়, তার বন্ধুরও।
আহত পায়ে, রক্তক্ষরণ হতে থাকা অবস্থায়, তিনি আর দুর্গা পাশের গভীর জঙ্গলে ঢুকে পড়লেন। ব্রিটিশ সৈন্যরা কুকুর নিয়ে তাদের খুঁজছে। বাঁচার জন্য রাজমণি আর দুর্গা একটি বিশাল গাছের ওপর চড়ে বসলেন। বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে— টানা তিন দিন (৭২ ঘণ্টা) সেই গাছের ওপর বসে ছিলেন তাঁরা। পায়ে গুলি, শরীর জ্বরে পুড়ছে, জল নেই, খাবার নেই। নিচে ব্রিটিশ পেট্রল ঘুরছে। একটু শব্দ হলেই সব শেষ। তিন দিন পর যখন ব্রিটিশরা হাল ছেড়ে চলে গেল, তখন তারা গাছ থেকে নেমে খোঁড়াতে খোঁড়াতে পৌঁছালেন আজাদ হিন্দ ফৌজের ক্যাম্পে।
আজাদ হিন্দ ক্যাম্পে ফিরে তিনি যন্ত্রণায় প্রায় অজ্ঞান, তখন তাঁকে দেখতে এলেন নেতাজি। ডাক্তাররা যখন তার পা থেকে বুলেট বের করলেন, নেতাজি সেই লড়াকু মেয়েটিকে স্যালুট করে বলেছিলেন— “আমি জানতাম না আমাদের বাহিনীতে এত বড় বারুদ লুকিয়ে আছে। তুমি ভারতের বীরাঙ্গনা, তুমি আমার ঝাঁসির রানি।” নেতাজি তাঁকে জাপানের সম্রাটের দেওয়া নিজের পিস্তল উপহার দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু রাজমণি চেয়েছিলেন শুধু দেশের স্বাধীনতা। রাজমণির সাহসিকতার জন্য, তাঁকে পদক দিয়ে সম্মানিত করা হয় এবং রেজিমেন্টে লেফটেন্যান্ট পদে প্রোন্নতি করা হয়।
বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া এক কিংবদন্তী নারীর নাম সরস্বতী রাজমণি। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু যে মেয়েটি দেশের জন্য নিজের যৌবন, রক্ত আর বাবার সম্পত্তি সব দিয়েছিলেন—দেশ কি তাকে মনে রেখেছিল ? না। ইতিহাসের বইয়ে তাঁর নাম জায়গা পায়নি। যে রাজমণি একসময় সোনার পালঙ্কে ঘুমাতেন, জীবনের শেষ কয়েকটা দশক তিনি কাটিয়েছেন চেন্নাইয়ের রায়পেট্টায়—এক কামরার এক জরাজীর্ণ ভাড়া বাড়িতে। চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। সরকার তাকে মুক্তিযোদ্ধার পেনশন দিতে অনেক দেরি করেছিল। তবুও তার কোনো অভিযোগ ছিল না।
২০০৪ সালে সুনামির সময় যখন সবাই সাহায্যের জন্য হাত পাতছিল, তখন এই বৃদ্ধা—যার নিজেরই ওষুধ কেনার টাকা ছিল না—তিনি তার পেনশনের জমানো টাকা দান করে দিয়েছিলেন ত্রাণ তহবিলে। সাংবাদিকরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনি কেন দিলেন ? আপনার তো নিজেরই কিছু নেই।” তিনি হেসে বলেছিলেন, “আমার রক্তে দেওয়া আছে। ছোটবেলায় সব দিয়েছিলাম দেশের স্বাধীনতার জন্য, আর আজ দিলাম দেশের মানুষের জন্য।”
তবে, সময়ের সাথে সাথে সাহসিকতার এই গল্পগুলি ম্লান হয়ে যায়। স্বাধীনতার পর, এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা শীঘ্রই ভারতের বিভিন্ন কোণে বসবাস করতে শুরু করেন, জরাজীর্ণ জীবনযাপন করেন, কেউ কেউ সরকারি সহায়তা পেয়েছিলেন আবার কেউ কেউ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন অথবা সময়ের সাথে সাথে স্বীকৃতি পাননি। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা বলতে গিয়ে, আমরা বিশিষ্ট পুরুষ ব্যক্তিত্বদের দিকে ঝুঁকে পড়ি, এবং যারা কেবল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধেই নয়, বরং সমুদ্র পেরিয়ে তাদের আনা পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও লড়াই করেছিলেন, তারা ধীরে ধীরে আমাদের বই এবং মন থেকে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে।
রাজমণির জন্যও একই রকম ভাগ্য অপেক্ষা করছিল! সময়ের সাথে সাথে, তাকে ভুলে যাওয়া হয়েছিল এবং তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ের এক কোণে কেবল স্বাধীনতা সংগ্রামীর পেনশনের উপর বসবাস করতে শুরু করেছিলেন। অনেক পরে তামিলনাড়ু সরকার তাকে স্বীকৃতি দেয় এবং শহরে তার উন্নত আবাসন সুবিধা বরাদ্দ করে, যেখানে তিনি ২০১৮ সালে ৯১ বছর বয়সে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত বসবাস করেছিলেন।নীরবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ভারতের এই অগ্নিকন্যা। কোনো রাষ্ট্রীয় শোক পালন হয়নি, টিভি চ্যানেলগুলোতে ব্রেকিং নিউজ হয়নি। কিন্তু আজ যখন আমরা স্বাধীন ভারতের আকাশ দেখি, আমাদের মনে রাখা উচিত— এই স্বাধীনতার দাম চুকিয়েছিল ১৫ বছরের এক কিশোরী, তাঁর রক্ত আর ত্যাগের বিনিময়ে।
তাঁর নাম সরস্বতী রাজামণি। তাকে মনে রাখবেন। কারণ ইতিহাস তাকে ভুলে গেলেও, তাঁর ঋণ আমরা শোধ করতে পারব না। ইতিহাস যেভাবেই হোক নারীদের ভুলে যায়। অনেক নায়িকা, যারা কঠিন সময়ে পুরুষদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হেঁটেছেন, তাঁরা এখনও অন্ধকারে রয়ে গেছেন, তাঁদের মুখ ভুলে গেছেন এবং তাঁদের সাহসিকতা অধরা রয়ে গেছে। সরস্বতী রাজামণি হলেন এমনই একজন নায়িকা, যার ব্যতিক্রমী সাহস এবং বুদ্ধিমত্তা দেশের স্বীকৃতি এবং সম্মানের দাবি রাখে।
No Comment! Be the first one.