সকাল সকাল ডেস্ক
তেহরান: ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধে’ কোনও প্রতিবেশী দেশ যোগ দিলে তাকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হবে। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলেও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসেন রেজাই শনিবার দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
রেজাইয়ের বক্তব্য, ইরানের অর্থনীতিকে দুর্বল করার মার্কিন প্রচেষ্টায় কোনও আঞ্চলিক দেশ সহযোগিতা করলে তার পরিণতি ভোগ করতে হবে। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলিকে আমেরিকার অর্থনৈতিক অভিযানে যোগ না দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে তেহরান। তা না হলে তাদের শত্রু হিসেবে গণ্য করা হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারির মধ্যেই রেজাইয়ের এই মন্তব্য সামনে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক অভিযান চালানোর ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে ইরানকে অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া দেশগুলিকেও গুরুতর পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ওয়াশিংটন।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও অন্য দেশগুলিকে ওয়াশিংটনের অবস্থানের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলির ওপর চাপ আরও বাড়ছে।
তিন ধাপে পদক্ষেপের বার্তা
রেজাই জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশগুলিকে নিয়ে ইরানের কৌশল তিনটি পর্যায়ে এগোবে। প্রথমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলির সঙ্গে আলোচনা করবে তেহরান। দ্বিতীয় পর্যায়ে তাদের আমেরিকার অর্থনৈতিক অভিযান থেকে দূরে থাকার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করা হবে। এরপরও কোনও দেশ ওয়াশিংটনের পাশে থাকলে তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য কিছুটা সময় দেওয়া হবে।
তবে তৃতীয় পর্যায়ে ইরান ‘ব্যবস্থা নেবে’ বলে সতর্ক করেছেন রেজাই। তাঁর দাবি, তেহরান সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে চায় না। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অভিযানে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করা হলে পালটা পদক্ষেপের পথ খোলা থাকবে।
অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগ
রেজাইয়ের অভিযোগ, সামরিক অভিযানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে ইরানের অভ্যন্তরে অসন্তোষ বাড়ানোই ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম লক্ষ্য। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করলে ইরানের অভ্যন্তরীণ ঐক্য দুর্বল হবে—ওয়াশিংটন এমন কৌশল নিয়েছে বলে দাবি তাঁর।
এই প্রসঙ্গে মার্কিন এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরি করা গেলে তা কার্যত সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্যকেই সহজ করে দেবে।
হরমুজের বিকল্প পথও কি নিশানায়?
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরান ও আমেরিকার দীর্ঘদিনের বিরোধের মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে রেজাইয়ের আরেকটি হুঁশিয়ারি। পারস্য উপসাগরের তেল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহণের জন্য হরমুজ বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ।
সংঘাতের কারণে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দামেও প্রভাব পড়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।
রেজাই সতর্ক করেছেন, আঞ্চলিক দেশগুলি যদি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অর্থনৈতিক অভিযানে অংশ নেয়, তাহলে পারস্য উপসাগরের বাইরে থাকা বিকল্প তেল পরিবহণ ব্যবস্থাও ইরানের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে।
ইউরোপের মার্কিন মিত্রদের নিয়েও জল্পনা
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও ওয়াশিংটনের নতুন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছে। তেহরানের অভিযোগ, অন্য রাষ্ট্রগুলির ওপর নিজেদের নীতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে আমেরিকা।
এরই মধ্যে কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরান সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর পরিধি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও সম্প্রসারণের কথা বিবেচনা করছে। ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক ও সামরিক কৌশলকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করা ইউরোপের মার্কিন মিত্রদের স্বার্থও সম্ভাব্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এমন কোনও হামলার বিষয়ে তেহরানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের কথা এখনও নিশ্চিতভাবে জানানো হয়নি।
সব মিলিয়ে সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি ইরান ও আমেরিকার অর্থনৈতিক লড়াইও ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। বিশেষ করে তৃতীয় দেশগুলিকে নিজেদের পক্ষে টানতে ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টা এবং তার পালটা হিসেবে তেহরানের হুঁশিয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও নতুন করে উত্তেজনা ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে।
No Comment! Be the first one.