প্রাচীন ভারতে নগরবধূর এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস

সিদ্ধার্থ রায়, পাটনা

বৈশালী জেলা প্রাচীন ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান, যা বিশ্বের প্রথম প্রজাতন্ত্র হিসেবে পরিচিত, মহাবীরের জন্মস্থান, বুদ্ধের শেষ ধর্মোপদেশের স্থান, এবং বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের জন্য পবিত্র। এই জেলাটি তার ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি কলা ও লিচুর জন্যও বিখ্যাত। প্রাচীন ভারতের গণতান্ত্রিক শহর বৈশালী বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্যের অর্ন্তগত। সে সময়ের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী এবং নর্তকী আম্রপালী বাস করতেন এই বৈশালী শহরে। আম্রপালীর জন্ম হয় আজ থেকে ২,৫০০ বছর আগে। মাহানামন নামে এক ব্যক্তি শিশুকালে আম্রপালীকে আম গাছের নিচে খুঁজে পান। তাঁর আসল বাবা-মা কে ইতিহাস ঘেঁটেও তা জানা যায়নি । যেহেতু তাকে আম গাছের নিচে পাওয়া যায় তাই তার নাম রাখা হয় আম্রপালী। অর্থাৎ আমগাছের নবীন পাতা। মাহানমন পেশায় মালী ছিলেন, তিনি ও তাঁর স্ত্রী আম্রপালীকে লালন পালন করেন।

শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা দিতেই আম্রপালীকে নিয়ে হইচই পড়ে যায়। তাঁর রূপে চারপাশের মানুষ বিস্মিত ও মুগ্ধ হয়ে যান । দেশ-বিদেশের রাজা, রাজপুত্র থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ তাঁকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে ওঠে। নানা জায়গায় থেকে তাকে নিয়ে দ্বন্দ, ঝগড়া আর বিবাদের খবরও আসতে থাকে। সবাই তাকে একনজর দেখতে চান, বিয়ে করতে চান।
ইতিহাস বলে বৈশালির রাজা মনুদেব যখন আম্রপালিকে প্রথম দেখেন তখন থেকেই তিনি তাকে “নিজের” অধিকারে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করতে শুরু করেন। তিনি আম্রপালির বিয়ের দিন আম্রপালির শৈশব প্রেম এবং হবু বর পুষ্পকুমারকে হত্যা করেন এবং এরপর রাজার নির্দেশে বৈশালীর সকল ক্ষমতাবান ও ধনবান ব্যক্তি মিলে আম্রপালিকে নিয়ে বৈঠকে বসেন।

নানা আলোচনার পর তৎকালীন বৈশালীর ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা যে সিদ্ধান্ত নেন তা হল, আম্রপালীকে কেউ বিয়ে করতে পারবেন না। কারণ তার রুপ। সে একা কারো হতে পারে না। আম্রপালী হবে সবার। সে হবে একজন নগরবধু, মানে পতিতা। এটা ছিল একটা বিস্ময়কর ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত । ইতিহাসে এভাবে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে কাউকে পতিতা বানানো হয়েছে এমন সিদ্ধান্ত খুবই বিরল ! একটি সরকারী ঘোষণায় আম্রপালিকে বৈশালীর নগরবধূ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তাঁকে সাত বছরের জন্য রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দরী ও মেধাবী মেয়েদের জন্য নির্ধারিত বৈশালী জনপদ কল্যায়নী উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল। আম্রপালী তার প্রেমিকদের নির্বাচন করতে পারতেন কিন্তু পূর্বোক্ত রীতি অনুসারে তিনি কোনও একজনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে পারতেন না।

আম্রপালীকে নগরবধূ করার জন্য সে সভায় পাঁচটি শর্ত রাখা হয়েছিল :- (১) নগরের সবচেয়ে সুন্দর জায়গায় তার ঘর হবে ।(২) তার মুল্য হবে প্রতি রাত্রির জন্য পাঁচশত স্বর্ণমুদ্রা । (৩) একবারে মাত্র একজন তাঁর গৃহে প্রবেশ করতে পারবেন। (৪ ) শক্র বা কোন অপরাধীর সন্ধানে প্রয়োজনে সপ্তাহে সর্বোচ্চ একবার তাঁর গৃহে প্রবেশ করা যাবে। (৫) তাঁর গৃহে কে এলেন আর কে গেলেন- এ নিয়ে কোন অনুসন্ধান করা যাবে না। সবাই এসব শর্ত মেনে নেন। এভাবে দিনে দিনে আম্রপালী বিপুল ধন-সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। তার রুপের কথাও দেশ-বিদেশে আরও বেশী করে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

প্রাচীন ভারতের মগধ রাজ্যের রাজা ছিলেন বিম্বিসার। কথিত রয়েছে যে রাজার স্ত্রীর সংখ্যাও নাকি অনেক ছিল ! নর্তকীদের নাচের এক অনুষ্ঠানে তিনি এক নর্তকীর নাচ দেখে বলেছিলেন, এ নর্তকী বিশ্বসেরা ।তখন তার একজন সভাসদ বলেন- মহারাজ, এই নর্তকী আম্রপালীর নখের যোগ্য নয় ! বিম্বিসারের এই কথাটি নজর এড়ায়নি । তিনি তার সেই সভাসদের থেকে আম্রপালী সম্পর্কে বিস্তারিত শুনে তাকে কাছে পাবার বাসনা করেন। কিন্তু তার সভাসদ বলেন, সেটা সম্ভব নয় । কারণ, তাহলে আমাদের যুদ্ধ করে বৈশালী রাজ্য জয় করতে হবে আর আম্রপালীর দেখা পাওয়াও এত সহজ নয়। দেশ-বিদেশের বহু রাজাসহ রাজপুত্ররা আম্রপালীর প্রাসাদের সামনে তার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। কিন্তু মন না চাইলে তিনি কাউকে দেখা দেন না। একথা শুনে বিম্বিসারের আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ছদ্মবেশে বৈশালী রাজ্যে গিয়ে আম্রপালীকে দেখে আসবেন। কি এমন আছে সেই নারীর মাঝে, যার জন্য পুরো পৃথিবী পাগল হয়ে আছে !

তারপর বহু চড়াই উৎরাই শেষে রাজার আম্রপালীর সাথে দেখা করার সুযোগ হয়। আম্রপালীর প্রাসাদ আম্রকুঞ্জে। কিন্তু দেখা করতে গিয়ে রাজা চমকে উঠেন, এত কোন নারী নয় ; যেন সাক্ষাৎ পরী ! এ কোনভাবেই মানুষ হতে পারেন না। এত রুপ মানুষের কিভাবে হতে পারে ! কিন্তু অবাক রাজার জন্য আরও অবাক কিছু অপেক্ষা করছিল। কারণ, আম্রপালী প্রথম দেখাতেই তাঁকে মগধ রাজ্যের রাজা বলে চিনে ফেলেন এবং জানান- তিনি তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন বহু আগে থেকেই। এই কথা শুনে রাজার বিস্ময়ের সীমা থাকে না। রাজা সাথে সাথে তাঁকে তাঁর রাজ্যের রাজরাণী বানানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু আম্রপালী জানান, তাঁর রাজ্যের মানুষ এটা কখনোই মেনে নেবেন না। উল্টো বহু মানুষের জীবন যাবে এবং রক্তপাত ঘটবে ! তাই রাজাকে দ্রুত এখান থেকে চলে যেতে বলেন। কিন্তু বিম্বিসার বৈশালী আক্রমন করে আম্রপালীকে পেতে চান। ওদিকে আম্রপালী তাঁর নিজের রাজ্যের কোন ক্ষতি চান না। তাই তিনি কিছুদিন অবস্থানের পর রাজাকে তাঁর নিজ রাজ্যে ফেরত পাঠান এবং বৈশালীতে কোন আক্রমণ হলে তিনি তা মেনে নেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন।

পরবর্তীতে ইতিহাস জানান দেয় যে বিম্বিসারের পুত্র অজাতশত্রুও আম্রপালীর প্রেমে মগ্ন ছিলেন । তিনি বিম্বিসারকে আটক করে নিজে সিংহাসন দখল করে বসেন এবং আম্রপালীকে পাওয়ার জন্য বৈশালী রাজ্য আক্রমণ করে বসেন। কিন্তু দখল করতে সক্ষম হননি এবং খুব বাজেভাবে আহত হন। যুদ্ধের পর দেশের এহেন অবস্থায় বিধ্বস্ত হয়েছিলেন বৈশালীর নগরবধূ
কিন্তু তবু তিনি মগধ রাজ অজাতশত্রুর কুক্ষিগত হননি কভূ। পরবর্তীতে আম্রপালীর সেবায় সুস্থ হয়ে গোপনে তার নিজের রাজ্যে ফেরত যান। সেদিনও আম্রপালী অজাতশত্রুর বিয়ের প্রস্তাব সবিনয়ে ফিরিয়ে দেন। অজাতশত্রুর সাথে যুদ্ধে ধ্বংসলীলার পর ফের মাথা তুলে দাঁড়ায় বৈশালী। ধীরে ধীরে আবার স্বস্থির জীবন কাটাতে থাকেন আম্রপালী।

আম্রপালীর জীবনে একের পর এক বৈচিত্রতা ও নাটকীয়তার পর শেষের দিকে এক প্রগাঢ় শান্তি ও উপাসনায় মগ্ন জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তখন গৌতম বুদ্ধর সময়কাল। গৌতম বুদ্ধ তার কয়েকশ সঙ্গী নিয়ে বৈশালী রাজ্যে এলেন। একদিন নিজের মহলের বারান্দা থেকে এক বৌদ্ধ তরুণ সন্ন্যাসীকে দেখে আম্রপালীর মনে ধরে গেল । তিনি ভাবলেন, দেশ-বিদেশের রাজারা আমার পায়ের কাছে এসে বসে থাকেন আর এত সামান্য একজন মানুষ। তিনি সেই সন্ন্যাসীকে চার মাস তার কাছে রাখার জন্য গৌতম বুদ্ধকে অনুরোধ করলেন। সবাই ভাবলেন, বুদ্ধ কখনই রাজি হবেন না। কারণ, একজন সন্ন্যাসী এমন একজন পতিতার কাছে থাকবেন ; এটা হতেই পারে না। কিন্তু গৌতম বুদ্ধ তাকে রাখতে রাজি হলেন এবং এটাও বললেন, আমি ‘শ্রমণ’ এর (তরুণ সে সন্ন্যাসীর নাম ছিল) চোখে কোন কামনা-বাসনা দেখছি না । সে চার মাস থাকলেও নিষ্পাপ হয়েই ফিরে আসবে- এটা আমি নিশ্চিত !

চার মাস শেষ হল। গৌতম বুদ্ধ তার সঙ্গীদের নিয়ে চলে যাবেন। তরুণ শ্রমণের কোন খবর নেই । তবে কি আম্রপালীর রুপের কাছেই হেরে গেলেন শ্রমণ ? সেদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে তরুণ শ্রমণ ফিরে আসেন। তার পিছনে পিছনে আসেন একজন নারী । সেই নারীই ছিলেন আম্রপালী। আম্রপালী তখন বুদ্ধকে বলেন, তরুণ শ্রমণকে প্রলুব্ধ করতে কোনও চেষ্টা বাকি রাখেননি তিনি। কিন্তু এই প্রথম কোন পুরুষকে বশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন বৈশালীর নগরবধূ আম্রপালী। তাই আজ সর্বস্ব ত্যাগ করে বুদ্ধের চরণে আশ্রয় চান তিনি। বুদ্ধের সম্মতি পাওয়ার পরে নিজের স্থাবর অস্থাবর সব কিছু দান করে বাকী জীবন গৌতম বুদ্ধের চরণেই কাটিয়ে দেন ইতিহাস বিখ্যাত রমণী আম্রপালী। আম্রপালীর একটি পুত্র ছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে। এই প্রসঙ্গে বর্ণিত রয়েছে যে আম্রপালী ও বিম্বিসার পরস্পরের প্রেমে পড়েছিলেন এবং বিম্বিসার আম্রপালীর মহলে কিছুদিন অতিবাহিত করেছিলেন। পুত্রটি আম্রপালী ও বিম্বিসারের এবং তাঁর নাম ছিল বিমল কোন্দনা যিনি বড়ো হয়ে একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এবং পরবর্তীতে একজন বিখ্যাত প্রচারক হয়ে খ্যাতি লাভ করেছিলেন।

বৌদ্ধ গ্রন্থে, আম্রপালীর একাধিক বিবরণ বর্ণিত রয়েছে। আম্রপালীর ইতিহাস গণিকাদের সমসাময়িক মনোভাব বোঝার জন্য তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও তিনি একজন প্রতিভাবান শিল্পী হিসেবে অনেক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বৈশালীর সম্ভ্রান্ত রাজকুমাররা তাকে ” গণিকা ” বলে অভিহিত করেছিলেন, যার অবমাননাকর অর্থ ছিল। তবে, তাদের বিপরীতে, বুদ্ধ তাঁর প্রতি এই ধরণের পক্ষপাত প্রদর্শন করেননি। তিনি তাঁর বাসভবনে আহার করেছিলেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের ধর্মপোদেশের জন্য তার বন গ্রহণ করেছিলেন। এটি প্রায়শই নারীদের প্রতি তাঁর নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ হিসাবে উদ্ধৃত করা হয়। বুদ্ধের উপদেশ অনুসরণ করে তিনি আরহান্ত হয়েছিলেন। পুরাতন পালি গ্রন্থ এবং বৌদ্ধ রীতিনীতিতে (আগাম সূত্র) তাঁর উল্লেখ রয়েছে, বিশেষত বুদ্ধের সাথেই তাঁর সংবাদ এর উল্লেখ পাওয়া যায়। আম্রপালির নিমন্ত্রণে শিষ্যসহ
আম্বপালি উদ্যানে অবস্থান করেছিলেন বুুুদ্ধ। পরে আম্রপালি উদ্যানটি দান করেছিলেন এবং সেখানে বুদ্ধ তার বিখ্যাত আম্বপালিকা সূত্র প্রচার করেছিলেন।

আম্রপালির জীবনী নিয়ে তিনটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে: আম্রপালি (১৯৪৫), আম্রপালি (১৯৫৯), এবং আম্রপালী (১৯৬৬)। বলিউড অভিনেত্রী হেমা মালিনী প্রযোজিত, পরিচালিত এবং অভিনীত টেলিভিশন সিরিজ উইমেন অফ ইন্ডিয়ায় আম্রপালির গল্পটি চিত্রায়িত করা হয়েছিল। আম্রপালী বিভিন্ন গ্রন্থের বিষয়বস্তুও হয়েছিলেন, যার মধ্যে আচার্য চতুরসেনের ১৯৪৮ সালের হিন্দি উপন্যাস ‘বৈশালী কি নগরবধূ’, এবং বিমলা রায়নার ১৯৬২ সালের উপন্যাস ‘আম্বাপালি’ সহ বিভিন্ন বই ছিল। ইংরেজিতে একটি সাম্প্রতিক কাজ, দ্য লিজেন্ড অফ আম্রপালি : এন এনচ্যান্টিং সাগা ব্যারিড উইদিন দ্য স্যান্ডস অফ টাইম নামে, লেখক : অনুরাগ আনন্দ। আম্রপালি নামে একটি টেলিভিশন সিরিজ ২০০২ সালে ডিডি ন্যাশনালে প্রচারিত হয়েছিল। ঐতিহাসিক ইরা মুখোতির লেখা ‘হিরোইনস’ গ্রন্থেও আম্রপালির উল্লেখ রয়েছে। আম্রপালীকে চিরস্মরণীয় রাখতে ১৯৭৮ সালে ভারতের আম গবেষকরা ‘দশোহরি’ ও ‘নিলম’- এই দু’টি আমের মধ্যে সংকরায়ণের মাধ্যমে এক নতুন জাতের আম উদ্ভাবন করেন এবং নাম রাখেন ‘আম্রপালী’ ।

Read More News

Read More