উজ্জ্বল কুমার দত্ত -(কুমারডুবি, ঝাড়খন্ড)
শরৎশেষের নির্মল আকাশ, নিস্তব্ধ রাতের মৃদুমন্দ বাতাস, পূর্ণিমার মায়াময় আলো—এই ত্রয়ীর মিলনেই আসে কোজাগরী পূর্ণিমা। বাঙালির চেতনায় এই দিনটির অন্যরকম আবেদন আছে। দুর্গোৎসবের মহাধারার শেষে বিজয়ার বিষণ্নতার পর যে পরিতৃপ্তি ও আশাবাদ বাঙালির গৃহে নেমে আসে, তার নাম কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। পাকা ধানের গন্ধে ভরা উঠোনে, আলপনায় সেজে ওঠে সংসারের প্রতিটি কোণ। এই পূজায় দেবী লক্ষ্মী আর শুধু দেবী নন, তিনি গৃহিণীর প্রতীক, সংসারের মমতার কেন্দ্র, বাঙালির চিরন্তন সমৃদ্ধির স্বপ্ন।
লক্ষ্মীপূজার উৎস খুব প্রাচীন। বেদের যুগে ‘শ্রী’ ও ‘লক্ষ্মী’ নামে দুটি পৃথক দেবীর উল্লেখ আছে। শ্রী ছিলেন সৌন্দর্যের প্রতীক, আর লক্ষ্মী ছিলেন সম্পদ ও কল্যাণের দেবী। পরে পুরাণযুগে এই দুই দেবী এক হয়ে যান, এবং সমুদ্র মন্থনের সময় দেবতাদের হাতে যে দেবী উঠেছিলেন, তিনি-ই লক্ষ্মী। বলা হয়, এই দিনটিই ছিল পূর্ণিমা অর্থাৎ আজকের কোজাগরী পূর্ণিমা। দেবতারা যখন অমৃত পেলেন, তখন দেবী লক্ষ্মী তাঁদের মধ্যে শান্তি, ঐশ্বর্য ও সৌভাগ্য বর্ষণ করেছিলেন। সেই থেকেই এই দিনে সম্পদের দেবীকে আহ্বান জানানো হয়, যাতে গৃহে স্থিতি ও শান্তি বজায় থাকে।
‘কোজাগরী’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়েও মজার ব্যাখ্যা আছে। ‘কে জাগর?’—এই প্রশ্ন থেকেই ‘কোজাগরী’। বিশ্বাস, এই রাতে দেবী আকাশে ভেসে বেড়ান, এবং প্রশ্ন করেন—“কে জাগর?” অর্থাৎ কে জেগে আছে। যিনি জেগে পূজা করেন, দেবী তাঁর গৃহে প্রবেশ করে আশীর্বাদ বর্ষণ করেন। তাই অনেক বাঙালি এই রাতে গৃহের আলোক নেভায় না। ঘরে ঘরে ধানের মঞ্জরী, কড়ি, পদ্ম, ও পূর্ণ ঘট সাজানো হয়। নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ সকলে একসঙ্গে জেগে থাকে, মন্ত্রপাঠ ও স্তোত্র পাঠ করে। দেবী লক্ষ্মী যেন তাঁদের গৃহে পদার্পণ করেন—এই প্রত্যাশায় রাত কাটে প্রার্থনা ও আলোর উৎসবে।
তবে এই পূজা শুধু ধনসম্পদের আহ্বান নয়, এটি এক ধরনের গৃহস্থের আধ্যাত্মিক সাধনা। দুর্গাপূজায় দেবী ছিলেন শক্তির প্রতীক, মহিষাসুরমর্দিনী। কিন্তু কোজাগরীতে তিনি মমতার প্রতীক, সংসারের অন্তরঙ্গ দেবী। এ যেন শাক্ত ও বৈষ্ণব ভাবধারার এক চিরন্তন মিলন। দুর্গা যেখানে যুদ্ধের রূপ, লক্ষ্মী সেখানে শান্তির প্রতীক। বাংলার গৃহিণীরা তাই এই পূজায় নিজের সত্তাকেই দেবী রূপে উপলব্ধি করেন। তাঁর আলপনায় আঁকা পদচিহ্ন শুধু দেবীর পদযুগল নয়; গৃহিণীর শ্রম, ভালোবাসা ও সংসার রক্ষার প্রতীক।
লোকসংস্কৃতিতেও লক্ষ্মীর এই মানবিক রূপ স্পষ্ট। অনেক জায়গায় তাঁকে ধানের দেবী বলা হয়, কারণ কৃষিনির্ভর সমাজে ধানই ছিল জীবনের মূল ভরসা। তাই ক্ষেতের ধান ঘরে তোলার পরই লক্ষ্মীপূজা হয়—অর্থাৎ শস্যদায়িনীর আরাধনা। পদ্মফুল, কড়ি, পেঁচা—সবকিছুরই রয়েছে গভীর প্রতীকী অর্থ। পদ্ম প্রজননের প্রতীক, কড়ি সমুদ্রজাত সম্পদের ইঙ্গিত, আর পেঁচা নিশাচর প্রহরী, শস্যক্ষেত্রের রক্ষক। এ যেন প্রকৃতি ও মানবজীবনের বন্ধনকে দেবীর মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া।
বাঙালি সমাজে লক্ষ্মীর অবস্থানও অন্যরকম। তিনি কারও স্ত্রী নন, বরং তিনি গৃহিণীস্বরূপা মা। বাংলার লোককথা বলে, তিনি দুর্গা ও শিবের কন্যা, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের বোন। এই পারিবারিক ধারণা লক্ষ্মীকে বাঙালির হৃদয়ের খুব কাছাকাছি এনেছে। তিনি কেবল ধনদায়িনী দেবী নন, তিনি পরিবারের সৌহার্দ্য, স্নেহ ও ঐক্যের প্রতীক। তাই কোজাগরীর পূর্ণিমায় বাংলার প্রতিটি ঘরে এক অদ্ভুত অন্তরঙ্গতার আবহ ছড়িয়ে পড়ে।
লক্ষ্মীপূজার আচারেও এই গৃহস্থ সংস্কৃতির ছাপ গভীর দেখা যায়। ধান, দুধ, দই, ফল, মিষ্টি, পিঠে—সবই বাংলার ঘরের উপাদান। দেবীকে তুষ্ট করার এ কোনো রাজকীয় আয়োজন নয়; বরং একান্তভাবে গৃহজীবনের সরল উপহার। সন্ধ্যার পর প্রদীপ জ্বেলে গৃহিণী যখন দেবীর আরাধনা করেন, তখন মনে হয় যেন প্রতিটি ঘর এক একটি মন্দির। আলপনায় আঁকা পদ্ম আর পদচিহ্ন যেন মাটির ঘরে দেবীর অবতরণের প্রতীক।
আধুনিক সমাজে যখন ভোগবাদ ও প্রতিযোগিতা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে পড়েছে, তখন কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার বার্তা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। এই পূজা আমাদের শেখায় যে সম্পদ তখনই শুভ হয় যখন তা সততার পথে অর্জিত ও সবার মঙ্গলে ব্যয়িত হয়। আজকের দিনে ‘লক্ষ্মী’ শব্দটি শুধু অর্থে সীমাবদ্ধ নয়; এটি শ্রম, নৈতিকতা, ও মমতার প্রতীক। গৃহিণী থেকে কৃষক, শ্রমিক থেকে ব্যবসায়ী—যাঁরা পরিশ্রম করে সংসার ও সমাজ চালান তাঁরা-ই আসলে এই দেবীর বাস্তব প্রতিমূর্তি।
বাংলা সাহিত্যে এই ভাবনার প্রতিফলনও বহুবার ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “লক্ষ্মী যখন আসবে, তখন কোথায় তারে দিবি রে ঠাঁই, পদ্মটি নাই।” এখানে পদ্ম শুধু ফুল নয়, মাতৃস্তন্যের প্রতীক যা দেবীকে মায়ে রূপান্তরিত করে তোলে। শরৎচন্দ্র বা তারাশঙ্করের গৃহিণীরাও এই ‘লক্ষ্মী’ রূপেরই প্রতিরূপ যাঁরা সংসারের মমতায়, পরিশ্রমে, ত্যাগে, আশ্রয়ে দেবীতুল্য হয়ে ওঠেন।
আজও বাংলার গ্রামে যখন কোজাগরীর রাতে চাঁদের আলোয় জোছনা ছড়িয়ে পড়ে, আর উঠোনে ধানের মঞ্জরীর গন্ধে ভরে ওঠে বাতাস, তখন মনে হয় এই প্রাচীন পূজা যেন সময়ের সীমা ছাপিয়ে চলেছে। এখানে নেই জাঁকজমক, নেই আর্তি বা ভয়, আছে শুধু মমতা, শ্রম, আর আশীর্বাদের নিরবচ্ছিন্ন স্রোত।
অবশেষে বলা যায়, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা কেবল এক ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাঙালির সংসারসংস্কৃতির আত্মা। এই পূজা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সমৃদ্ধি শুধু অর্থের প্রাচুর্যে নয়, স্নেহ, সততা ও সাম্যের মধ্যে নিহিত থাকে। দেবী লক্ষ্মী তাই কেবল গৃহদেবী নন; তিনি জীবনদেবী – যাঁর আলোয় জেগে থাকে বাঙালির ঘর, মন ও মনন।
(মতামত ব্যক্তিগত)
No Comment! Be the first one.