মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঘোষণা—ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন, অবিলম্বে কমবে শুল্ক

সকাল সকাল ডেস্ক

ওয়াশিংটন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তি (ট্রেড ডিল) সম্পন্ন হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় দুই দেশ একে অপরের পণ্যের উপর আরোপিত শুল্ক তাৎক্ষণিকভাবে কমাবে। ট্রাম্প তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র এবং সম্ভবত ভেনেজুয়েলা থেকে বেশি পরিমাণে তেল কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

সোমবার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর ট্রুথ সোশ্যাল পোস্টে ট্রাম্প বলেন, চুক্তির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মোদি আরও বেশি পরিমাণে মার্কিন পণ্য কেনার বিষয়েও সম্মত হয়েছেন।


ট্রাম্পের ঘোষণার সম্পূর্ণ বিবরণ

সিএনবিসি-র প্রতিবেদনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পূর্ণ ঘোষণাটি সম্প্রচার করা হয়েছে। সেখানে তিনি বলেন—

“আজ সকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে কথা বলে খুব ভালো লেগেছে। তিনি আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধুদের একজন এবং তাঁর দেশের একজন শক্তিশালী ও সম্মানিত নেতা। আমরা অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি, যার মধ্যে বাণিজ্য এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি রুশ তেল কেনা বন্ধ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সম্ভবত ভেনেজুয়েলা থেকে অনেক বেশি পরিমাণে তেল কিনতে সম্মত হয়েছেন। এতে ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধ শেষ করতে সাহায্য হবে, যেখানে প্রতি সপ্তাহে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন।

প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে এবং তাঁর অনুরোধে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে একটি বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হয়েছি, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশ করবে। একইভাবে ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তার শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনবে।

প্রধানমন্ত্রী ৪৬ লক্ষ কোটি টাকা (৫০০ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের মার্কিন জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য, কয়লা ও আরও নানা পণ্য কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, পাশাপাশি ব্যাপকভাবে ‘বাই আমেরিকান’ নীতিতে অংশ নেওয়ার কথাও বলেছেন। ভারতের সঙ্গে আমাদের দুর্দান্ত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হবে। প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং আমি এমন দুই মানুষ, যারা কাজ শেষ করি—যা অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে বলা যায় না। এই বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”


হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নেই

ট্রাম্পের ঘোষণায় বলা হয়েছে, ফোনালাপে হওয়া এই সমঝোতাগুলি কোনো বিলম্ব ছাড়াই কার্যকর হবে। তবে সিএনবিসি-র মতে, চুক্তির লিখিত রূপ এখনও প্রকাশ্যে আসেনি এবং এতে স্বাক্ষর হয়েছে কি না, তাও স্পষ্ট নয়। হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের দপ্তর এ বিষয়ে আরও তথ্য জানতে চাওয়া হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।


কিছু প্রশ্ন উঠেছে

মার্কিন আইনি বিশেষজ্ঞ ও কয়েকজন ডেমোক্র্যাট সাংসদ প্রশ্ন তুলেছেন—কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কীভাবে এমন বাধ্যতামূলক বাণিজ্য চুক্তি করতে পারেন, যেমনটি তিনি দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরার পর একাধিকবার করেছেন। তবে ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকদের যুক্তি, কংগ্রেস এ ধরনের চুক্তি করার ক্ষমতা নির্বাহী শাখাকে আগেই দিয়ে রেখেছে।


রোজার্স অ্যান্ড ব্রাউন কাস্টম ব্রোকার্সের প্রতিক্রিয়া

রোজার্স অ্যান্ড ব্রাউন কাস্টম ব্রোকার্স সংস্থার অপারেশনস ডিরেক্টর লরি মুলিন্স জানান, ট্রাম্পের প্রকাশ্য বাণিজ্য ঘোষণার ভিত্তিতে তারা তড়িঘড়ি প্রতিক্রিয়া জানাবে না। তিনি বলেন,
“ফেডারেল রেজিস্টারে নির্দিষ্ট তারিখ, সময় এবং প্রযোজ্য শুল্ক কোডসহ নোটিস প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এটি আনুষ্ঠানিক বলে গণ্য হয় না।”


গত বছর অচল হয়ে পড়েছিল বাণিজ্য আলোচনা

গত বছর ট্রাম্প ও মোদি প্রশাসনের মধ্যে বাণিজ্য আলোচনা একাধিক ইস্যুতে আটকে গিয়েছিল। এর অন্যতম কারণ ছিল রুশ তেলের উপর নয়াদিল্লির নির্ভরতা। আগস্ট মাসে তেল কেনার প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প ভারতের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন। এটি একই মাসের শুরুতে আরোপিত ২৫ শতাংশ ‘পারস্পরিক’ শুল্কের অতিরিক্ত ছিল। সোমবারের পোস্টে ট্রাম্প জানান, ভারতের উপর পারস্পরিক শুল্কের হার কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হবে, যা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে।


প্রধানমন্ত্রী মোদির বার্তা—ধন্যবাদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প

ট্রাম্প লেখেন, “ভারতও একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তার শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনবে।”
এরপর সোমবার পরে প্রধানমন্ত্রী মোদি এক্স (পূর্বতন টুইটার)-এ পোস্ট করে মার্কিন শুল্ক হ্রাসের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। মোদি লেখেন,
“মেড ইন ইন্ডিয়া পণ্যের উপর শুল্ক কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়েছে—এতে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণার জন্য ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আন্তরিক ধন্যবাদ।”


শান্তি প্রচেষ্টায় ভারতের সমর্থন

প্রধানমন্ত্রী মোদি আরও লেখেন,
“যখন বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতি এবং বৃহত্তম গণতন্ত্র একসঙ্গে কাজ করে, তখন তার সুফল আমাদের জনগণ পায় এবং পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার বিপুল সুযোগ তৈরি হয়। বৈশ্বিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শান্তির জন্য তাঁর প্রচেষ্টাকে ভারত পূর্ণ সমর্থন করে। আমাদের অংশীদারিত্বকে অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যেতে আমি তাঁর সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী।”


বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস সত্যি হলো

এই ঘোষণা এমন এক সময় এলো, যখন মাত্র এক সপ্তাহ আগেই ভারত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি বড় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। কিছু বিশ্লেষক আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে ইউরোপ ও ভারতের মধ্যে অগ্রগতি নয়াদিল্লি ও ওয়াশিংটনকে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পথে এগিয়ে নিতে পারে।

Read More News

Read More