সকাল সকাল ডেস্ক
কাঠমান্ডু। ভারতের কেন্দ্রীয় বাজেট রবিবার পেশ হয়েছে। ভারত ও নেপালের মধ্যে গভীর অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক সম্পর্ক থাকার কারণে ভারতের সাধারণ বাজেটের একাধিক বিধান নেপালের উপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। এই বিধানগুলির মধ্যে কিছু ভারত যেমন উপকৃত হবে, তেমনই নেপালের জন্যও লাভজনক হতে পারে।
পরিবহণ ও সংযোগ ব্যবস্থা
ভারত সরকার পরিকাঠামো খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে। নেপালের পূর্ব সীমান্ত সংলগ্ন শিলিগুড়ি পর্যন্ত হাই-স্পিড রেল নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে ভারত। বাজেটে ঘোষিত সাতটি নতুন হাই-স্পিড রেল করিডরের মধ্যে বারাণসী–শিলিগুড়ি করিডরও রয়েছে। এই রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হলে ভারত ও নেপালের মধ্যে পণ্য পরিবহণ ও ট্রানজিট আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে। একই সঙ্গে ২০টি নতুন জাতীয় জলপথ এবং অতিরিক্ত ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর নির্মাণের ঘোষণাও করা হয়েছে। এর ফলে নেপালের আমদানি–রপ্তানির খরচ কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাণিজ্য সহজীকরণ ও ই-কমার্স
ভারতের বাজেটে কুরিয়ার মাধ্যমে রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ১০ লক্ষ টাকার সীমা সম্পূর্ণভাবে তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে ভারতের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপগুলির আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছনো সহজ হবে, যার সুফল ভারত–নেপাল সীমান্ত পেরিয়ে ই-কমার্স ব্যবসাতেও পড়তে পারে। পাশাপাশি, কাস্টমস ইন্টিগ্রেটেড সিস্টেম ও ডিজিটাল উইন্ডো চালু হওয়ায় শুল্ক প্রক্রিয়া দ্রুত হবে, ফলে নেপালগামী ও নেপাল থেকে আসা পণ্যের ছাড়পত্রে বিলম্ব কমতে পারে।
জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি
ভারত সৌরশক্তি ও ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির উপর শুল্ক ছাড় ও বিভিন্ন প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। ভারতে সৌর ও ব্যাটারি প্রযুক্তি সস্তা হলে তার ইতিবাচক প্রভাব নেপালেও পড়তে পারে। নেপালেও ব্যাটারি স্টোরেজভিত্তিক সৌর প্রকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে, ফলে ভারতের নীতির সুবিধা নেপাল পেতে পারে। অন্যদিকে, ভারত পারমাণবিক শক্তি প্রকল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ঘোষণাও করেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক জ্বালানি বাজারের কাঠামো বদলে দিতে পারে। ভারতে বিদ্যুতের দাম কমলে তা নেপালের জন্য কিছুটা প্রতিকূল হতে পারে, কারণ নেপালের জলবিদ্যুতের দীর্ঘমেয়াদি বাজার মূলত ভারতই।
ভারতে কৃষি উৎপাদন বাড়লে নেপালি কৃষকদের প্রভাব
ভারত ও নেপালের মধ্যে কৃষিপণ্যের বাণিজ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে। ভারতের ২০২৬–২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ কমানো ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন প্রযুক্তি ও পরিকাঠামো-কেন্দ্রিক একাধিক প্রকল্প আনা হয়েছে। ভারতে উৎপাদন খরচ কমলে সস্তা কৃষিপণ্য সহজেই নেপালি বাজারে ঢুকতে পারে।
ভারত সরকার ‘ভারত–বিস্তার’ নামে বহুভাষিক এআই টুল চালু করেছে, যা কৃষকদের মাটির গুণমান, আবহাওয়া ও চাষের সেরা পদ্ধতি সম্পর্কে উপযোগী পরামর্শ দেবে। এতে সার ও বীজের অপচয় কমবে এবং উৎপাদন বাড়বে, ফলে ভারতীয় কৃষিপণ্যের দাম আরও কমতে পারে। ভারত–নেপালের খোলা সীমান্ত ও সমান ভৌগোলিক পরিস্থিতির কারণে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চাষাবাদের ধরনও প্রায় এক। তাই ভারতীয় কৃষকদের প্রাপ্ত তথ্য থেকে নেপালি কৃষকরাও উপকৃত হতে পারেন। এছাড়া ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর ও ২০টি নতুন জাতীয় জলপথ চালুর ফলে কৃষিপণ্যের পরিবহণ খরচ কমবে, যার ফলে ভারতীয় সবজি ও খাদ্যশস্য নেপালে আরও সস্তা হতে পারে। ডিজিটাল উইন্ডোর মাধ্যমে দ্রুত ছাড়পত্র পাওয়ায় তাজা ফল ও সবজি কম খরচে নেপালের সীমান্তে পৌঁছবে।
নতুন বৌদ্ধ সার্কিট: সুযোগ না চ্যালেঞ্জ
ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলিতে নতুন বৌদ্ধ সার্কিট উন্নয়নের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে। এই সার্কিটে অরুণাচল প্রদেশ, সিকিম, অসম, মণিপুর, মিজোরাম ও ত্রিপুরার বৌদ্ধ মঠ ও মন্দিরগুলিকে যুক্ত করা হবে। এই রাজ্যগুলির সঙ্গে নেপালের গভীর ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সেখানে তীর্থযাত্রীদের জন্য পরিকাঠামো উন্নত হলে নেপালের লুম্বিনি (গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান) পর্যন্ত পর্যটকদের যাতায়াত বাড়তে পারে। লুম্বিনির পাশাপাশি নেপালের পূর্ব থেকে পশ্চিমে বহু বৌদ্ধ মঠ, স্তূপ ও ঐতিহ্যবাহী স্থান রয়েছে। যদি ভারতের বৌদ্ধ সার্কিটকে নেপালের এই ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে শক্তিশালী পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়, তবে নেপাল বড় ধরনের লাভবান হতে পারে। বারাণসী–শিলিগুড়ি হাই-স্পিড রেল করিডর আন্তর্জাতিক বৌদ্ধ পর্যটকদের নেপালমুখী করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
আঞ্চলিক পর্যটন ও নগর আধুনিকীকরণ
ভারত ‘প্রত্যেক শহর অর্থনৈতিক অঞ্চল’ প্রকল্পের আওতায় ৫০ বিলিয়ন রুপি বিনিয়োগের ঘোষণা করেছে, যার ফলে মধ্যম ও ছোট শহরগুলির পরিকাঠামো উন্নত হবে। সীমান্তবর্তী ভারতীয় শহরগুলিতে আধুনিক হাসপাতাল, হোটেল ও পরিবহণ সুবিধা বাড়লে নেপালের নাগরিকরাও উপকৃত হবেন। এতে নেপাল–ভারত–ভুটানকে অন্তর্ভুক্ত করে বহু-দেশীয় পর্যটন প্যাকেজ চালানোও লজিস্টিক দিক থেকে সহজ হবে।
ভারতের অনুদান
ভারতের অনুদানে নেপালে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্প চলছে। নির্বাচন উপলক্ষে যানবাহন সরবরাহ থেকে শুরু করে স্কুল বাস ও অ্যাম্বুল্যান্স দেওয়ার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারত সরকার নেপালকে সহায়তা করে আসছে। চলতি বছরে নেপালের জন্য ৭ বিলিয়ন রুপি অনুদান ঘোষণা করা হয়েছিল, যা বাড়িয়ে ৮.৩ বিলিয়ন রুপি করা হয়েছে। আগামী বছরের জন্য ৮ বিলিয়ন রুপির বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
করহার নীতির প্রভাব
ভারত ক্যানসারের ১৭টি ও ৭টি বিরল রোগের ওষুধের উপর সম্পূর্ণ শুল্ক ছাড় দিয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত বহু নেপালি রোগী ভারতে চিকিৎসা করান, ফলে তারা সরাসরি উপকৃত হবেন। এছাড়া ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিদেশ থেকে আনা সামগ্রীর উপর শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে বিশেষ করে নেপাল ভ্রমণে আসা ভারতীয় পর্যটকেরা লাভবান হবেন, যারা এখান থেকে বিভিন্ন পণ্য সঙ্গে নিয়ে যান।
No Comment! Be the first one.