শোক থেকে শক্তিতে উত্তরণ: মানভূমের নারী জাগরণের রূপকার নিভা দেবী

সকাল সকাল ডেস্ক

দেবরাজ মাহাতো
বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে নারী শিক্ষা এক দীর্ঘ সংগ্রামের নাম। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত এই যাত্রাপথে বহু মহীয়সী নারী নিজেদের উৎসর্গ করেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ইতিহাসে সুপরিচিত, কিন্তু এমন অনেকেই আছেন যাঁরা নিভৃতে থেকে একটি জনপদের অন্ধকার দূর করেছেন। পুরুলিয়ার শিক্ষা মানচিত্রে তেমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন শ্রীমতী নিভা রায়চৌধুরী। ছাত্রছাত্রী ও সহকর্মীদের প্রিয় ‘বড়দিমণি’ কেবল একজন শিক্ষিকা ছিলেন না; তিনি ছিলেন রুক্ষ মানভূমের মাটিতে নারী শিক্ষার বীজ বপনকারী এক দূরদর্শী কারিগর।
নিভা রায়চৌধুরীর জন্ম ১৯২০ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি। তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ঢাকার প্রখ্যাত কাশীপুর জমিদার বাড়িতে। সেই সময়ে জমিদারি আভিজাত্যের সমান্তরালে তাঁদের পরিবারে শিক্ষার এক গভীর ধারা প্রবাহিত ছিল।
তাঁর মাতামহ বংশের ইতিহাসও ছিল সমান গৌরবান্বিত। কলকাতার ভবানীপুরের বিখ্যাত ‘মজুমদার বাড়ি’ ছিল তাঁর মামার বাড়ি। নিভা দেবীর মা ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী স্নাতকদের মধ্যে অন্যতম এবং হাইকোর্টের প্রথম ভারতীয় বিচারপতি চন্দ্রমাধব ঘোষের পৌত্রী। এই পারিবারিক ঐতিহ্যই নিভা দেবীর অন্তরে আধুনিক চিন্তা ও শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগের জন্ম দিয়েছিল।
কলকাতার গোখেল মেমোরিয়াল স্কুলে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয়। মেধাবী নিভা দেবী ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অসাধারণ ফল করেন। কিন্তু সেই যুগে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথ নারীদের জন্য মসৃণ ছিল না। তা সত্ত্বেও তিনি ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক এবং পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর (এম.এ.) ডিগ্রি অর্জন করেন। এই উচ্চশিক্ষা লাভের পেছনে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ শ্রী হরপ্রসাদ মিত্রের প্রেরণা তাঁকে মানসিকভাবে ঋদ্ধ করেছিল।
নিভা দেবীর বিবাহিত জীবন ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। মাত্র ১৯ বছর বয়সে অকাল বৈধব্য তাঁর জীবনের ওপর এক কালো ছায়া ফেলে দেয়। কিন্তু এই শোক তাঁকে স্তব্ধ করতে পারেনি। তাঁর দেওর, বিশিষ্ট পণ্ডিত ডঃ এম. এন. রায়, এই কঠিন সময়ে তাঁর পাশে দাঁড়ান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, নিভা দেবীর মেধা ও কর্মশক্তিকে সমাজের কল্যাণে নিয়োগ করাই হবে শোক থেকে মুক্তির একমাত্র পথ। ডঃ রায়ের অনুপ্রেরণায় নিভা দেবী সামাজিক কুসংস্কারের শৃঙ্খল ভেঙে শিক্ষার ব্রতে আত্মনিয়োগ করেন।
পঞ্চাশের দশকের শুরুতে নিভা রায়চৌধুরী যখন পুরুলিয়ায় আসেন, তখন এই অঞ্চলটি ছিল অত্যন্ত অবহেলিত। তৎকালীন বিহার সরকারের নির্দেশে তিনি ‘শান্তময়ী বালিকা বিদ্যালয়’-এর প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সেই সময় পুরুলিয়া ছিল মূলত বাঙালি অধ্যুষিত কিন্তু প্রশাসনিকভাবে বিহারের অংশ। নারী শিক্ষার হার ছিল নগণ্য এবং যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল শোচনীয়। রক্ষণশীল সমাজে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো ছিল বিলাসিতা মাত্র। নিভা দেবী নিজে বাড়ি বাড়ি ঘুরে অভিভাবকদের বুঝিয়ে ছাত্রীদের স্কুলে আনার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।
তিনি জানতেন, কেবল অক্ষরজ্ঞানই শিক্ষা নয়। তাঁর নেতৃত্বে স্কুলে চালু হয় নাচ, গান, আবৃত্তি ও বিতর্ক সভা। তিনি বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞানমনস্কতা ছাড়া আধুনিক সমাজ গড়া অসম্ভব। তাঁরই প্রচেষ্টায় স্কুলে বিজ্ঞানের পঠন-পাঠন উন্নত হয়।
পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের সহযোগিতায় স্কুলের বিজ্ঞান ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এবং ১৯৫৬ সালে রাজ্যপাল পদ্মা নাইডু এর উদ্বোধন করেন।
১৯৯৮ সালের ২রা জানুয়ারি এই মহান শিক্ষাব্রতী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তিনি যে দীপশিখা জ্বালিয়ে দিয়ে গেছেন, তা আজও অমলিন। তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে পুরুলিয়া জেলা বিজ্ঞান মেলায় ‘নিভা রায়চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রবর্তিত হয়েছে।
শ্রীমতী নিভা রায়চৌধুরী কেবল একটি নাম নয়, তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। ঢাকার জমিদারি বিলাস বিসর্জন দিয়ে পুরুলিয়ার রুক্ষ মাটিতে শিক্ষার যে ফল্গুধারা তিনি বইয়ে দিয়েছিলেন, তা আজও বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রীদের প্রেরণা জোগায়। প্রতিকূলতাকে জয় করে কীভাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়, ‘বড়দিমণি’র জীবন তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
তথ্যসূত্র : ধ্রুবজ্যোতি চট্টোপাধ্যায় (পুরুলিয়া জেলা বিজ্ঞান আধিকারিক), শান্তময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রাক্তনীদের লেখা

Read More News

Read More