সকাল সকাল ডেস্ক
কল্যাণী : পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী সুমনা সরকার বুধবার গভীর রাতে মেডিক্যাল ছাত্রীর ছদ্মবেশে কল্যাণীর জওহরলাল নেহরু মেমোরিয়াল (জেএনএম) হাসপাতালে আচমকা হানা দিলেন। মুখে মাস্ক থাকায় প্রথমদিকে হাসপাতালের কোনো কর্মীই তাঁকে চিনতে পারেননি। এই সুযোগে তিনি হাসপাতালের সামগ্রিক পরিষেবা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা এবং হস্টেলের (ছাত্রাবাস) পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন। সেখানে একাধিক অনিয়ম ও চরম অব্যবস্থা দেখে তিনি গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বুধবার রাত আনুমানিক ১২টা ৪০ মিনিটে কোনো রকম নিরাপত্তা কনভয় ছাড়াই সাধারণ চটি ও পোশাকে হাসপাতালে পৌঁছান স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তাঁর সঙ্গে সাধারণ পোশাকে ছিলেন কেবল একজন মহিলা নিরাপত্তাকর্মী। মুখে মাস্ক থাকায় কর্তব্যরত স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁকে সাধারণ ছাত্রী বলেই মনে করেছিলেন। এই সুযোগেই তিনি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের বাস্তব চিত্র খতিয়ে দেখেন।
পরিদর্শনকালে প্রতিমন্ত্রী দেখতে পান, জরুরি বিভাগে কোনো বরিষ্ঠ চিকিৎসক উপস্থিত নেই। এই ঘটনায় তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এরপর যখন তিনি মুখ থেকে মাস্ক সরান, তখন সেখানে উপস্থিত চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে শোরগোল পড়ে যায়।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী রোগীদের পরিজনদের অভাব-অভিযোগের বিষয়ে জুনিয়র চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর তিনি বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখেন এবং হাসপাতাল চত্বরে ব্যাপক নোংরা-আবর্জনা ও অব্যবস্থা দেখে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন। হাসপাতাল চত্বরে কুকুর-বেড়ালের অবাধ ঘোরাফেরা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় বলে মন্তব্য করে তিনি জানান, এই সমস্ত বিষয়ের রিপোর্ট স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে দেওয়া হবে।
সুমনা সরকার জানান, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর কাছে অভিযোগ আসছিল যে রাত ১০টার পর হাসপাতালে অধিকাংশ সময় কোনো সিনিয়র ডাক্তার থাকেন না। সেই কারণেই তিনি এই আকস্মিক পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বলেন, হাসপাতালের প্রায় সমস্ত বিভাগেই নোংরা পরিবেশ তৈরি হয়ে রয়েছে, যা অত্যন্ত নিন্দনীয়।
রাজ্য সরকারের এই মন্ত্রী আরও বলেন, জেএনএম হাসপাতাল ও তার হস্টেল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ আসছিল। অতীতে রাজ্যে ঘটে যাওয়া আর জি কর হাসপাতালের ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল। সেই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রুখতেই রাজ্যজুড়ে হাসপাতালের নিরাপত্তা ও পরিকাঠামো খতিয়ে দেখা জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, এই আকস্মিক পরিদর্শনের বিষয়ে আগে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও তাঁর আলোচনা হয়েছিল এবং মুখ্যমন্ত্রীই তাঁকে একজন মহিলা নিরাপত্তাকর্মী সঙ্গে রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি পুরোপুরি ছাত্রীর বেশে রাত সাড়ে বারোটার পর হাসপাতালে ঢুকেছিলাম। জরুরি বিভাগে কোনো সিনিয়র ডাক্তার ছিলেন না, পুরো কাজটাই কেবল জুনিয়র ডাক্তারদের ভরসায় চলছিল।’’
বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখার পর প্রতিমন্ত্রী হাসপাতালের হস্টেলেও যান। সেখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্নতার অভাব দেখেও ক্ষোভ উগরে দেন তিনি। তিনি বলেন, হস্টেলের অবস্থা খুবই খারাপ, সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার কোনো বালাই নেই এবং চারপাশ সম্পূর্ণ খোলা অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
সুমনা সরকার বলেন, হস্টেলগুলিতে নোংরা পরিবেশ তৈরি হয়ে রয়েছে। তিনি চাইলে সংবাদমাধ্যমকে সঙ্গে নিয়ে যেতে পারতেন, কিন্তু পড়ুয়াদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি তা করেননি। তবে হস্টেলে থাকা পড়ুয়াদের তিনি সতর্ক করার পাশাপাশি আধিকারিকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন।
হস্টেল কর্তৃপক্ষকে কড়া নির্দেশ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সেখানে কারা যাতায়াত করছেন, তার সম্পূর্ণ নথি (রেকর্ড) রাখতে হবে। সেই সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত ছাত্ররা কীভাবে হস্টেলের বাইরে থাকেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তবে রাজ্য সরকার শীঘ্রই হাসপাতাল ও হস্টেলের এই বর্তমান অব্যবস্থা দূর করতে প্রয়োজনীয় সব রকম পদক্ষেপ করবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
No Comment! Be the first one.