বিশ্বসংস্কৃতি, সাহিত্য ও টেলিভিশনের টানাপোড়েন


উজ্জ্বল কুমার দত্ত, কুমারডুবি, ঝাড়খন্ড

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে টেলিভিশন যখন ভারতীয় ঘরে প্রবেশ করতে শুরু করল, তখন অনেকে ভেবেছিলেন—এ যেন নতুন দিগন্ত উন্মোচন। আড্ডার আসরে, রাতের খাবারের টেবিলে কিংবা গ্রামীণ হাটে–বাজারে, সাদা-কালো পর্দার আলো হয়ে উঠেছিল বিনোদনের প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু প্রশ্ন উঠল—এই নতুন আলোকরশ্মি কি কেবল আনন্দ দিচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে আমাদের সাহিত্যিক সংস্কৃতিকে আড়াল করে ফেলছে? দীর্ঘকাল ধরে বাঙালি সমাজে বই ছিল আত্মার সঙ্গী, সাহিত্যের পাতা ছিল চিন্তার মুক্ত ক্ষেত্র। রবীন্দ্রনাথের কবিতা, শরৎচন্দ্রের উপন্যাস কিংবা বিভূতিভূষণের প্রকৃতিচিত্র—সবই পাঠকের কল্পনাশক্তিকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিত। কিন্তু টেলিভিশনের দৃষ্টিনন্দন ছবি ও সরাসরি দৃশ্যায়ন পাঠককে অলস করে তুলল, যেখানে কল্পনার বদলে চোখের সামনে পরিবেশিত চিত্রই হয়ে উঠল প্রধান অবলম্বন।

আসলে টেলিভিশনের সঙ্গে সাহিত্যের দ্বন্দ্ব একমাত্রিক নয়; এটি একটি জটিল সম্পর্ক। সাহিত্য একদিকে সময় দাবি করে—মনোযোগের, ধৈর্যের, এবং ভাবনার। অন্যদিকে টেলিভিশন তৈরি করেছে ক্ষণিক তৃপ্তির অভ্যাস। ৩০ মিনিটের ধারাবাহিক বা খবরের ফ্ল্যাশে মানুষ তার বিনোদন বা তথ্যের ক্ষুধা মেটাচ্ছে। ফলে যে গভীরতা বা চিন্তার বিস্তার সাহিত্য দিত, তার জায়গা নিল তাৎক্ষণিক আনন্দ। একসময় সন্ধ্যা মানেই বই হাতে নিয়ে নির্জনে বসা, কিন্তু এখন টিভি সিরিয়ালের কোলাহলই হয়ে উঠল পরিবারের আসর। এর ফলে একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে সাহিত্য থেকে দূরে সরে গিয়ে চিত্রকল্পনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ল, যেখানে ভাবনার চর্চা কমে গিয়ে দৃশ্যমান রূপই হয়ে উঠল একমাত্র আকর্ষণ।

তবে এটিও সত্য যে, টেলিভিশন সাহিত্যকে একেবারে মুছে দেয়নি; বরং তাকে নতুনভাবে রূপান্তর করেছে। জনপ্রিয় উপন্যাস থেকে ধারাবাহিক নির্মাণ, কবিতার আবৃত্তি অনুষ্ঠান, কিংবা সাহিত্যিকদের জীবনভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র—সবই টিভির মাধ্যমে বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছেছে। আগে যেখানে কেবলমাত্র পাঠকের হাতেই সাহিত্য পৌঁছত, সেখানে টেলিভিশন একে কোটি দর্শকের সামনে উন্মুক্ত করেছে। প্রশ্ন কেবল এই যে, এই রূপান্তরের পথে সাহিত্যের মূল গভীরতা কতটা অক্ষুণ্ণ রইল? যখন শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত পর্দায় আসে, তখন কাহিনির রসধারা থাকলেও চরিত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব ও আত্মিক জিজ্ঞাসার অনেকটাই দর্শকের চোখ এড়িয়ে যায়। ফলে সাহিত্যিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে টেলিভিশনের উপস্থাপনার মধ্যে থেকে যায় এক অদৃশ্য ফাঁক।

আজকের দিনে স্মার্টফোন, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, আর ইউটিউবের যুগে টেলিভিশনও আর আগের সেই একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে পারছে না। কিন্তু সাহিত্যের অবস্থা আরও সঙ্কটজনক। ছোটগল্প পড়তে যেখানে ৩০ মিনিট সময় লাগে, সেখানে মানুষ পাঁচ মিনিটের ভিডিওতেই পরিপূর্ণতা খুঁজে নিচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু পাঠাভ্যাসের নয় এটি মানসিক গঠনেরও পরিবর্তন আনছে। সাহিত্য যে কল্পনা, ধৈর্য, এবং চিন্তার সূক্ষ্ম অনুশীলন শেখায়, তা হারিয়ে গেলে সমাজের সাংস্কৃতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তাই মনে প্রশ্ন জাগে যে আমরা কি টিভি কিংবা ডিজিটাল স্ক্রিনের দাস হয়ে যাচ্ছি? আমরা কি সাহিত্যের সৃষ্টিশীল শক্তিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে পারব?

সমাধান হয়তো একটিই—দুই মাধ্যমকে পরস্পরের শত্রু না ভেবে সহযোগী হিসেবে দেখা। টেলিভিশন যদি সাহিত্যের গভীরতাকে তুলে ধরতে সচেষ্ট হয় বা পাঠাভ্যাস জাগিয়ে তোলার সেতু তৈরি করে, তবে দর্শকও ধীরে ধীরে আবার বইয়ের পাতায় ফিরে আসতে পারে। স্কুল-কলেজে টিভির সাহিত্যানুষ্ঠানকে পাঠ্যক্রমের সহায়ক করা, জনপ্রিয় ধারাবাহিকের পাশাপাশি সাহিত্যনির্ভর অনুষ্ঠান প্রচার করা কিংবা নতুন প্রজন্মকে বইয়ের জগতে টানতে প্রণোদনা দেওয়া ইত্যাদি। এসব পদক্ষেপই পারে এই দ্বন্দ্বকে প্রশমিত করতে। অন্যথায়, ভবিষ্যতে আমরা হয়তো এমন এক প্রজন্ম পাব যারা সব দেখেছে, সব শুনেছে, কিন্তু গভীরভাবে কিছুই পড়েনি। আর তাতে হারিয়ে যাবে সেই চিন্তার স্বাধীনতা, যা কেবল সাহিত্যই দিতে পারে।

(মতামত ব্যক্তিগত)

লেখক:
উজ্জ্বল কুমার দত্ত
কুমারডুবি, ঝাড়খন্ড

Read More News

Read More