সকাল সকাল ডেস্ক
আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন, বাজেট প্রক্রিয়া নিয়ে বিস্ফোরক দাবি এবং পদত্যাগের পর বিরোধী দলনেতার ঘরে বৈঠক—নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জল্পনা
রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে শনিবারের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগ। তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতির পদ থেকে আচমকাই ইস্তফা দিয়ে রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন তিনি। তাঁর দাবি, দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি ফোন এবং তাঁর আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার ঘটনাই এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল কারণ। শুধু পদত্যাগই নয়, তার পরেই বিধানসভায় গিয়ে বিরোধী দলনেতার ঘরে বৈঠক করায় রাজনৈতিক জল্পনা আরও তীব্র হয়েছে। একইসঙ্গে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগ-এর পর বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
কেন পদত্যাগ করলেন চন্দ্রিমা?
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের বক্তব্য অনুযায়ী, শুক্রবার মেট্রোপলিটনের দলীয় কার্যালয়কে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাই পরিস্থিতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিদ্রোহী শিবিরের বিরুদ্ধে দলীয় কার্যালয়ে তালা ঝোলানোর অভিযোগ ওঠার পর প্রগতি ময়দান থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়।
এর কিছুক্ষণ পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ফোন করে প্রশ্ন করেন, তিনি কি দলীয় ভবন বিদ্রোহী শিবিরের হাতে তুলে দিয়েছেন? এই অভিযোগে তিনি গভীরভাবে মর্মাহত হন। চন্দ্রিমার কথায়, তিনি দলনেত্রীকে বলেন, “দিদি, আপনি আমাকে এ কথা বলতে পারলেন? আমি কি এমন কাজ করতে পারি?”
তাঁর দাবি, দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা ও আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে বলেই তিনি আর ওই দায়িত্বে থাকতে চাননি। সেই কারণেই চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগ।
পদত্যাগপত্রে কী লিখেছেন?
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য তাঁর পদত্যাগপত্রে শুধু রাজ্য সভাপতির পদ ছাড়ার কথাই জানাননি, বরং দলীয় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকেও নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার কথা স্পষ্ট করেছেন।
তিনি লিখেছেন, দলের বিভিন্ন ব্যাঙ্ক হিসাব পরিচালনায় স্বাক্ষর করার অধিকার তিনি ছেড়ে দিচ্ছেন। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের অনুমোদিত প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর ওপর যে দায়িত্ব ছিল, সেখান থেকেও অব্যাহতি নিচ্ছেন।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এটি শুধুমাত্র আবেগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং সাংগঠনিকভাবে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে নেওয়ার ইঙ্গিত।
আরও অন্য খবরের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজ
বাজেট নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগ-এর পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আরও এক গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ করেন তিনি।
প্রাক্তন অর্থ প্রতিমন্ত্রীর দাবি, অর্থ দপ্তরের দায়িত্বে থাকলেও রাজ্যের বাজেট প্রণয়নের সময় কখনও তাঁর সঙ্গে কোনও আলোচনা করা হতো না। বাজেটে কী ঘোষণা থাকবে, তা তিনি জানতে পারতেন বাজেট পেশের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে।
তিনি বলেন, “আমি বাজেট পেশ করতাম ঠিকই, কিন্তু তার আগে ভেতরে কী রয়েছে, তা জানতাম না। কয়েক ঘণ্টা আগে আমাকে জানানো হতো।”
এতদিন এই বিষয়ে মুখ না খোলার কারণ হিসেবে তিনি জানান, দায়িত্বে থাকার সময় গোপনীয়তা রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন। কিন্তু এখন যখন তাঁর সততা ও আনুগত্য নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে, তখন আর নীরব থাকার কোনও কারণ তিনি দেখছেন না।

কীভাবে রাজ্য সভাপতি হয়েছিলেন?
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক পুনর্গঠনের সময় চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
সুব্রত বক্সি অসুস্থতার কারণে দায়িত্ব ছাড়ার পর সংগঠনের হাল ধরেন তিনি। সেই সময় দলীয় ভাঙন, সাংসদদের একাংশের দলত্যাগ এবং বিধায়কদের মধ্যে মতভেদের মতো কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই ছিল।
কিন্তু সেই নেত্রীর আনুগত্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠায় শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের পথ বেছে নিলেন তিনি।
রাজনৈতিক প্রভাব
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগ রাজ্যের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
এই ঘটনার ফলে তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের মতভেদ আরও প্রকাশ্যে চলে এসেছে। একইসঙ্গে বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে তাঁর অভিযোগ আগামী দিনে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বিরোধী দলও এই ঘটনাকে রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে সামনে আনতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সরকারি বা দলীয় প্রতিক্রিয়া
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের অভিযোগের বিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করা হয়নি। রাজনৈতিক মহলের নজর এখন দলীয় নেতৃত্বের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং এই পদত্যাগের পর সংগঠনে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তার ওপর।
সাধারণ মানুষের জন্য তথ্য
চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের পদত্যাগ আপাতদৃষ্টিতে একটি দলীয় সাংগঠনিক ঘটনা হলেও এর প্রভাব রাজ্যের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর পড়তে পারে। আগামী দিনে দলীয় নেতৃত্ব, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের।
No Comment! Be the first one.