শক্তির রাজনীতি ও রাষ্ট্রসঙ্ঘের নীরবতা : বিশ্বব্যবস্থার এক গভীর সংকট

উজ্জ্বল কুমার দত্ত

একবিংশ শতাব্দীর পৃথিবীকে আমরা প্রায়ই সভ্যতার এক উন্নত পর্যায় বলে মনে করি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের জাগরণ— সব মিলিয়ে মনে হয় মানবজাতি যেন বহু অন্ধকার যুগ অতিক্রম করে এক নতুন নৈতিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিন্তু বাস্তবের বিশ্বরাজনীতি অনেক সময় সেই আশাবাদকে ভেঙে দেয়। সভ্যতার ঝকঝকে মুখোশের আড়ালে এখনও শক্তির উন্মত্ততা, ক্ষমতার অহংকার এবং যুদ্ধের ভয়াবহ সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে।

আজকের পৃথিবী ঠিক এমনই এক উদ্বেগজনক সময়ের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, যুদ্ধের হুমকি এবং রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির আচরণ আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতাকে গভীরভাবে নাড়া দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর রাজনৈতিক আচরণ ও কূটনৈতিক ভাষা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয় হয়ে আছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে ধরনের অশালীন কঠোর ভাষা, অর্থনৈতিক চাপ এবং সামরিক হুমকির রাজনীতি দেখা দিচ্ছে , তা বিশ্বরাজনীতিকে এক নতুন অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বাণিজ্যনীতিকে অস্ত্রের মতো ব্যবহার করা, আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসা কিংবা হঠাৎ করেই কঠোর সামরিক অবস্থান গ্রহণ করা। এই পদক্ষেপগুলি বিশ্বরাজনীতির প্রচলিত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করেছে। অনেক সময় মনে হয়েছে যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক যেন সংলাপ ও কূটনীতির জায়গা ছেড়ে শক্তির প্রদর্শনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে পৃথিবীর বহু দেশ আজ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে— কারণ কোনো এক শক্তিধর রাষ্ট্রের আকস্মিক সিদ্ধান্ত গোটা বিশ্বের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে আসে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতির এই উত্তেজনাকর পরিবেশে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান কি আছে, যা বিশ্বশান্তির রক্ষক হিসেবে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তরে যে প্রতিষ্ঠানের নাম সর্বপ্রথম মনে পড়ে, সেটি হল রাষ্ট্রসঙ্ঘ।

মানবজাতির আশা ও রাষ্ট্রসঙ্ঘ

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যখন সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয় বা যখন রাষ্ট্রগুলির মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে, তখন সাধারণ মানুষের আশা থাকে যে রাষ্ট্রসঙ্ঘ এগিয়ে আসবে। এই প্রতিষ্ঠান মধ্যস্থতা করবে, আলোচনার পথ খুলে দেবে এবং যুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণ করবে। রাষ্ট্রসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটি গভীর মানবিক উপলব্ধি থেকে। ইতিহাসে সংগঠিত যুদ্ধের উদ্দেশ্য ও ভয়াবহতা গুলি বিশ্লেষণ করলে জানা যায় যে যুদ্ধ আজ পর্যন্ত কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারেনি। যুদ্ধ কেবল ধ্বংস, মৃত্যু এবং দীর্ঘস্থায়ী মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলির সমাধান হওয়া উচিত সংলাপ, কূটনীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে।

কিন্তু বাস্তবতা প্রায়ই এই আদর্শকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। সাম্প্রতিক কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক ঘটনাবলির দিকে তাকালে দেখা যায় যে বিশ্বরাজনীতির বহু জটিল সংকটের সময় রাষ্ট্রসঙ্ঘ কার্যকর ভূমিকা নিতে পারেনি।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ। ২০২২ সাল থেকে চলতে থাকা এই সংঘাতে হাজার-হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং লক্ষ-লক্ষ গৃহহীন হয়েছে। তবু এই যুদ্ধ বন্ধ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত বলে প্রতীয়মান হয়েছে।

একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত— বিশেষ করে ইসরাইল -হামাস সংঘর্ষ— আজও বিশ্বের অন্যতম জটিল ভূরাজনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। অসংখ্য আলোচনা, প্রস্তাব এবং আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পরেও সেখানে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।

এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন যে রাষ্ট্রসঙ্ঘ কি সত্যিই তার প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারছে?

ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখা:

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বনেতারা উপলব্ধি করেছিলেন যে আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব ও বিরোধিতাগুলি সমাধান করার জন্য একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। সেই ভাবনা থেকেই ১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল লীগ অফ নেশন। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হল এই যে— সেই প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রতিরোধ করতে পারেনি।

এরপর শুরু হয় মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও জঘন্যতম সংঘাত—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ মানবসভ্যতাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কোটি-কোটি মানুষের মৃত্যু, অগণিত শহরের ধ্বংস এবং অসংখ্য মানুষের বাস্তুচ্যুতি— সব মিলিয়ে পৃথিবী যেন এক গভীর দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছিল।

যুদ্ধের শেষদিকে জাপানের শহর হিরোশিমা এবং নাগাসাকি-তে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। মুহূর্তের মধ্যে লক্ষ-লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। পরবর্তী প্রজন্মের উপর তেজস্ক্রিয়তার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব মানবসভ্যতাকে স্তম্ভিত করে দেয়। যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে পৃথিবী তখন নিজের মুখের দিকে তাকিয়েছিল এবং দেখেছিল— সেখানে কত অন্ধকার জমে আছে। যুদ্ধ যেন মানুষের সমস্ত অর্জনকে মুহূর্তে ভস্মীভূত করে দিয়েছে। পৃথিবী তখন প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করেছিল যে মানুষের তৈরি শক্তি যদি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠে, তবে তা সমগ্র মানবজাতির অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলতে পারে।

এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা এক গভীর প্রশ্নের সামনে দাঁড়ালেন— মানবসভ্যতা কি আবারও এমন এক সর্বনাশা পথের দিকে ফিরে যাবে? যদি রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বিরোধ ও প্রতিযোগিতা কেবল যুদ্ধের মাধ্যমে মীমাংসা হয়, তবে ভবিষ্যতের পৃথিবী কি আর মানুষের বাসযোগ্য থাকবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই ধীরে ধীরে একটি নতুন চিন্তার জন্ম হয়। মনে করা হলো, আন্তর্জাতিক বিরোধের সমাধান করার জন্য এমন একটি বৈশ্বিক মঞ্চ থাকা দরকার যেখানে সব দেশ সমানভাবে নিজেদের কথা বলতে পারবে। শক্তির প্রদর্শনের বদলে আলোচনার পথ খোলা থাকবে এবং যেখানে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই শান্তির উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।

এই মানবিক ও ঐতিহাসিক উপলব্ধির পরিণতিতেই ১৯৪৫ সালের চব্বিশ অক্টোবর প্রতিষ্ঠিত হয় রাষ্ট্রসঙ্ঘ। রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠা ছিল এক অর্থে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানবজাতির একটি নৈতিক অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার ছিল এই যে, ভবিষ্যতে কোনো বিরোধ যেন আর এমন ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে না আনে; আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান যেন আলোচনার টেবিলেই খোঁজা হয়। সেই আশা ও প্রত্যাশার আলো নিয়েই রাষ্ট্রসঙ্ঘের যাত্রা শুরু হয়েছিল— মানবসভ্যতার ইতিহাসে শান্তির এক নতুন অধ্যায় রচনার প্রত্যয়ে।

রাষ্ট্রসঙ্ঘের কাঠামো:

রাষ্ট্রসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। মানবাধিকার রক্ষা করা এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে শক্তিশালী অঙ্গ হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল নিরাপত্তা পরিষদকে। এই পরিষদের মোট পনেরো সদস্যের মধ্যে পাঁচটি দেশকে স্থায়ী সদস্য করা হয়েছিল। স্থায়ী সদস্য দেশ হল— যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং চীন। এই দেশগুলির হাতেই রয়েছে বিশেষ ভেটো ক্ষমতা, যার ফলে তাদের মধ্যে কোনো একটি দেশও কোনো প্রস্তাবের বিরোধিতা করলে সেই প্রস্তাব আর গৃহীত হতে পারে না।
প্রথমদিকে এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেছে যে এই ভেটো ক্ষমতাই বহু ক্ষেত্রে রাষ্ট্রসঙ্ঘকে কার্যত অচল করে দিয়েছে।

ব্যর্থতার ইতিহাস

রাষ্ট্রসঙ্ঘের ইতিহাসে কিছু ঘটনা আজও মানবসভ্যতার বিবেককে কাঁপিয়ে দেয়।

১৯৯৪ সালের রোয়ান্ডা জেনোসাইড-এ কয়েক মাসের মধ্যেই প্রায় আট লক্ষ মানুষ নির্মমভাবে নিহত হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তখন কার্যত নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে ছিল। এরপর ১৯৯৫ সালে বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যা। হাজার হাজার নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হয়। সেখানে উপস্থিত রাষ্ট্রসঙ্ঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী সেই গণহত্যা প্রতিরোধ করতে পারেনি।
এই ঘটনাগুলি রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশ্বাসযোগ্যতাকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল।

আরও বড় প্রশ্ন উঠেছিল ২০০৩ সালে যখন ইরাক যুদ্ধ শুরু হয়। নিরাপত্তা পরিষদের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়াই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে সামরিক অভিযান চালায়। এর ফলে একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে আসে। যদি কোনো মহাশক্তি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, তবে রাষ্ট্রসঙ্ঘকে উপেক্ষা করাও তার পক্ষে সম্ভব। পরে সিরিয়ার সিভিল ওয়ার -এর সময়ও একই দৃশ্য দেখা যায়। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের মধ্যে মতভেদের কারণে কোনো কার্যকর আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।

ভবিষ্যতের প্রশ্ন:

আজকের পৃথিবী দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ক্রমশ বহুমেরু হয়ে উঠছে। নতুন-নতুন শক্তিধর রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল যে তার কাঠামো কি বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার ছাড়া রাষ্ট্রসঙ্ঘের কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব নয়। বিশ্বের বহু দেশ দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে যে এই পরিষদে আরও বিস্তৃত প্রতিনিধিত্ব থাকা উচিত।

রাষ্ট্রসঙ্ঘ আজও বিশ্বের একমাত্র বৈশ্বিক মঞ্চ, যেখানে প্রায় সব দেশ একত্রিত হয়ে আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা করতে পারে। কিন্তু শুধু আলোচনাই যথেষ্ট নয়— প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ। মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এই প্রশ্নের উপর যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কি সংলাপের শক্তি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের উন্মত্ততাকে পরাজিত করতে পারবে? যদি রাষ্ট্রসঙ্ঘ নিজেকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, তবে হয়তো এই প্রতিষ্ঠান আবারও বিশ্বশান্তির এক শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। অন্যথায় ইতিহাস আবারও আমাদের সামনে একই প্রশ্ন তুলে ধরবে।

Read More News

Read More