সকাল সকাল ডেস্ক
তেহরান (ইরান)। দেশের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনেইয়ের শারীরিক অবস্থার উপর গভীর নজর রাখা হচ্ছে। একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে সংঘর্ষের প্রাথমিক পর্যায়ে মার্কিন হামলায় তিনি গুরুতরভাবে আহত হন। ওই হামলায় তাঁর পিতা-সহ একাধিক কমান্ডার নিহত হন। তাঁর শারীরিক অবস্থাকে ঘিরে বড়সড় তথ্য সামনে আসায় তেহরানে আসলে কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে এবং বন্ধ দরজার আড়ালে ক্ষমতার ব্যবহার কীভাবে হচ্ছে তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ব্রিটেনের সংবাদপত্র ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোজতবা খামেনেইয়ের স্বাস্থ্যের সাম্প্রতিক তথ্য থেকে তাঁর ভয়াবহ আঘাতের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। ওই হামলায় তিনি গুরুতর এবং মুখ বিকৃত হওয়ার মতো আঘাত পান। এই হামলায় তাঁর পূর্বসূরি তথা পিতা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু হয়েছিল। হামলার কয়েক মাস পরও এই আঘাত তাঁর দৈনন্দিন কাজকর্মে গভীর প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলায় খামেনেইয়ের মুখ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, তাঁর ‘রিকনস্ট্রাকটিভ প্লাস্টিক সার্জারি’ (মুখের গঠন পুনর্গঠন করার অস্ত্রোপচার) প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তাঁর আঘাত শুধু মুখেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর একটি পায়ে একাধিকবার অস্ত্রোপচার হয়েছে, ফলে ভবিষ্যতে কৃত্রিম পা (প্রোস্থেটিক লিম্ব) ব্যবহারের প্রয়োজন হতে পারে।
তাঁর অবস্থার সঙ্গে পরিচিত সূত্রগুলির মতে, তিনি এখনও দগ্ধ হওয়া এবং হাড়ের ক্ষতির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করছেন। এই শারীরিক সমস্যার পরেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সচেতন এবং প্রশাসনিক কাজে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। তবে তাঁর আঘাতের গুরুতরতা দেখে মনে করা হচ্ছে, ইরানের শাসন ব্যবস্থায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে হয়েছে।
‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, তিনি সচেতন থাকলেও গুরুতর আঘাতের কারণে সরাসরি ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ইরানের শক্তিশালী ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর সিনিয়র কমান্ডাররা দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বড় ভূমিকা নিতে শুরু করেছেন। বলা হচ্ছে, এই জেনারেলরা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এবং আহত সর্বোচ্চ নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে কার্যত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন।
খামেনেইয়ের জনসমক্ষে অনুপস্থিতি বিভিন্ন জল্পনাকে আরও উস্কে দিচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি না টেলিভিশনে ভাষণ দিয়েছেন, না কোনও জনসভায় বক্তব্য রেখেছেন—যা এত উচ্চপদস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতে এবং তাঁর শারীরিক অবস্থার কারণে যোগাযোগ অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত ও পরোক্ষ মাধ্যমে করা হচ্ছে। তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখায় অভ্যন্তরীণ সমীকরণও জটিল হয়ে উঠেছে।
জানা গেছে, শীর্ষ কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ কম করছেন। এর একটি কারণ নিরাপত্তা উদ্বেগ—যাতে তাঁর অবস্থান ফাঁস না হয় এবং ভবিষ্যতে তিনি হামলার লক্ষ্য না হন। এর ফলে নেতৃত্বের কাঠামো কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সামরিক ও রাজনৈতিক মহলের মধ্যে বিভক্ত হয়েছে।
মার্চ মাসে পিতার মৃত্যুর পর খামেনেই নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তিনি এই পদে আসীন হন এবং তখনই তিনি আহত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বের সময় যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে দেশ পরিচালনার চাপও প্রবল ছিল।
ইরানি কর্মকর্তারা তাঁর দৃঢ়তা ও সক্রিয়তার উপর জোর দিলেও গুরুতর আঘাত, জনসমক্ষে অনুপস্থিতি এবং সামরিক ব্যক্তিত্বদের উপর বাড়তি নির্ভরতা ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের নাজুক অবস্থাকে সামনে এনে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে খামেনেইয়ের স্বাস্থ্য এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
No Comment! Be the first one.