সামাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের জন্য অনেকাংশে দায়ী সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যম


উজ্জ্বল কুমার দত্ত।

কুমারডুবি, ঝাড়খন্ড।

  এক সময় যেটি মানবজাতিকে একতাবদ্ধ  করার এক অসাধারণ ডিজিটাল বিস্ময় হিসেবে দেখা হয়েছিল, সেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজ এক ভিন্ন চেহারায় দাঁড়িয়েছে। পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে পুনঃসংযোগ, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ভাগ করে নেওয়া, কিংবা অবহেলিতদের জোরালোভাবে প্রকাশের জন্য যে মাধ্যমটির উদ্ভব হয়েছিল, তা আজ যেন নেমে এসেছে চরম দীনতা বা বিশৃঙ্খলায়। এটি কেবল স্রোতের সঙ্গে বিবর্তন নয়, বরং চরিত্রের পরিবর্তন, যা গভীরভাবে প্রভাবিত করছে আমাদের তরুণ প্রজন্ম, সমাজ, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে।

   আজকের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো যেমন- ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ,টেলিগ্রামসহ অন্যগুলো আর 'সামাজিক' নেই। বরং এটি ক্রমাগত হয়ে উঠছে 'অসামাজিকতার আঁখড়া'। বর্তমান সময়ের সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয়গুলোর একটি হলো অশ্লীলতাকে যেন স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা। যা এক সময় ব্যক্তিগত ও নিষিদ্ধ ছিল, আজ তা 'কনটেন্ট' হয়ে উঠেছে। মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ার লাইভে এসে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করছে, ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা করছে বা কাউকে অপমান করছে। আর এর সবটাই হচ্ছে দর্শক বাড়ানোর জন্য। এই ধরনের কথ্য সহিংসতা ব্যতিক্রম নয়, বরং এক নতুন 'নর্ম'। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো হাজার-হাজার মানুষ এসব লাইভে যুক্ত হচ্ছে, হাসির ইমোজি দিচ্ছে, উৎসাহ দিচ্ছে, এমনকি অনুকরণও করছে। অনেকেই কেবল অশ্লীল বা বিতর্কিত হওয়ার মাধ্যমে অর্জন করছে পরিচিতি। এই নতুন ডিজিটাল সংস্কৃতিতে ভদ্রতাকে দুর্বলতা মনে করা হচ্ছে, আর অশ্লীলতাকে সাফল্যের সিঁড়ি। মানুষ এসব দেখে কী শিখছে? তরুণ প্রজন্ম যদি প্রতিদিন গালিগালাজ, অপমান এবং অশ্লীলতা দেখে বড় হয়, তাহলে তারা ভবিষ্যতে কী ধরনের মূল্যবোধ নিয়ে সমাজে প্রবেশ করবে? একটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক প্রবণতা হলো বিয়ের কলহ ও বিচ্ছেদকে সামাজিক মাধ্যমে লাইভে সম্প্রচার করা। যা এক সময় ব্যক্তিগত ছিল, তা আজ জনসম্মুখে হয়ে উঠেছে নাটক। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে দোষারোপ করছে, চোখের জল, চিৎকার, অপমান- সবই লাইভে। এগুলো যেন এখন 'শো'। কেউ কেউ পূর্ব পরিকল্পিতভাবে এসব আয়োজন করছে, যেন এটা এক ধরনের বিনোদন। এমনকি কেও-কেও আত্মহত্যা পর্যন্ত এই লাইভে এসে করেছেন। এই বিকৃত পরিস্থিতিতে আমাদের সামাজিক বোঝাপড়া, ভালোবাসা, সম্পর্ক রক্ষা- সবকিছুই এলোমেলো ও প্রশ্নবিদ্ধ। যখন তরুণ-তরুণীরা এই ধরনের লাইভ দেখে বড় হয়, তখন তারা ভাবতে শেখে যে, ভালোবাসা মানে হয়তো এই ধরনের অপমান, সম্পর্ক মানেই হয়তো নাটক। এটি একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি।


    শুরুতে সোশ্যাল মিডিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল সংযোগ, ভালোবাসা, বন্ধন ও অনুভূতি বিনিময়ের একটি মাধ্যম। কিন্তু আজ আমরা 'কমেন্ট' দিতে পারি, কিন্তু সান্ত্বনা দিতে পারি না। 'শেয়ার' করতে পারি, কিন্তু সহানুভূতি দেখাতে পারি না। মানুষের কষ্টে, অসহায়তায় বা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় আমরা স্ক্রল  করে

চলে যাই। আমরা হয়তো ‘রিঅ্যাক্ট’ করি, কিন্তু বাস্তব জীবনে পাশে দাঁড়াতে পারি না। দিন-দিন আমরা কম মানবিক হয়ে যাচ্ছি এই প্রযুক্তির স্রোতে ভেসে। আমরা যে বিষয়টিকে অবজ্ঞা করি, সেটাই আজকের সমস্যার মূল। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো মনোযোগকে দেখে পণ্য হিসেবে। যার কনটেন্ট যত বেশি বিতর্কিত, চমকপ্রদ বা অশ্লীল, সেটাই বেশি ভিউ পায়, বেশি ছড়ায়।
এর ফল ভয়াবহ। মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত হচ্ছে, শিশু-কিশোররা ভুল আদর্শ শিখছে এবং সামগ্রিকভাবে সমাজের মূল্যবোধ ক্ষয়ে যাচ্ছে। ফলোয়ার পাওয়ার জন্য আমরা সংস্কৃতি ও নীতিকে বিসর্জন দিচ্ছি। অনেকে বলেন, ‘আমার মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে।’ অবশ্যই, মত প্রকাশের অধিকার আছে, কিন্তু সেটি অপরকে আঘাত করার অধিকার নয়। অনেকেই আজ ছদ্মনামে বা পেজ খুলে মানুষকে অপমান করছে, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে, নারী বিদ্বেষী বা জাতিবিদ্বেষী মন্তব্য করছে। এক সময়ের সুস্থ বিতর্ক এখন রূপ নিয়েছে ডিজিটাল যুদ্ধে। স্বাধীনতা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি জরুরি দায়িত্ববোধ। না হলে এটি সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠতে পারে। আমরা কেবল কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের দোষ দিয়ে দায় এড়াতে পারি না। দর্শক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব রয়েছে। আপনি যা দেখেন, তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘সিগন্যাল’ হিসেবে কাজ করে। আপনার প্রতিটি ভিউ, শেয়ার, লাইক প্ল্যাটফর্মকে জানায় যে, আপনি সেই বিষয় পছন্দ করছেন। তাই যদি আমরা ভদ্রতা, জ্ঞানমূলক কনটেন্ট, কিংবা মানবিক বার্তা বেশি দেখতাম, তবে সোশ্যাল মিডিয়াও সেগুলোই ছড়াত বেশি। আমরা সক্রিয়ভাবে সংস্কৃতির রূপ নির্ধারণ করছি। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে।

     এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধ ভিত্তিক শিক্ষা। শুধু স্কুল বা কলেজ নয়, পরিবার, সমাজ ও গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বাচ্চাদের শেখাতে হবে ভাইরাল হওয়া মানেই সফলতা নয়। জনপ্রিয়তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানবিকতা ও নৈতিকতা। মিডিয়া লিটারেসি, অনলাইন আচরণবিধি এবং ডিজিটাল নীতি বোধের শিক্ষা আমাদের সময়ের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সোশ্যাল মিডিয়ার মাঝে এখনো বিপুল সম্ভাবনা আছে। বহু ব্যক্তি ও সংগঠন এটিকে ব্যবহার করছে শিক্ষা, সচেতনতা এবং মানবিকতার জন্য। কেউ মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে, কেউ দরিদ্রদের জন্য তহবিল তুলছে, কেউ আবার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। আমাদের শুধু চাই একটা সম্মিলিত চেতনা। আমরা যদি সঠিক কনটেন্ট তৈরি করি, দর্শক হিসেবে দায়িত্বশীল হই, আর প্ল্যাটফর্মগুলো যদি নীতিমালায় গুরুত্ব দেয়, তবে এখনো সময় আছে ঘুরে দাঁড়াবার। প্রযুক্তি বদলাবে, ট্রেন্ড বদলাবে, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ চিরকালীন। তাই আসুন, আমরা এখনই ঠিক করি আমরা কেমন সমাজ চাই। কেমন ভবিষ্যৎ চাই।

(মতামত ব্যক্তিগত)

Read More News

টাটা–বক্সার–টাটা হোলি স্পেশাল ট্রেন চালাবে রেল কর্তৃপক্ষ, যাত্রীদের মিলবে অতিরিক্ত স্বস্তি

সকাল সকাল ডেস্ক পূর্ব সিংভূম : হোলি উৎসবকে কেন্দ্র করে যাত্রীদের বাড়তি ভিড় সামাল দিতে ঝাড়খণ্ডের...

Read More