কলমে:- উজ্জ্বল কুমার দত্ত।
কুমারডুবি (ঝাড়খন্ড)
আজ ভারতীয় সমাজবাদের (socialism) আদর্শ চরিত্র বিরসা মুন্ডা ভগবানের তিরোধান দিবস। তিনি জনজাতি সমাজকে সঙ্ঘবদ্ধ করে উলগুলান করেছিলেন। উলগুলান অর্থাৎ গোলমাল সৃষ্টি করা; আন্দোলনের আরেক দেশজ নাম। তিনি এক মহান সংস্কৃতিবান সমাজ সংস্কারক (social reformer) ছিলেন। তিনি সংগীতবিসারদও ছিলেন। তিনি শুকনো লাউ এর খোলা ব্যবহার করে এক বিশিষ্ট বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেছিলেন। যে বাদ্যযন্ত্রটি বর্তমানেও বহুল প্রচলিত। এই বাদ্যযন্ত্রটি বাজিয়ে তিনি আত্মিক সুখ অনুভব করতেন এবং তিনি দলিত, পীড়িত সমাজকে সংগঠিত করে সমাজের উন্নতিকল্পে কাজ করে যেতেন যেমন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বংশীর (বাঁশি) সুরে প্রত্যেককে আপন করতে পারতেন। শ্রীকৃষ্ণের সেইরূপ আমরা দেখতে পাই বিরসা মুন্ডার মধ্যে। শুকনো লাউ দ্বারা নির্মিত এই বাদ্যযন্ত্র ভারতীয় সংগীত জগতে বনাঞ্চল থেকে বলিউড পর্যন্ত ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। বস্তুতপক্ষে বিরসা মুন্ডার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল জনজাতি সমাজকে খ্রিস্টান মিশনারীদের হাত থেকে রক্ষা করা, ধর্মান্তরন ও অত্যাচার থেকে রক্ষা করা, সমাজে ব্যাপ্ত নীতিহীনতাকে সমাপ্ত করা এবং শোষক বর্গের হাত থেকে সমাজকে রক্ষা করা। ভগবান বিরসা কেবল জনজাতিয় সমাজেরই রক্ষাকর্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন সমগ্র গ্রাম্য ভারতীয় সমাজের নায়ক ও পথপ্রদর্শক। ভারতীয় সমাজের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং অবিভাজ্য অংশ আমাদের এই জনজাতি সমাজ। তারাই প্রকৃত সমাজবাদের দীক্ষিত।
প্রকৃতির স্নেহধন্য এই সমাজ সর্বদা ভৌতিকবাদ (materialistic), আধুনিকতা (modernization) এবং ধনসঞ্চয় (acquiring money) থেকে দূরে থেকেছে। বিরসা মুন্ডা মূলত এই সমাজেরই অংশ। "অবুয়া দিশোম রে অবুয়া রাজ" অর্থাৎ নিজের মাটি নিজের অধিকারের স্লোগান দিয়েছিলেন বীর বিরসা মুন্ডা। বীর শিরোমনি বীরসা মুন্ডার বলিদান স্মরণে রেখে স্বতন্ত্র ভারতে অর্থাৎ "অবুয়া দিশোমে" জনজাতি এবং বনবাসী বন্ধু ও তাদের সংস্কৃতির সাথে কি ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে তার খোঁজ বর্তমান সমাজকে রাখতে হবে। ষড়যন্ত্রের মূলে আছে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে অন্যায় ভাবে ছড়ানো আর্য এবং অনার্যের বিঘটনকারী বিতন্ডা (conflict) এবং মূলনিবাসী সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারনা। ভারতবর্ষের জনজাতীয় সমাজ এবং অন্যান্য জাতি বিঘটনকারী শক্তিগুলি নিজেদের স্বার্থে আর্য-অনার্য রূপে দুটি পৃথক জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করেছে। কথিতরূপে আর্য ও অনার্য অর্থাৎ জনজাতি সমাজের প্রাচীনতা সময়ের দিক দিয়ে কোনরূপ-পৃথক তো নয়ই; বলা যেতে পারে সমসাময়িক। "আর্য" শব্দটির ভাষাগত অর্থ সভ্য এবং "অনার্য"-র অর্থ অসভ্য। বাস্তবিকতা এই যে ভারতের এই বিশাল বনবাসী সমাজ পুরাতন কাল থেকেই সভ্যতা, সংস্কৃতি, কলা, নির্মাণ, রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা, উৎপাদক (producer) এবং সর্বোপরি রাষ্ট্র এবং সমাজের উৎকৃষ্টতার বিষয়ে কোনরূপ ভিন্নতা পোষণ করেনি। তারা সমাজের প্রবাহে কাঁধে-কাঁধ মিলিয়েছে এবং বর্তমানেও তারা একই ধারার প্রবাহমানতা বজায় রাখতে পেরেছে। এটা এখন প্রায় সর্বজনবিদিত যে ইসলাম এবং খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায় বিস্তারবাদে বিশ্বাসী। নিজস্ব ধর্মের বিস্তারের জন্য তারা নিজেদের ধর্মকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিশোধনের পরিবর্তে ষড়যন্ত্র, বিতর্ক, কুচক্র এবং হিংসার আশ্রয় নিয়েছে। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য পশ্চিমের বিদ্বানেরা কৃত্রিমভাবে ভারতীয়দের মধ্যে জাতিগত ভেদভাব তৈরি করেছে এবং দ্রাবিড়দেরকে ভারতের মূলনিবাসী ও আর্যদের বাহ্যিক আক্রমণকারী বলে বর্ণনা করেছে।
তথাকথিত সংস্কৃতের বিদ্বান ম্যাক্স মুলার আর্যন (Aryan) ইনভাসন থিওরি আবিষ্কার করেন। তিনি বলেন আর্যরা এক সুসংস্কৃত, শিক্ষিত, বিস্তৃত ধর্মগ্রন্থ ও নিজেদের লিপি এবং উৎকৃষ্ট ভাষা যুক্ত এক চলমান সমৃদ্ধশালী জাতি। এইভাবে ম্যাক্স মুলার আর্য ইনভেশন থিওরির মিথ্যা চারাগাছ রোপন করেছিলেন। এই থিওরিকে ইংরেজি শিক্ষা পদ্ধতি বৃহৎ বৃক্ষে পরিণত করেছে। যদিও ১৯২১ সালের হরপ্পা এবং মহেঞ্জোদারো সভ্যতা জানা গেলে এই থিওরি একপ্রকার বাতিল হয়ে পড়ে কিন্তু দুষ্ট ইংরেজদের শিক্ষা পদ্ধতি, মিথ্যা ইতিহাস লেখন এবং ষড়যন্ত্রের ফলে এই থিওরি এখনোও জীবিত আছে। The Aryan Invasion Theory is a hypothesis developed in the 20th century that states that a group of people called Aryans invaded Northern India and destroyed the Indus valley civilization.
সবচেয়ে দুঃখের বিষয় এই যে ইংরেজদের প্রস্থানের পরও ভারতবর্ষের এক বৃহৎ অংশজুড়ে এমন কতকগুলো অপদার্থ ভারতীয়র উদয় ঘটেছে যারা সর্বদা ভারতের সংস্কৃতিকে অপমান করে আনন্দ উপভোগ করে। তারা আবার নিজেদের প্রগতিশীল বলে পরিচয় দেয়। তাদের মানসিকতা ভারত বিরোধী ও বিদ্বেষী। এই অযাচিত বর্ণ-সেকুলার,নকশালবাদী ,মাওবাদী ,বুদ্ধিজীবী ,প্রগতিশীল, জনবাদী ইত্যাদি নামে যেখানে-সেখানে সমাজসেবার নামে সমাজ ও দেশকে ক্ষতবিক্ষত করতে চায়। সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতার শ্রেষ্ঠত্ব জনসমক্ষে না এনে আর্য ও দ্রাবিড়ের মধ্যে বিভাজন রেখা টানার চেষ্টা বহুদিন থেকে চলে আসছে। সময়ের দাবি হচ্ছে বনবাসী সমাজে অযাচিতভাবে প্রবেশ করা সেই সকল কালনেমি বর্গকে চিহ্নিত করা এবং তাদের দেশবিরোধী, সমাজ বিরোধী চরিত্রটিকে উন্মুক্ত করা ও ছদ্ম দেশপ্রেমের আবরণটি টেনে সরিয়ে ফেলা। কথিতভাবে যাদেরকে আর্য এবং দ্রাবিড় বলে পৃথক করা হয়েছিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেছে যে তাদের উভয়ের ডিএনএ একই। তারা উভয়ই শৈব (শিবের উপাসক)। এন্থ্রপোলজিস্ট ওয়ারিয়র অ্যালভিন জনজাতি সমাজের উপর অনুসন্ধান কার্য পরিচালনা করে জানতে পেরেছেন যে কথিত আর্য এবং দ্রাবিড় উভয় শিবের উপাসক এবং গোন্ডোবানা' র আরাধ্য শম্ভুশেক ভগবান শিবেরই আরেক রূপ। মাতা শবরী, নিশাদরাজ, সুগ্রীব, অঙ্গদ, সুমেধা, জাম্বুবান, জটায়ু ইত্যাদি সকল জনজাতি বন্ধু ভারতের অবশিষ্ট সমাজের সাথে এমন ভাবে মিলেমিশে আছে যেমন দুধের সঙ্গে চিনি। প্রধান জনজাতি গোন্ড এবং কোরকু ভাষার শব্দ রামচরিতমানস-এর দোহা সংখ্যা ৩২০-তে প্রয়োগ হয়েছে। মেওয়াড়ে ব্যবহৃত লোকনৃত্য গবরী এবং বোরি ভগবান শিবের নৃত্যের আদলে যাহা সামগ্রিক নেওয়াড় হিন্দু ও জনজাতি উভয় সমাজ অনুসরণ করে। বিরসা মুন্ডা, টনটোয়া ভীল, রানী দুর্গাবতী, ঠাকুর বিশ্বনাথ সহদেব, অমর শহীদ বুধু ভগত, যতরা ভগত, লাখো বোদরা, তেলঙ্গা খাড়িয়া, সরদার বিষ্ণু গোন্ড ইত্যাদি অনেক জনজাতি বন্ধুদের নাম নেওয়া যেতে পারে যারা নিজেদের সর্বস্ব অর্পণ করেছেন ভারতের সংস্কৃতি এবং হিন্দুত্বকে রক্ষা করতে। তাদের প্রতি রইল আমার শতকোটি নমস্কার ও প্রণাম।
(মতামত ব্যক্তিগত)
No Comment! Be the first one.